01/09/2025
#রোগী_কথনঃ
#হাইড্রকেফালাসঃ_বাচ্চার_জন্মগত_এক_ত্রুটির_নাম
ঢাকা মেডিকেল কলেজে ডিউটি আওয়ারের শেষে লাইব্রেরিতে বসতাম। এফসিপিএস সেকেন্ড পার্টের পড়ার জন্য। সতেরো থেকে একুশ এই চার বছরের আমার প্রতিটি বিকেল, সন্ধ্যা রাতের প্রথমাংশ মলাটবন্দী হয়ে আছে সেখানে। আমার পড়ার টেবিলে, বইয়ের পাতায়। কত যে পরিশ্রম, সাধনা আর একাগ্রতা জমেছিলো, জানতো টেবিলে রাখা ছোট্ট সবুজ গাছটি আর জানতো দেয়াল ঘড়িটা। আজ সে গল্প থাক। আজ অন্য গল্প বলবো।
লাইব্রেরিতে যেতে হয় শিশু সার্জারী ওয়ার্ডের সামনে দিয়ে। যারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসেছেন তারা জানেন এখানে রোগী কেমন উপচে পড়ে। সারাদেশ থেকে জটিল থেকে জটিলতর রোগীরা রেফার্ড হয়ে আসে। শেষ ভরসা হিসাবে। এখান থেকে অন্য কোথাও সাধারণত পাঠানো হয় না। কাজেই বিছানা, ফ্লোর বারান্দা, করিডোর, চিপাচুপা সব জায়গায় রোগী আর রোগী। এভাবেই দিনের পর দিন চলে হাসপাতালের কর্মযজ্ঞ। দিন দিনের মতো যায়, রাত রাতের মতো। ডাক্তার আমরা জেগে থাকি, জেগে থাকেন আমাদের রোগীরা। এ এক যুদ্ধক্ষেত্র। সবাই লড়ছি অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে। কখনো আমরা জিতি, কখনো পরাজয় বরণ করি।
তো যা বলছিলাম। যাওয়া আসার পথে শিশু সার্জারী ওয়ার্ডের বারান্দায় দেখতাম, এক মা তার বাচ্চাটাকে পরম যত্ন করছেন। কখনো কখনো বাবাও। বাচ্চাটার মাথা অস্বাভাবিক বড়। হাত পা লিকলিকে। চোখগুলো আধবোজা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় রোগটাকে বলা হয়, হাইড্রোকেফালাস।
হাইড্রোকেফালাস রোগে আক্রান্তদের ব্রেনের চারপাশে যে ফ্লুইড বা পানি থাকে তা ড্রেনেজ হয় না। ড্রেজিং সিস্টেমের গন্ডগোলের জন্য পথ ব্লক হয়ে যায়। ফলে দিনের পর দিন সেরেব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড জমে জমে মাথা বড় হয়ে যায়। মাথার প্রেশার বেড়ে যায়, ব্রেইন টিস্যুর পুরুত্ব কমে যায় এবং ফেসিয়াল আউটলুক বিকৃত হয়ে যায়। শারীরিক এবং মানসিক গঠনও বাধাগ্রস্ত হয়।
কেনো এমন হয়?
অনেক কারনেই হতে পারে। তার মধ্যে ট্রমা, টিউমার, ইনফেকশন, টিবি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। জন্মগত কারণেও হয়। এর সাথে অন্যান্য জন্মগত ত্রুটি এবং বংশগত ত্রুটিও থাকতে পারে।
ডায়াগনোসিসঃ
মায়ের পেটে থাকা অবস্থায় ডায়াগনোসিস করা যায়। একটা ভালো মানের আল্ট্রাসোনোগ্রাম রিপোর্ট যথেষ্ট ডায়াগনোসিস করতে।
চিকিৎসাঃ
চিকিৎসায় ভালো হবে কিনা নির্ভর করে অনেক কিছুর উপর। যেমন- কি কারণে হলো, ক্রোমোজোমাল ও অন্য কোনো ত্রুটি আছে কিনা এবং কি পরিমান ব্রেইন টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার উপর। সান্ট অপারেশন নামে একধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি আছে ব্রেইনের ড্রেনেজ সিস্টেমকে সচল রাখার জন্য। আরো নিত্য নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি আবিস্কার হচ্ছে।
প্রতিরোধ কিভাবে করা যায়?
কথায় আছে প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর। প্রিকনসেপশনাল কাউন্সিলিং এবং কেয়ার খুব গুরুত্বপূর্ণ এসব ক্ষেত্রে। অর্থাৎ প্রেগন্যান্সির আগে থেকেই ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কেনন এটা রিকার করতে পারে।
শতকরা কতো ভাগ এই রোগ রিকার করতে মানে পুনরায় হতে পারে?
শতকরা পাঁচ ভাগ ক্ষেত্রে। কাজেই বাচ্চা নেওয়ার আগেই স্ত্রী এবং প্রসূতিরোগ বিশেষজ্ঞর পরামর্শ নেওয়া এবংযেসব কারনে হয় সেসব রোগ মায়ের থাকলে চিকিৎসা করিয়ে প্রেগন্যান্সি নেওয়া জরুরি। তাছাড়া ফলিক এসিড গর্ভধারণের তিনমাস আগে থেকেই সেবন করা জরুরি এবং গর্ভাবস্থায় নিয়মিত চেক-আপে থাকা জরুরি।
লাইব্রেরিতে যাওয়ার পথে বাচ্চাটাকে দেখে যাওয়া আমার রুটিনে পরিনত হয়েছিলো। একদিন দেখি বাচ্চাটা নাই। মনটা ধ্বক করে উঠলো। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, এই পৃথিবীর জার্নি তার শেষ হয়েছে।
সুস্থ হবে না জেনেও দিনের পর দিন মা বাবা যে যত্নটাই না করেছে, তা ছিলো দেখার মতো। শেষ দিনটি পর্যন্ত তারা লড়ে গেছেন। স্যলুট তাদের। মা বাবারা মনেহয় এমনি হয়। পৃথিবীর সকল মা বাবার জন্য রইল গভীর শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা। তোমরা ছাড়া আমরা সন্তানেরা আসলেই কিছুই না।
©
ডা. ছাবিকুন নাহার