13/08/2023
গল্পসল্প- স্বল্পগল্প: ৪০৭
বদ-নযর
একটু পরেই বরযাত্রীরা এসে পড়বে। কনে সাজানোর সব কাজ প্রায় শেষ। কনের মা একটু আগে এসে মেয়েকে দেখে গেছেন। বারবার দেখে যাচ্ছেন, তবুও আশ মিটছে না। গর্বে বুক ফুলে উঠছে। এমন একটা সুন্দর মেয়েও তার আছে?
হঠাৎ হাঁকডাক বেড়ে গেল। বরযাত্রী এসে গেছে। মা ওপরতলায় এলেন, মেয়েকে নিচে নামিয়ে নিতে। মেয়ে ব্যাকুল হয়ে মাকে কাছে ডেকে বলল:
-আম্মু একটু আমার কাছে এসে বসো। আমার কেমন যেন লাগছে।
-কেন কী হয়েছে মা?
-আমি কেন যেন আশেপাশের কিছই দেখতে পাচ্ছি না।
-ঘাবড়াবার কিছু নেই, ঠিক হয়ে যাবে। বিয়ের দিনের উত্তেজনা-দুশ্চিন্তায় সাময়িক এসব দেখা দেয়। চল, নিচে যাই। ওখানে সবাই বসে আছে।
-না আম্মু, ব্যাপারটা তেমন নয় মোটেও। অনেকক্ষণ ধরেই এমনটা হয়েছে।
মা থমকে গেলেন। একজন বয়স্কা মহিলা বললেন:
-আমরা যারা এতক্ষণ এই ঘরে ছিলাম, সবাই ওজু করে আসি। আমার মনে হচ্ছে, তার ওপর কারো বদনযর পড়েছে। আমরা তার জন্যে ইস্তেগফার পড়ে দু‘আ করবো। তাতে আশা করি ঠিক তার দৃষ্টি ঠিক হয়ে যাবে।
মা ছাড়া বাকি সবাই ওযু করে এল। দু‘আ করলো। কিন্তু কোনও সমাধান হলো না। খবরটা ভেতরবাড়ি ছাড়িয়ে বারবাড়িতে গিয়ে পৌঁছল। পাত্রপক্ষ এমতাবস্থায় বিয়েতে বেঁকে বসলো। তাদের মুরুব্বিরা বিয়েটা স্থগিত করে দিতে বলল। এমন সময় পাত্র শক্ত অবস্থান নিয়ে বললো:
-বিয়ে এখানে হবেই। একটা মেয়েকে এমন অসহায় অবস্থায় ফেলে রেখে যেতে চাই না। আমরা তো আগেই পাত্রী দেখে দিয়েছি। তখন তো ভাল ছিল। আর এই সমস্যা তো বিয়ের পরেও হতে পারতো, তখন?
বিয়ে হয়ে গেল। স্বামী অনেক ডাক্তার কবিরাজ দেখাল। কিছুতেই কিছু হলো না। কোনও রোগ ধরা পড়ল না। স্বামী খোঁজ করতে করতে এক বৃদ্ধ আলিমের সন্ধান পেল। স্ত্রীকে নিয়ে তার কাছে গেল। জ্ঞানবৃদ্ধ আলিম বললেন:
-আমার যতদূর মনে হয়, তোমার স্ত্রী বদনযরের শিকার হয়েছে। নযরটা এত বেশি গভীর যে, যার দৃষ্টি পড়েছে, সে মারা যাওয়া ছাড়া এই রোগ সারার নয়।
এভাবেই চলছিল দিন। একদিন সকালে স্ত্রী ঘুম থেকে উঠে অবাক হয়ে গেল। আশেপাশের দৃশ্যটা এখন আর আগের মতো অন্ধকার লাগছে না। চারপাশের সবকিছুকে দৃশ্যমান লাগছে। তাড়াতাড়ি ফোনের কাছে গেল। বাড়ির নাম্বারে ডায়াল করলো। রিসিভার ওঠাল বড় ভাই:
-আমিই তোকে ফোন করতে যাচ্ছিলাম।
-এই সাত সকালে আমাকে ফোন কেন? আম্মু কোথায়? তার সাথে কথা বলতে চাই। তাকে একটা খুশির খবর দিতে চাই!
-কি খবর?
-আম্মুকেই সবার আগে খবরটা দিবো।
-শোন, মন খারাপ করিস না। আম্মু আজ ফজরের নামাযের পর, ইন্তেকাল করেছেন!
মেয়ের হাত থেকে রিসিভারটা খসে পড়লো। এক সাথে নানা বিপরীতমুখী অনুভুতি ও চিন্তা মাথায় এসে ভর করলো। চোখের জলে ভাসতে ভাসতে একটা কথা মনে এল, বৃদ্ধ হযুর বলেছিলেন:
-অনেক সময় অতি আপনজন থেকেও বদনযর লাগতে পারে। অতি মুগ্ধতা থেকেই মাঝে মধ্যে নযর লেগে যায়।
আরও মনে পড়লো, সবাই ওযু করতে গেলেও, আম্মু সেদিন ওযু করতে যান নি।
নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
-তোমাদের কারো যদি নিজের প্রতি, সম্পদের প্রতি, আপন ভাইয়ের প্রতি মুগ্ধতা জাগে, তাহলে বরকতের জন্যে দু‘আ করো। কেননা চোখের দৃষ্টি (বদ নযর) সত্য।
শায়েখ আতিকুল্লাহ (দা.বা.)