03/01/2026
"অতিরিক্ত ভালো হওয়া" বা "অতিরিক্ত নরম থাকা" কেন একটি লস প্রজেক্ট বা ক্ষতিকর হতে পারে, তার পেছনে বেশ কিছু মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণ রয়েছে।
নিচে এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো:
১. মানুষ সুযোগ নিতে শুরু করে
আপনি যখন অতিরিক্ত নরম মনের হন, তখন মানুষ ধরে নেয় যে আপনি কখনো 'না' বলতে পারবেন না। আপনার এই দয়া বা বিনয়কে তারা আপনার দুর্বলতা মনে করে। ফলে তারা তাদের নিজের স্বার্থে আপনাকে ব্যবহার করতে দ্বিধাবোধ করে না।
২. আত্মসম্মানবোধ কমে যাওয়া
সবসময় অন্যদের খুশি করতে গিয়ে বা অন্যদের ভালো রাখতে গিয়ে আপনি নিজের ইচ্ছা বা অধিকার বিসর্জন দিয়ে দেন। এর ফলে ধীরে ধীরে আপনার নিজের কাছেই নিজের গুরুত্ব কমে যায়। মানুষ তখন আপনাকে আর সম্মান দেওয়ার প্রয়োজন মনে করে না, কারণ তারা জানে আপনি পরিস্থিতি যাই হোক না কেন মুখ বুজে সহ্য করে নেবেন।
৩. মানসিক চাপ ও হতাশা
অতিরিক্ত ভালো মানুষরা সাধারণত ভেতরের কষ্ট বাইরে প্রকাশ করেন না। তারা ভাবেন, বললে হয়তো অন্য কেউ কষ্ট পাবে। এই চেপে রাখা আবেগগুলো ধীরে ধীরে চরম মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা এমনকি ডিপ্রেশনের দিকে ঠেলে দেয়। অন্যের বোঝা বইতে গিয়ে নিজের মনের শান্তি হারিয়ে যায়।
৪. সঠিক মূল্যায়নের অভাব
যা সহজে পাওয়া যায়, তার মূল্য কম থাকে। আপনি যখন সবার জন্য সবসময় সহজলভ্য (Available) থাকবেন এবং সবার সব আবদার মানবেন, তখন মানুষ আপনার কাজের গুরুত্ব দেওয়া বন্ধ করে দেবে। আপনার ত্যাগগুলোকে তারা "কর্তব্য" হিসেবে ধরে নেবে, "কৃতজ্ঞতা" প্রকাশ করবে না।
৫. ব্যক্তিত্বের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়
অতিরিক্ত নরম মানুষরা সাধারণত মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে ভয় পান। কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে বা নিজের মতামত জোরালোভাবে তুলে ধরতে না পারার কারণে ব্যক্তিত্বের ধার কমে যায়। এতে কর্মক্ষেত্রে বা ব্যক্তিগত জীবনে বড় কোনো নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব হয় না।
৬. অপরাধবোধের বোঝা
অতিরিক্ত নরম স্বভাবের মানুষরা অদ্ভুত এক অপরাধবোধে ভোগেন। কেউ সাহায্য চাইলে যদি কোনো কারণে তারা সেটি করতে না পারেন, তবে তারা নিজেরা অপরাধী বোধ করেন। এই সুযোগটিই সমাজ নেয়—আপনাকে ইমোশনালি ব্ল্যাকমেইল করা তাদের জন্য সহজ হয়ে যায়।
৭. নিজের স্বপ্ন ও সময়ের অপচয়
আপনার হাতে সীমিত সময় এবং শক্তি আছে। আপনি যখন অতিরিক্ত ভালো সেজে অন্যদের সমস্যা সমাধান করতে ছোটেন, তখন আপনার নিজের লক্ষ্য, ক্যারিয়ার এবং ব্যক্তিগত উন্নয়নের জন্য সময় থাকে না। দিনশেষে দেখা যায় অন্যরা আপনার সাহায্য নিয়ে অনেক উপরে উঠে গেছে, আর আপনি সেই আগের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছেন।
৮. চারপাশের মানুষ অলস হয়ে যায়
আপনার অতিরিক্ত 'সহযোগিতা করার মানসিকতা' আপনার কাছের মানুষদের (যেমন ভাই-বোন, বন্ধু বা জীবনসঙ্গী) দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং অলস করে তুলতে পারে। তারা জানে যে কোনো ভুল করলে বা বিপদে পড়লে আপনি তো আছেনই সামাল দেওয়ার জন্য। এতে আপনি পরোক্ষভাবে তাদের ক্ষতিই করছেন।
৯. প্রকৃত বন্ধুর অভাব
শুনতে অবাক লাগলেও এটি সত্যি—অতিরিক্ত ভালো মানুষের চারপাশ লোকে লোকারণ্য থাকলেও বিপদের সময় খুব কম মানুষকেই পাশে পাওয়া যায়। কারণ, বেশিরভাগ মানুষ আপনার কাছে আসে কোনো প্রয়োজনে বা সুবিধার আশায়। কাজ ফুরিয়ে গেলে তারা আর আপনার খবর রাখে না।
১০. বিশ্বাসভঙ্গের বেদনা
অতিরিক্ত ভালো মানুষরা সাধারণত মানুষকে খুব সহজে বিশ্বাস করেন এবং সবার মাঝে নিজের মতো সারল্য খোঁজেন। কিন্তু পৃথিবীটা সব সময় আপনার মতো সরল নয়। যখন প্রিয় কেউ বিশ্বাস ঘাতকতা করে, তখন সেই ধাক্কা সামলানো আপনার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদী মানসিক ক্ষত তৈরি করে।
১১. এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায়:
➡️ "Assertive" হওয়া
অতিরিক্ত নরম হওয়া (Passive) এবং কর্কশ হওয়া (Aggressive)—এই দুইয়ের মাঝামাঝি একটি পথ আছে, যাকে বলা হয় Assertive বা দৃঢ়চেতা হওয়া। এটি করলে আপনার 'লস প্রজেক্ট' লাভে রূপান্তরিত হবে:
➡️ স্পষ্ট কথা বলা: যেটা আপনার পছন্দ নয়, সেটা ঘুরিয়ে না বলে সরাসরি এবং মার্জিতভাবে বলুন।
➡️ মানুষের চরিত্র বুঝতে শেখা: সবাইকে অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে মানুষের আচরণ পর্যবেক্ষণ করুন। যারা শুধু প্রয়োজনের সময় আসে, তাদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখুন।
➡️ আত্ম-বিনিয়োগ: নিজের স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং শখের পেছনে সময় ও অর্থ ব্যয় করাকে প্রাধান্য দিন। এটি স্বার্থপরতা নয়, এটি আত্মরক্ষা।
➡️ সম্মান আগে, ভালোবাসা পরে: মানুষ আপনাকে ভালোবাসুক বা না আসুক, তারা যেন আপনাকে সম্মান করতে বাধ্য হয়—এমনভাবে নিজেকে উপস্থাপন করুন।
➡️ একটি কথা মনে রাখবেন:
সোজা গাছ যেমন আগে কাটা পড়ে, তেমনি অতিরিক্ত নরম মনের মানুষরাই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি আঘাত পায়। লোহা ততক্ষণই কামারের হাতুড়ির পিটুনি খায়, যতক্ষণ সে নরম থাকে; শক্ত হয়ে গেলে হাতুড়িই উল্টো ছিটকে যায়।