28/12/2025
যখন ADHD ও PMDD একসাথে আঘাত করে: সেই অদৃশ্য ঝড়, যা বেশিরভাগ মানুষ কখনোই দেখে না
ADHD নিয়ে মানুষের আলোচনায় সাধারণত যে বিষয়গুলো আসে—মনোযোগে সমস্যা, ইম্পালসিভ আচরণ, ভুলে যাওয়া—এসব অনেকটাই দৃশ্যমান। কিন্তু ADHD-এর আরেকটি দিক আছে, যা প্রায়ই আড়ালেই থেকে যায়। বিশেষ করে যাদের ADHD-এর পাশাপাশি PMDD (Premenstrual Dysphoric Disorder) রয়েছে, তাদের জন্য এই দিকটি আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ছবির চার্টটি এমন এক বাস্তবতা দেখায়, যা অনেক মানুষ বছরের পর বছর বুঝতেই পারেন না—ADHD-এর লক্ষণ একা একা থাকে না। হরমোনের ওঠানামার সাথে সাথে এগুলোও বাড়ে-কমে। কখনো কখনো এক সপ্তাহ থেকে আরেক সপ্তাহে নিজেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ মনে হতে পারে।
অনেকের কাছেই এই সংযোগটি অদৃশ্য থাকে, যতক্ষণ না তারা নিজে তা অনুভব করেন। কিন্তু একবার যখন এই প্যাটার্নটি চোখে পড়ে, তখন অনেক কিছুই হঠাৎ পরিষ্কার হয়ে যায়।
চক্রের পেছনের গল্প: ADHD ব্রেইন যে ছন্দটা অনুভব করে, বোঝার আগেই
ভাবুন, প্রতি মাসে এমন একটি সময় আসে যখন আপনার ফোকাস, মোটিভেশন, এনার্জি আর আবেগের স্থিতি সপ্তাহভেদে নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। কোনো এক সময় আপনার মন একদম চনমনে—ভাবনা পরিষ্কার, কাজ শুরু করা সহজ, পরিকল্পনা মনে থাকে, লক্ষ্যগুলোর সাথে সংযোগও ভালো লাগে।
তারপর হঠাৎ করেই সব যেন ভেঙে পড়ে।
ফোকাস হারিয়ে যায়।
এনার্জি কমে যায়।
আবেগ অস্থির হয়ে ওঠে।
মস্তিষ্ক ভারী, ধীর আর ঝাপসা লাগে।
ADHD-এ ডোপামিন নিয়ন্ত্রণের সমস্যার কারণে এই ওঠানামা কিছুটা এমনিতেই থাকে। কিন্তু এর সাথে PMDD যুক্ত হলে পার্থক্যটা আরও তীব্র হয়। ছবিতে দেখানো ইস্ট্রোজেনের ওঠানামা শুধু হরমোনের পরিবর্তন নয়—ADHD ব্রেইনের ভেতরে যেন এক ধরনের ভূমিকম্প সৃষ্টি করে।
ইস্ট্রোজেন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, মানুষ যা ভাবেও না
চার্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো ইস্ট্রোজেনের রেখাটি। ইস্ট্রোজেনকে সাধারণত শুধু প্রজনন স্বাস্থ্য দিয়েই ব্যাখ্যা করা হয়, কিন্তু মস্তিষ্কে এর ভূমিকা অনেক গভীর। ইস্ট্রোজেন সরাসরি ডোপামিনের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করে, আর ডোপামিনই ADHD-এর কেন্দ্রে রয়েছে।
যখন ইস্ট্রোজেন বাড়ে, তখন ডোপামিন সিগন্যাল ভালোভাবে কাজ করে। ADHD থাকা কারো জন্য এটি স্বচ্ছতার একটি ছোট জানালার মতো।
ফলিকুলার ফেজে— মস্তিষ্ক হালকা লাগে
এক্সিকিউটিভ ফাংশন ভালো হয়
ফোকাস সহজ হয়
মোটিভেশন স্বাভাবিক মনে হয়
এটা কল্পনা নয়, “আরও চেষ্টা করার” ফলও নয়। এটা পুরোপুরি জৈবিক সহায়তা—যা ADHD ব্রেইন সব সময় পায় না।
কিন্তু ইস্ট্রোজেন কমতে শুরু করলেই, বিশেষ করে লেট লুটিয়াল ফেজে, পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। ডোপামিনে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। কাজ অসম্ভব মনে হয়। আবেগ বেড়ে যায়। বিরক্তি বাড়ে। ছোট সমস্যাও পাহাড়ের মতো লাগে।
যাদের ADHD-এর সাথে PMDD আছে, তাদের জন্য এই সময়টা শুধু অস্বস্তিকর নয়—এটা যেন নিজের মস্তিষ্কের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর মতো অনুভূতি।
লুটিয়াল ফেজ: যেখানে ADHD ও PMDD একে অপরকে বাড়িয়ে তোলে
এটাই সবচেয়ে কঠিন সময়। ছবিতে দেখানো লক্ষণগুলো—অস্থিরতা, ক্লান্তি, এক্সিকিউটিভ ফাংশনের অবনতি, তীব্র মুড সুইং, আবেগের সংবেদনশীলতা, শরীরের অস্বস্তি, মোটিভেশনের হঠাৎ পতন—অনেকেই নীরবে সহ্য করেন।
ADHD থাকা কারো জন্য এই ফেজটা এমন মনে হয়, যেন চিন্তার সাথে ওজন বেঁধে কাজ করতে হচ্ছে।
কাজ শুরু করে মাঝপথে ভুলে যাওয়া
একই বাক্যের দিকে মিনিটের পর মিনিট তাকিয়ে থাকা
শব্দ, আলো বা ছোট চাহিদায় অতিরিক্ত ওভারওয়েলমড হওয়া
নিজের শক্তিগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন মনে হওয়া
আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা
এক সপ্তাহ আগেও যেটা সহজ ছিল, সেটাতেই ব্যর্থ মনে হওয়া
সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর বিষয় হলো—এটা প্রায় প্রতি মাসেই হয়। তবুও প্রতিবারই নতুন করে ধাক্কার মতো লাগে। হরমোনাল সংযোগটা না জানলে, অনেকেই এটাকে নিজের চরিত্রের দোষ মনে করেন। ভাবেন, তাদের ডিসিপ্লিন বা ইচ্ছাশক্তিতে সমস্যা আছে। বাস্তবে, মস্তিষ্ক তখন একটি বড় রাসায়নিক পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে।
আবেগের স্তর: এই চক্র কেন এত কঠিন
লেট লুটিয়াল ফেজ শুধু শারীরিক বা মানসিক নয়—এটা আবেগের গভীরে আঘাত করে। ADHD-তে এমনিতেই আবেগের সংবেদনশীলতা বেশি থাকে। PMDD সেটাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
ছোট ভুল বোঝাবুঝিও ভারী লাগে
সামান্য দেরিকেও ব্যক্তিগত আঘাত মনে হয়
ছোট ভুলও বিপর্যয়ের মতো লাগে
এটা নাটক নয়।
এটা জীববিজ্ঞান—আবেগের ভলিউম ফুল অন করে দেওয়া।
আর যেহেতু অনেক ADHD ব্যক্তি নিজেদের সমস্যাগুলো ঢেকে রাখেন, বাইরের মানুষ খুব কমই বোঝে ভেতরে কী চলছে। বাইরে থেকে তারা ঠিকই কাজ করছেন মনে হয়, কিন্তু ভেতরে চলছে কুয়াশা, ক্লান্তি আর আত্মসন্দেহের লড়াই।
ফলিকুলার ফেজ: নিজের পরিচিত সত্তায় সাময়িক ফেরা
ইস্ট্রোজেন আবার বাড়তে শুরু করলে কিছু একটা বদলে যায়। স্পষ্টতা ফিরে আসে। কাজ সম্ভব মনে হয়। মস্তিষ্ক যেন জেগে ওঠে। অনেকেই বলেন, এই সময়টায় তারা আবার “নিজেদের মতো” অনুভব করেন।
আত্মবিশ্বাস কেমন লাগে, তা মনে পড়ে
রুটিনে ফেরা সহজ হয়
আবার পরিকল্পনা করা শুরু হয়
নিজেকে সক্ষম মনে হয়
এটা শুধু মানসিক স্বস্তি নয়—এটা নিউরোলজিকাল ভারসাম্যের ফেরা। কিন্তু ভালো সপ্তাহ আর কঠিন সপ্তাহের এই তীব্র পার্থক্য অনেক সময় আত্মসমালোচনা তৈরি করে। মনে হয়,
“মাসের কিছু সময় যদি পারি, সব সময় কেন পারি না?”
চার্টটাই এর উত্তর দেয়—আপনার মস্তিষ্ক তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন কেমিস্ট্রিতে কাজ করছে।
এই চক্র বোঝা কেন সবকিছু বদলে দেয়
যখন ADHD থাকা কেউ বুঝতে পারেন যে হরমোনাল চক্রের সাথে তাদের লক্ষণগুলো বদলায়, তখন সেটা একধরনের মুক্তি এনে দেয়। তখন তারা আর নিজেদের অসংগতির জন্য দোষ দেয় না।
হঠাৎ প্রোডাক্টিভিটি কমে যাওয়ার কারণ বোঝা যায়
কেন কিছু সময় আবেগ বেশি হয়, তা পরিষ্কার হয়
কেন রুটিন ভেঙে পড়ে, তা ব্যাখ্যা মেলে
কেন বার্নআউট দ্রুত আসে, তা বোঝা যায়
সচেতনতা বিভ্রান্তিকে বদলে দেয় স্পষ্টতায়।
স্পষ্টতা লজ্জাকে বদলে দেয় বোঝাপড়ায়।
আর বোঝাপড়া সংগ্রামকে করে তোলে কিছুটা হলেও সামলানো সম্ভব।
゚