27/12/2025
ফরিদপুর জিলা স্কুলের ১৮৫ বছর পূর্তির উৎসবকে ঘিরে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলো, তা আমাদের সমাজের আয়নায় অনেকগুলো রূঢ় সত্য তুলে ধরলো। বর্তমানে ফেসবুকে যে 'ভিকটিম ব্লেমিং' চলছে, তা দেখে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
কল্পনা করুন, বহু বছর পর আপনার পরিবারের সব ভাই-বোন এবং আত্মীয়-স্বজন মিলে বাড়ির উঠোনে একটি ঘরোয়া আড্ডার আয়োজন করেছেন। উদ্দেশ্য—শৈশবের স্মৃতিচারণ, হাসি-কান্না ভাগ করে নেওয়া এবং একান্ত কিছু সময় কাটানো। আপনারা হয়তো ভালো কোনো রাঁধুনি এনেছেন বা গান গাওয়ার জন্য একজন শিল্পী বন্ধুকে ডেকেছেন।
এখন, এই খবর পেয়ে যদি পাড়ার ৫০০ জন প্রতিবেশী এসে গেট ধাক্কাতে শুরু করে এবং বলে— "তোমাদের বাড়িতে গান হচ্ছে, ভালো রান্না হচ্ছে, তাই আমাদেরও ঢুকতে দিতে হবে। আমরাও এলাকার মানুষ, আমাদের অধিকার আছে!"—এটা কি কোনো সভ্য সমাজের আচরণ হতে পারে? নিশ্চয়ই না।
ঠিক তেমনি, জিলা স্কুলের রিইউনিয়ন ছিল প্রাক্তন ছাত্রদের একটি বিশাল পারিবারিক মিলনমেলা। তারা নিজেদের পরিবার-পরিজনকে বাড়িতে রেখে এসেছিল শুধুমাত্র বন্ধুদের সাথে সেই একান্ত সময়টুকু কাটানোর জন্য। সেখানে বহিরাগতদের উপস্থিতি কেবল অনাকাঙ্ক্ষিতই ছিল না, বরং তা ছিল সেই ঘরোয়া পরিবেশের ওপর আঘাত। জেমস সেখানে এসেছিলেন নির্দিষ্ট সেই পরিবারের সদস্যদের (ছাত্রদের) গান শোনাতে, কোনো পাবলিক কনসার্ট করতে নয়।
বিয়ের দাওয়াতে যেমন অনাহুত হয়ে ঢুকে বিরিয়ানি দাবি করা যায় না, তেমনি প্রিয় শিল্পী এলেও অন্যের প্রাইভেট ইভেন্টে জোর করে ঢোকা যায় না। এটা আমাদের নাগরিক শিষ্টাচার -এর চরম অভাব।
আরও সহজভাবে ভাবা যাক। আপনি আপনার প্রিয় নায়কের সিনেমা দেখার জন্য স্টার সিনেপ্লেক্সে বা মধুমিতায় গেলেন। গিয়ে দেখলেন সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে অর্থাৎ 'হাউজফুল'। এখন বাইরে হাজারো দর্শক দাঁড়িয়ে আছে যারা টিকিট পায়নি। তারা কি হলের গ্লাস ভেঙে ভেতরে ঢোকার অধিকার রাখে এই বলে যে— "সিনেমাটি তো দেশের সবার জন্য বানানো হয়েছে, নায়ক তো পাবলিক ফিগার?"
উত্তর হলো—না। একটি হলের নির্দিষ্ট ধারণক্ষমতা আছে। সেখানে আসন নেই মানে নেই। জোর করে লোক ঢোকানো মানে ভেতরে যারা টিকিট কেটে বসেছে, তাদের অধিকার হরণ করা এবং পদদলিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করা। জিলা স্কুলের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটেছিল। যারা জোর করে ঢুকতে চেয়েছে, তারা মূলত অরাজকতা সৃষ্টি করেছে, কোনো অধিকারের লড়াই করেনি।
আজ জিলা স্কুলের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানে এমন ন্যাক্কারজনক হামলা হয়েছে। এর ফলে, ভবিষ্যতে ফরিদপুরের অন্য কোনো স্কুল, কলেজ বা সামাজিক সংগঠন বড় কোনো সাংস্কৃতিক আয়োজন করার সাহস পাবে না। তারা দশবার ভাববে— "এত টাকা খরচ করে আয়োজন করব, আর যদি নিরাপত্তা না থাকে বা বহিরাগতরা হামলা করে তবে দায় কে নেবে?"
সবচেয়ে বড় শঙ্কার জায়গাটি হলো—প্রশাসন এখন থেকে আর কোনো বড় অনুষ্ঠানের অনুমতি দিতে দ্বিধাবোধ করবে। নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তারা কঠোর অবস্থানে যাবে। যখনই কোনো সংগঠন কনসার্ট বা উৎসবের অনুমতি চাইবে, প্রশাসন এই ঘটনার উদাহরণ টেনে ঝুঁকি নিতে চাইবে না। ফলে মুষ্টিমেয় কিছু উশৃঙ্খল মানুষের জন্য পুরো শহরের সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার পথটিই হয়তো লাল ফিতায় আটকে যাবে।
গুণী শিল্পীরা ফরিদপুরে আসতে ভয় পাবেন। যারা হামলা করেছে, তারা হয়তো একটি রাত নষ্ট করেছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা ফরিদপুরের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আনন্দ-উচ্ছ্বাসের অনেকগুলো দরজা বন্ধ করে দিল।
আসুন আমরা অনুধাবন করি, অন্যের আনন্দ নষ্ট করে পৈশাচিক সুখ খোঁজা কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না।