06/02/2026
🌈🌟 প্রতিবেশী থেকে পরিবার: মানবিকতার এক অনন্য বাস্তব গল্প 🤝🏡
মানবিক সম্পর্কের ইতিহাসে এমন কিছু গল্প আছে, যা রক্তের বন্ধনের বাইরে গিয়েও গভীরতার এক নতুন সংজ্ঞা তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ওয়েস্ট হলিউডে বসবাসকারী ক্রিস সালভাতোরে ও তাঁর প্রতিবেশী নর্মা কুকের সম্পর্ক তেমনই এক অনন্য উদাহরণ। এটি কেবল প্রতিবেশীসুলভ সৌজন্যের গল্প নয়; এটি সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ এবং নির্বাচিত পরিবারের এক বাস্তব দলিল।
২০১১ সালের দিকে, ৩১ বছর বয়সী অভিনেতা ও সংগীতশিল্পী ক্রিস সালভাতোরে নতুন একটি অ্যাপার্টমেন্টে ওঠেন। সেখানেই তাঁর পরিচয় হয় বিপরীত দিকের ফ্ল্যাটে বসবাসকারী ৮৯ বছর বয়সী নর্মা কুকের সঙ্গে। নর্মা ছিলেন একজন অবসরপ্রাপ্ত ইন্টেরিয়র ডেকোরেটর। প্রথম পরিচয়ের পর ধীরে ধীরে তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। প্রজন্মের বিস্তর ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও দু’জনের মধ্যে তৈরি হয় সহজ, আন্তরিক সম্পর্ক। প্রায় প্রতিদিনই ক্রিস নর্মার সঙ্গে সময় কাটাতেন—আলাপচারিতা, খাবার ভাগাভাগি, ছোটখাটো উদ্যাপন—সব মিলিয়ে একটি গভীর মানবিক বন্ধন তৈরি হয়।
২০১৬ সালের শেষ দিকে নর্মার দীর্ঘদিনের লিউকেমিয়া গুরুতর আকার ধারণ করে। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তিনি দীর্ঘ সময় হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। চিকিৎসকেরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তিনি আর একা বাস করতে পারবেন না। নিয়মিত সেবাযত্নের প্রয়োজন, যার ব্যয়ভার তাঁর পক্ষে বহন করা সম্ভব ছিল না। বিকল্প হিসেবে সামনে আসে নার্সিং হোমে স্থানান্তরের প্রস্তাব।
কিন্তু নর্মা তাঁর নিজস্ব বাসা ছেড়ে যেতে চাইছিলেন না। এই পরিস্থিতিতে ক্রিস সালভাতোরে ২০১৬ সালের থ্যাঙ্কসগিভিং-এর সময় “Keep Norma Home” শিরোনামে একটি তহবিল সংগ্রহ অভিযান শুরু করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের গল্প ছড়িয়ে পড়ে এবং বিশ্বজুড়ে অসংখ্য মানুষ সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন। অল্প সময়েই উল্লেখযোগ্য অর্থ সংগ্রহ হয়, যা নর্মার চিকিৎসা ও সেবাযত্নে সহায়তা করে।
তবে ক্রিস বুঝতে পারেন, কেবল অর্থনৈতিক সহায়তা যথেষ্ট নয়। শেষ পর্যন্ত তিনি নর্মা ও তাঁর পোষা বিড়াল হারমিসকে নিজের অ্যাপার্টমেন্টে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন। সেখানে তিনি নর্মার দেখাশোনা করেন এবং তাঁর শেষ সময়গুলোকে যতটা সম্ভব স্বাচ্ছন্দ্য ও মর্যাদার সঙ্গে কাটানোর ব্যবস্থা করেন। সামাজিক মাধ্যমে হ্যাশট্যাগের মাধ্যমে তিনি তাঁদের দৈনন্দিন মুহূর্তগুলো ভাগ করে নিতেন, যা বহু মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
২০১৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নর্মা কুক ক্রিসের অ্যাপার্টমেন্টেই শান্তিপূর্ণভাবে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। জীবনের অন্তিম অধ্যায়ে তিনি ছিলেন নিজের পরিচিত পরিবেশে, পরিচিত একজন মানুষের সান্নিধ্যে।
পরে ক্রিস সালভাতোরে তাঁদের সম্পর্কের স্মৃতি ধরে রাখতে My Neighbor Norma নামে একটি শিশুতোষ বই লেখেন। তবে এই গল্পের প্রকৃত গুরুত্ব বই বা সংবাদ শিরোনামে নয়; বরং এই সত্যে যে, সহমর্মিতা ও মানবিকতা প্রাত্যহিক জীবনের সাধারণ সম্পর্ককেও অসাধারণ করে তুলতে পারে।
ক্রিস সালভাতোরে কোনো বাধ্যবাধকতার কারণে নয়, সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে নর্মার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এই ঘটনাটি স্মরণ করিয়ে দেয়—পরিবার কেবল রক্তের বন্ধনে গড়ে ওঠে না; কখনও কখনও তা তৈরি হয় সহানুভূতি, দায়িত্ববোধ এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসা থেকে।