28/12/2025
শয়তান ও যাদুকরের চুক্তি: বাস্তবতা, পদ্ধতি ও ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি
বর্তমান যুগে “যাদু”, “বদনজর”, “জিনের আছর” ইত্যাদি বিষয় নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। অনেকেই একে কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দেন, আবার অনেকেই অযথা ভয় পেয়ে যান। কিন্তু ইসলাম এই বিষয়গুলোকে neither অস্বীকার করে nor অতিরঞ্জিত করে—বরং বাস্তবতা, সীমা ও প্রতিকার স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছে। শয়তান ও যাদুকরের মধ্যে যে চুক্তির কথা বলা হয়, তা কল্পকাহিনি নয়; বরং কুরআন, হাদিস ও বহু বাস্তব রুকইয়াহ অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত একটি বিষয়।
যাদু কি সত্যিই বাস্তব?
কুরআনে স্পষ্টভাবে যাদুর অস্তিত্বের কথা এসেছে। সূরা বাকারা (২:১০২) আয়াতে হারুত-মারুতের ঘটনা উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন—মানুষ এমন জিনিস শিখত যা দিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটানো হয়। অর্থাৎ যাদু বাস্তব এবং এর প্রভাব সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে ভয়াবহ হতে পারে। তবে একই আয়াতে এটাও পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে—আল্লাহর অনুমতি ছাড়া যাদু কারও ক্ষতি করতে পারে না।
শয়তান ও যাদুকরের চুক্তি কীভাবে হয়?
এই চুক্তির কয়েকটি সাধারণ দিক হলো:
ইবাদত ত্যাগ ও অবমাননা
যাদুকরকে নামাজ ছেড়ে দিতে হয়, পবিত্রতা নষ্ট করতে হয়, কখনো কুরআনের আয়াত উল্টো করে লিখতে হয় বা নাপাক স্থানে রাখতে হয়।
হারাম কাজের মাধ্যমে আনুগত্য প্রমাণ
ব্যভিচার, মদ্যপান, পশু বা পাখি কুরবানি দিয়ে রক্ত অপবিত্রভাবে ব্যবহার, কিংবা নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট পাপ করা—এসবের মাধ্যমে শয়তানের প্রতি আনুগত্য দেখানো হয়।
শিরক ও কুফরি বাক্য
অনেক ক্ষেত্রে যাদুকরকে আল্লাহ ছাড়া অন্য শক্তির কাছে সাহায্য চাইতে হয়, জিনকে সিজদা করতে হয় বা শিরকি মন্ত্র পাঠ করতে হয়।
এর বিনিময়ে শয়তান বা অধীনস্থ জিনেরা যাদুকরকে তথ্য দেয়, মানুষের দুর্বলতা জানায়, ভয় সৃষ্টি করে বা যাদুর কাজ বাস্তবায়নে সহায়তা করে।
শয়তান কেন সহযোগিতা করে?
শয়তানের মূল লক্ষ্য একটাই—মানুষকে শিরক ও কুফরের দিকে নিয়ে যাওয়া। যাদুকর যখন নিজের ঈমান বিসর্জন দেয়, তখন সে শয়তানের জন্য সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হয়ে ওঠে। কুরআনে শয়তান সম্পর্কে বলা হয়েছে—সে মানুষকে মিথ্যা আশ্বাস দেয়, ধীরে ধীরে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেয়।
বাস্তবে দেখা যায়, যাদুকররা শুরুতে কিছু “সাফল্য” পেলেও শেষ পরিণতি হয় ভয়াবহ—মানসিক ভারসাম্যহীনতা, পরিবার ধ্বংস, অস্বাভাবিক মৃত্যু কিংবা চরম দারিদ্র্য।
যাদুর প্রভাব কাদের ওপর পড়ে?
যাদু সাধারণত পড়ে—
ঈমান দুর্বল ব্যক্তির ওপর
নিয়মিত নামাজ ও যিকিরহীন জীবনে
দীর্ঘদিন গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির ওপর
ভয় ও কুসংস্কারে আক্রান্ত মানুষের ওপর
তবে শক্ত ঈমানদার মানুষও পরীক্ষা হিসেবে আক্রান্ত হতে পারে—যেমন নবী মুহাম্মদ ﷺ–এর ওপর লাবিদ ইবনুল আসাম যাদু করেছিল। কিন্তু আল্লাহ তাঁকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে দেন এবং উম্মতকে শিক্ষা দেন।
যাদু, বদনজর ও জিনের আছরের লক্ষণ
রুকইয়াহ অভিজ্ঞতায় সাধারণ কিছু লক্ষণ দেখা যায়—
হঠাৎ অকারণ ভয়, দুঃস্বপ্ন
নামাজে অস্বস্তি, কুরআন শুনলে রাগ
দাম্পত্য কলহ, যৌন অনীহা
চিকিৎসায় ধরা না পড়া শারীরিক সমস্যা
একাকীত্ব, আত্মহত্যার চিন্তা
সব সমস্যাই যে যাদু—এমন নয়। তবে লক্ষণগুলো একত্রে থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ইসলামে এর প্রতিকার ?
ইসলাম কখনো যাদু দিয়ে যাদুর চিকিৎসা করতে বলে না। বরং কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। সঠিক প্রতিকার হলো—
তাওহিদ ও তাওবার দিকে ফেরা
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ প্রতিষ্ঠা
সকাল-সন্ধ্যার যিকির
সূরা ফালাক, নাস, আয়াতুল কুরসি নিয়মিত পাঠ
বিশুদ্ধ কুরআনভিত্তিক রুকইয়াহ
বিশ্বাসযোগ্য, আকিদা-সহিহ রুকইয়াহ প্র্যাকটিশনারের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে—যিনি শিরক, তাবিজ ও গোপন আচার থেকে মুক্ত।
উপসংহার
শয়তান ও যাদুকরের চুক্তি কোনো রূপক গল্প নয়—এটি ঈমান ধ্বংসের এক বাস্তব ষড়যন্ত্র। তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কারণ শয়তান যত শক্তিশালীই হোক, আল্লাহর কালাম তার চেয়েও শক্তিশালী। যে ব্যক্তি কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরে, তার ওপর কোনো যাদু স্থায়ীভাবে কাজ করতে পারে না।
সচেতনতা, সঠিক জ্ঞান ও আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসাই হলো এই অদৃশ্য যুদ্ধের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
#রুক্বইয়াহ