05/12/2025
আলোচনার বিষয়: “Speech Sound Disorders – শিশু কেন শব্দ ভুল বলে?”
শিশুর আধো-আধো বোল শুনতে মিষ্টি লাগে। কিন্তু শিশু যখন বড় হতে থাকে, তখন যদি তার কথার স্পষ্টতা না বাড়ে বা সে ক্রমাগত শব্দ ভুল উচ্চারণ করতে থাকে, তবে এটি আর আনন্দের বিষয় থাকে না। বয়স অনুযায়ী কিছু ভুল উচ্চারণ স্বাভাবিক হলেও অনেক সময় ভুল উচ্চারণ স্থায়ী হয়ে যায়—এটাই হলো Speech Sound Disorder (SSD)। এ অবস্থায় শিশুরা শব্দ ঠিকমতো বলতে পারে না, ফলে অন্যরা বুঝতে অসুবিধা হয়। এই সমস্যায় Speech Therapy অত্যন্ত কার্যকর এবং সময়মতো শুরু করলে অসাধারণ উন্নতি দেখা যায়।
🔍 শিশুদের শব্দ ভুল বলার কারণ কী?
1️⃣ ফনোলজিক্যাল প্রসেস সমস্যা:
শিশু শব্দ সহজ করতে গিয়ে নিয়মিত ভুল করে, যেমন:
• “কলা” → “তলা”
• “গাড়ি” → “ডাড়ি”
এই ভুল ৩–৪ বছর পরও থাকলে এটা ফনোলজিক্যাল ডিসঅর্ডার।
2️⃣ আর্টিকুলেশন সমস্যা:
ঠোঁট, জিহ্বা, দাঁত বা মুখের পেশির সমন্বয় দুর্বল হলে শিশুর পক্ষে স্পষ্ট শব্দ বলা কঠিন হয়।
যেমন—
• /র/, /ল/, /স/, /শ/, /ট/ ঠিকমতো না বলা।
3️⃣ ওরাল-মোটর সমস্যা:
মুখের পেশি দুর্বল হলে শব্দ স্পষ্ট হয় না।
শিশু খেতে সমস্যা করতে পারে, লালা বেশি পড়তে পারে।
4️⃣ শ্রবণ সমস্যা (Hearing Loss): শিশু যদি ঠিকমতো শুনতে না পায়, তবে সে ঠিকমতো শব্দ শিখতে বা বলতে পারবে না। অনেক সময় কানে ইনফেকশন বা ফ্লুইড জমার কারণেও সাময়িক বধিরতা থেকে ভুল উচ্চারণ হতে পারে।
5️⃣ঠোঁট ও তালুর সমস্যা (Cleft Lip/Palate): জন্মগতভাবে ঠোঁট বা তালু কাটা থাকলে বাতাসের চাপ নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, ফলে উচ্চারণ নাকে নাকে বা অস্পষ্ট হয়।
6️⃣টাং-টাই (Tongue-tie): জিহ্বার নিচের টিস্যু (Frenulum) খুব ছোট বা শক্ত হলে জিহ্বা নড়াচড়া করতে সমস্যা হয়, যা ‘ল’, ‘র’, ‘ট’ ইত্যাদি উচ্চারণে বাধা দেয়।
7️⃣চাইল্ডহুড অ্যাপ্রাক্সিয়া অফ স্পিচ (Childhood Apraxia of Speech): এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে শিশুর ব্রেইন মুখের পেশীগুলোকে সঠিক নির্দেশ দিতে ব্যর্থ হয়। শিশু জানে সে কী বলতে চায়, কিন্তু মুখ সেটি সঠিকভাবে উৎপাদন করতে পারে না।
8️⃣সেরিব্রাল পালসি বা ডিসার্থ্রিয়া: মুখের মাংসপেশীর দুর্বলতার কারণে স্পষ্ট কথা বলতে না পারা।
9️⃣অজানা কারণ (Functional Causes)
আশ্চর্যের বিষয় হলো, অধিকাংশ শিশুর ক্ষেত্রে ভুল উচ্চারণের কোনো নির্দিষ্ট শারীরিক বা স্নায়বিক কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। তারা সম্পূর্ণ সুস্থ, কিন্তু ভুল অভ্যাসের কারণে বা ধ্বনির পার্থক্য বুঝতে না পারার কারণে ভুল উচ্চারণ করে থাকে।
#স্পিচ থেরাপি কীভাবে সাহায্য করে?
একজন স্পিচ থেরাপিস্ট বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে এই সমস্যার সমাধান করেন। প্রক্রিয়াটি সাধারণত ধাপে ধাপে হয়:
১. মূল্যায়ন (Assessment): প্রথমে আমরা পরীক্ষা করি শিশু ঠিক কোন ধ্বনিটি ভুল করছে এবং কেন করছে। এটি কি জিহ্বার জড়তা নাকি শোনার ভুল, তা নির্ণয় করা হয়।
২. অডিটরি বম্বার্ডমেন্ট (Auditory Bombardment): শিশুকে সঠিক শব্দটি বারবার শোনানো হয় যাতে সে নিজের ভুল এবং সঠিক উচ্চারণের পার্থক্য বুঝতে পারে।
৩. ওরাল মোটর এক্সারসাইজ (Oral Motor Exercises): যদি মুখের পেশী দুর্বল থাকে বা জিহ্বা নাড়াতে সমস্যা হয়, তবে নির্দিষ্ট ব্যায়াম বা ম্যাসাজ করানো হয়।
৪. প্লে-থেরাপি (Play Therapy): শিশুদের জোর করে শেখানো কঠিন। তাই খেলার ছলে, ছবির কার্ড ব্যবহার করে বা গল্পের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ধ্বনিগুলো বারবার অনুশীলন করানো হয়।
👨👩👧 অভিভাবকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ
থেরাপিস্টের কাছে সপ্তাহে ১-২ দিন সেশন যথেষ্ট নয়। আসল পরিবর্তন আসে বাসায় অনুশীলনের মাধ্যমে। অভিভাবকদের জন্য আমার পরামর্শ:
* ভুল ধরিয়ে দেবেন না, সঠিকটি শোনান: শিশু ভুল বললে তাকে বলবেন না, “তুমি ভুল বলছ।” বরং সে যদি বলে “আমি ‘তলার’ (কলার) জুস খাব”, আপনি উত্তর দিন, “আচ্ছা, তুমি কলার জুস খাবে? এই নাও কলার জুস।” একে বলা হয় Recasting।
* ব্যঙ্গ করবেন না: বাচ্চার আধো আধো ভুল কথা শুনে হাসবেন না বা সেটি নকল করবেন না। এতে সে ভুলটিকেই সঠিক মনে করতে শুরু করে।
* বই পড়া: শিশুর সাথে প্রচুর গল্পের বই পড়ুন। শব্দগুলো স্পষ্টভাবে এবং ধীরে উচ্চারণ করুন।
* স্ট্র (Straw) ও বাঁশি: মুখের পেশী শক্ত করতে শিশুকে স্ট্র দিয়ে তরল খেতে দিন বা খেলনা বাঁশি ফুঁ দিতে দিন।
* ধৈর্য ধরুন: একটি শব্দ ঠিক হতে সময় লাগে। বাচ্চার ওপর চাপ দেবেন না।
* বাড়িতে ১০–১৫ মিনিট থেরাপি হোম প্ল্যান চালিয়ে যাওয়া।
* শিশুকে চাপ না দিয়ে আনন্দময় শেখার পরিবেশ তৈরি করা।
*
🌟 কেন সময়মতো Speech Therapy জরুরি?
• ভুল উচ্চারণ ঠিক না করলে স্কুলে পড়াশোনা, বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ—সব জায়গায় সমস্যা হয়।
• শিশুর আত্মবিশ্বাস কমে যায়।
• সময়মতো থেরাপি নিলে ৯০% শিশুরই চমৎকার অগ্রগতি দেখা যায়।
Speech Sound Disorder কোনো ছোট সমস্যা নয়; তবে সঠিক সময়ে স্পিচ থেরাপি এবং অভিভাবকদের সচেতনতা শিশুর আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিতে পারে এবং তাকে স্পষ্টভাষী করে গড়ে তুলতে পারে।