05/03/2026
ধুমপানের ইতিহাস ও তামাকের বিশ্বজয় 🌍
একটি ভিনদেশি পাতা কীভাবে অল্প কয়েক শতাব্দীতে পুরো পৃথিবী দখল করল—তার গল্পই তামাকের ইতিহাস।
ইউরোপে তামাকের প্রবেশ---------
১৫৫৮ সালকে ইউরোপে তামাকের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ধরা হয়। স্প্যানিশ চিকিৎসক ফ্রান্সিসকো ফার্নান্দেজ রাজা ফিলিপ দ্বিতীয়-এর নির্দেশে মেক্সিকো থেকে তামাকের গাছ ও বীজ স্পেনে নিয়ে আসেন। শুরুতে এটি আনা হয়েছিল মূলত ঔষধি গুণাগুণ পরীক্ষার জন্য।
১৫৬০ সালে পর্তুগালে নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত জঁ নিকোট তামাককে ফ্রান্সে পরিচিত করান। তাঁর নাম থেকেই এসেছে ‘নিকোটিন’ শব্দটি। তিনি মাইগ্রেনের চিকিৎসায় তামাক ব্যবহার করেছিলেন।
১৫৮০-এর দশকে ইংল্যান্ডে ধূমপানকে আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে জনপ্রিয় করে তুলতে বড় ভূমিকা রাখেন স্যার ওয়াল্টার র্যালে।
অর্থাৎ ১৫৫৮ সালে ইউরোপে প্রবেশ করলেও, সাধারণ মানুষের মধ্যে ধূমপান হিসেবে তামাক জনপ্রিয় হতে আরও কয়েক দশক সময় লাগে।
আমেরিকা থেকে বিশ্বব্যাপী বিস্তার-
১৪৯২ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাস আমেরিকায় পৌঁছে আদিবাসীদের কাছ থেকে তামাক পাতা উপহার পান। এরপর ১৬শ শতাব্দীতে স্প্যানিশ ও পর্তুগিজ নাবিকরা তামাক ইউরোপে নিয়ে আসেন।
শুরুতে তামাককে ‘অলৌকিক ঔষধ’ মনে করা হতো—মাইগ্রেন, দাঁতব্যথা এমনকি ক্যানসারের চিকিৎসায়ও এটি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হতো। কিন্তু দ্রুতই এটি বিলাসদ্রব্য ও আভিজাত্যের প্রতীকে পরিণত হয়।
পর্তুগিজ ও ডাচ বণিকদের মাধ্যমে তামাক ছড়িয়ে পড়ে এশিয়া ও আফ্রিকায়।
১৫৭৫ সালে স্প্যানিশরা ফিলিপাইনে তামাক নিয়ে যায়। ১৬শ শতাব্দীর শেষে এটি ভারত ও জাপানে পৌঁছে যায়। জাপানে এতটাই জনপ্রিয় হয় যে তারা নিজস্ব নকশার ‘কিসেরু’ পাইপ তৈরি শুরু করে।
ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যের মাধ্যমে তামাক প্রবেশ করে উসমানীয় সাম্রাজ্য-এ এবং সেখান থেকে মিশরে ছড়িয়ে পড়ে।
উত্তর আমেরিকার ভার্জিনিয়া ও মেরিল্যান্ড-এর অর্থনীতি তামাক চাষের ওপর গড়ে ওঠে। এই ‘ক্যাশ ক্রপ’ আটলান্টিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি দুঃখজনকভাবে দাসপ্রথা বিস্তারেও ভূমিকা রাখে।
১৮৮০-এর দশকে সিগারেট তৈরির মেশিন আবিষ্কারের ফলে তামাকের গণউৎপাদন শুরু হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সৈনিকদের মাঝে তামাক বিতরণ এর জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে দেয়।
ভারতের মোগল আমলে তামাকের প্রভাব-
ভারতে তামাক আসে পর্তুগিজদের হাত ধরে এবং খুব অল্প সময়েই মোগল দরবার থেকে সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছে যায়।
১৬০৪-১৬০৫ সালের দিকে সম্রাট আকবর-এর শাসনামলে মোগল দরবারে তামাক প্রবেশ করে। কথিত আছে, আকবর নিজেও এর স্বাদ নিয়েছিলেন।
আকবরের রাজবৈদ্য আবুল ফাত গিলানি তামাকের ধোঁয়া ঠান্ডা ও বিশুদ্ধ করার জন্য এক বিশেষ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন—যা আধুনিক হুক্কার আদি রূপ হিসেবে বিবেচিত।
তামাকের ক্ষতিকর দিক দেখে সম্রাট জাহাঙ্গীর ১৬১৭ সালে তামাক ব্যবহার ও চাষের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তাঁর আত্মজীবনী তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরী-তে তামাকের ক্ষতির উল্লেখ রয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও জনপ্রিয়তা কমেনি। ১৬১৩ সালের মধ্যে গুজরাটে বাণিজ্যিক তামাক চাষ শুরু হয়। এটি দ্রুত লাভজনক অর্থকরী ফসলে পরিণত হয়ে মোগল কোষাগারে বিপুল রাজস্ব যোগাতে থাকে।
সম্রাট আওরঙ্গজেব-এর সময় নাগাদ দিল্লি শহরে প্রতিদিন তামাক থেকে প্রায় এক হাজার টাকা রাজস্ব আদায় হতো।
একসময় ‘অলৌকিক ঔষধ’ হিসেবে দেখা তামাক কয়েক শতাব্দীর মধ্যে বিলাসদ্রব্য, অর্থকরী ফসল ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়। উপনিবেশ বিস্তার, সমুদ্রযাত্রা, দরবারি সংস্কৃতি—সবকিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে যায় এর ইতিহাস।
তবে আজ আমরা জানি—তামাক শুধু ইতিহাসের অংশ নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বড় হুমকিও। ©®