26/03/2026
থ্যালাসেমিয়া রোগের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা
ডাঃ মোঃ এখলাছ উদ্দিন আকন্দ
গুলশান হোমিও হল
কোনাবাড়ী ,গাজীপুর। ০১৭১১৭০২৯৮৭
থ্যালাসেমিয়া রোগ অত্যন্ত মারাত্মক বিপদজনক ও আশঙ্কা জনক হলেও হোমিওপ্যাথিতে লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসার মাধ্যমে এই রোগের চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব ।
যথাযথ আন্তরিকতার সাথে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার মাধ্যমে এই রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া খুব সহজ।
থ্যালাসেমিয়া সাধারণত: পিতা-মাতার রক্তের কারণে বাচ্চাদের জন্মগত রোগ যা থ্যালাসেমিয়া। থ্যালাসেমিয়া রোগের লক্ষণ রোগী ক্ষেত্রে ভিন্ন রকম। প্রকৃতভাবে থ্যালাসেমিয়া রোগীর রক্ত শরীরের মধ্যে তৈরী না হওয়ার প্রবনতাটা বেশী। এছাড়াও সহজে ঠান্ডা লাগা, হাত পা কামড়ানি ব্যাথা, চোখ হলুদ ভাব, পায়খানা-প্রস্রাব হলুদ, মুখের আকৃতি পরিবর্তন, নাক বিকৃতি, শীর্ণতা, মাথার আকৃতি পরিবর্তন, চুল লালচে হয়ে যাওয়াসহ পেট বড় হওয়া ও বিভিন্ন প্রকার লক্ষণ প্রকাশ পায়।
থ্যালাসেমিয়া এটি একটি ল্যাটিন নাম। নামটি দুভাগ করে পাওয়া যায় থ্যালাসা ও মিয়া। থ্যালাসা অর্থ সাগর এবং মিয়া অর্থ রক্ত। এরোগের চিকিৎসায় অতিরিক্ত রক্তের প্রয়োজন হয় বলেই হয়তো এর নাম রক্তসাগর। থ্যালাসেমিয়ার প্রধান পরিচায়ক লক্ষণ হল- শিশুর রক্তে লোহিত কণিকা নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ধ্বংস হতে শুরু করে ফলে রক্তশুণ্যতা দেখা দেয়।
থ্যালাসেমিয়া রক্তের এমন একটি মারাত্মক রোগ যা শিশুরা বংশগতভাবে তাদের পিতা-মাতা থেকে পেয়ে থাকে। বিজ্ঞানীদের মতে, সাধারণত: চাচাত ভাই-বোনদের মধ্যে বিয়ে হলে সন্তানদের থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এই রোগীদের রক্তের লাল কণিকা (RBC) তাড়াতাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে তাদের রক্তের হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কম থাকে এবং আয়রণের পরিমাণ বেড়ে যায়। একারণে এদেরকে ২০/৩০ দিন পর পর রক্ত দিতে হয় ও শরীর থেকে অতিরিক্ত আয়রন বের করার জন্য ঔষধ খেতে হয়। খুব ছোট শিশুদের মধ্যে রক্তশূণ্যতা, জ্বর, শারীরিক বৃদ্ধি না হওয়া, প্লীহা বড় হয়ে যাওয়া, ইত্যাদি লক্ষণ দেখে থ্যালাসেমিয়া রোগ সন্দেহ করা এবং রক্তের বিশেষ মাইক্রোস্কোপিক পরীক্ষার মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।
পরিসংখ্যাণ অনুযায়ী বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় এক লাখ শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)'র মতে, সারা বিশ্বে প্রায় দশ কোটির বেশি লোক বিভিন্ন ধরনের বিটা থ্যালাসেমিয়ার জিন বহন করে। ফলে প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ শিশুর জন্ম হচ্ছে জটিল থ্যালাসেমিয়া রোগ নিয়ে। আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া রোগীর সঠিক কোনো পরিসংখ্যাণ নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, বিশ্বে ৬.৫ শতাংশ মানুষ থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত৷ আর বাংলাদেশে ৪ থেকে ৮ শতাংশ মানুষ থ্যালাসেমিয়া ও হিমোগ্লোবিন ডিজঅর্ডার- যা থ্যালাসেমিয়ার কাছাকাছি অবস্থা সেটি বহন করছে। প্রতি বছর ৭ হাজার শিশু এই রোগ নিয়ে জন্ম নিচ্ছে। থ্যালাসেমিয়া ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে দেশে প্রায় ষাট হাজার থ্যালাসেমিয়া রোগী রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২০০৯ সালের হেলথ বুলেটিন অনুযায়ী, সরকারি হাসপাতালে ভর্তি ৫-১৪ বছর বয়সী রোগীদের মধ্যে এই রোগের অবস্থান দশম।
স্বাভাবিক রক্তের হিমোগ্লোবিনে মোট আট জোড়া জিনের মধ্যে আলফা, বিটা ও গামা বা ডেল্টা চেইন থাকে। যখনই কোন চেইনের ঘাটতি হয়, তখনই এই রোগের সৃষ্টি হয়। স্বাভাবিক রক্তে আলফা ও বিটা চেইন থাকে শতকরা ৯৭ ভাগ। শিশুদের ক্ষেত্রে এই চেইন থাকে শতকরা ৭০-৯০ ভাগ। তিন প্রকার হিমোগ্লোবিনের মধ্যে অন্যতম হল ফিটাল হিমোগ্লোবিন। শিশুর জন্মের পর এক মাস বয়সে তা কমে ২৫%এ দাঁড়ায় এবং ছয় মাস বয়সে তা নেমে আসে শতকরা পাঁচ ভাগে। ফিটাল হিমোগ্লোবিন কমে যেয়ে এডাল্ট হিমোগ্লোবিন বেড়ে ৯০-৯৫%এ উন্নীত হয়। এই যে পরিবর্তন তা সুস্থ শিশুতে দেখা যায়। কিন্তু কোন কারণে এর ব্যতিক্রম ঘটলে সৃষ্টি হয় থ্যালাসেমিয়া।
রক্তের লোহিত কণিকার আয়ুকাল তিন মাস। লোহিত কণিকা অস্থিমজ্জায় অনবরত তৈরি হচ্ছে এবং তিন মাস শেষ হলেই প্লীহা লোহিত কণিকাকে রক্ত থেকে সরিয়ে নেয়। থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে লোহিত কণিকার আয়ুকাল অনেক কমে যায়। তাদের হিমোগ্লোবিন ঠিকমতো তৈরি না হওয়ায় লোহিত কণিকাগুলো সহজেই ভেঙে যায় এবং একই হারে লোহিত কণিকা তৈরি সম্ভব হয়ে ওঠে না। এর ফলে একদিকে যেমন রক্তশূণ্যতা সৃষ্টি হয়, অন্যদিকে প্লীহা আয়তনে বড় হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত আয়রণ জমা হয়ে হৃৎপিন্ড, প্যানক্রিয়াস, যকৃত, অন্ডকোষ, ইত্যাদি অঙ্গের কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দেয়।
থ্যালাসেমিয়া হয়েছে কিনা বোঝার কিছু উপায় হচ্ছে-
মারাত্মক রক্ত শূণ্যতা, উৎসাহহীনতা, সামান্য পরিশ্রমে হাঁপিয়ে ওঠা, মাথা ঘোরা, বুক ধড়ফড় করা অর্থাৎ রক্তশূন্যতার যাবতীয় লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া, অতিরিক্ত আয়রন, সংক্রমণ, অস্বাভাবিক অস্থি, প্লীহা বড় হয়ে যাওয়া, অবসাদ অনুভব, দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, মুখ-মন্ডল ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, অস্বস্তি, মুখের হাড়ের বিকৃতি, ধীরগতিতে শারীরিক বৃদ্ধি, পেট বাইরের দিকে প্রসারিত হওয়া বা বৃদ্ধি পাওয়া, গাঢ় রঙের প্রস্রাব, হৃৎপিণ্ডে সমস্যা, খাওয়ায় অরুচি এবং ঘন ঘন ডায়ারিয়া ও জ্বর হওয়া, যৌনাঙ্গের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত, দেহের আকৃতি স্বাভাবিকের চেয়ে ছোট, ইত্যাদি।
এছাড়াও পরীক্ষার মাধ্যমে বোঝার কিছু উপায় হচ্ছে-
ক/ রক্ত পরীক্ষায়:
১/ সিরাম বিলিরুবিন লেভেল খুব বেশি থাকে।
২/ প্লাজমা হেপাটোগ্লোবিন লেভেল খুব কমে যায়।
৩/ প্লাজমা হিমোপেক্সিন লেভেল কমে যায়।
৪/ প্লাজমা ফ্রী-হিমোগ্লোবিন, মেথেম এলবুমিন লেভেল বেড়ে যায়।
৫/ পেরিফেরাল রক্ত পরীক্ষায় লোহিত কণিকার সংখ্যা কমে যায় ও রেটিকিউলোসাইটের সংখ্যা খুব বেড়ে যায়। রক্তে সিকেল সেল, স্ফেরোসাইট, এলিপটোসাইট ও টার্গেট সেল, ইত্যাদি পাওয়া যায়।
৬/ পেপার-ইলেকট্রোফোরেসিস পরীক্ষার দ্বারা জানা যায় হিমোগ্লোবিন পিকের অস্বাভাবিকতা।
খ/ প্রস্রাবে ইউরো বিলিনোজেন লেভেল বেড়ে যায়।
গ/ মলে ষ্টারকো বিলিনোজেন লেভেল বেড়ে যায়।
ঘ/ মাথার হাড়ের ডিপ্লোয়িক স্পেস বৃদ্ধি পায়।
যে অঙ্গ দিয়ে সমস্যাযুক্ত হিমোগ্লোবিন তৈরি হচ্ছে, সে অঙ্গ মানে বোনম্যারো বা অস্থিমজ্জা সংযোজনের মাধ্যমে একে সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব তবে আমাদের দেশে এটা এখনো চালু হয়নি। হোমিওপ্যাথিতে সকল প্রকার জটিল ও কঠিন রোগের চিকিৎসা করা সম্ভব, যা এ্যালোপ্যাথিতে কোনো দিনই সম্ভব না। হোমিওপ্যাথি লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা তাই রোগীর লক্ষণকে সামনে রেখে ঔষধ প্রয়োগ করলে রোগীর সে কষ্টকর লক্ষণগুলি চলে যাবে এবং রোগী রোগ মুক্ত হয়ে যাবে।
যেহেতু এই রোগের চিকিৎসায় প্রচুর টাকা খরচ হয়,সেহেতু মধ্যবিত্ত বা দরিদ্ররা এই রোগে আক্রান্ত হলে ভিখারী হতে বেশী সময় লাগে না। এতো পয়সা খরচ করেও এসব শিশুদেরকে সাধারনত বিশ- এিশ বছরের বেশী বাঁচানো যায় না। আর এটি একটি মারাত্মক genetic disease বিধায় খুব একটা নিরাময় হয় না বলে সবাই বিশ্বাস করত। তবে ইদানীং বিভিন্ন দেশের অনেক হোমিও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অগণিত থ্যালাসিমিয়া রোগীকে সম্পূর্ণরূপে আরোগ্য করার দাবী করেছেন যাদের ডিসচার্জ করার ৫-৬ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। হোমিওপ্যাথির দুইশ বছরের ইতিহাসে দেখা গেছে এমন সব কঠিন রোগও খুব সহজে নিরাময় হয়ে যায় যা অন্যান্য চিকিৎসা বিজ্ঞানে একেবারে অবিশ্বাস্য মনে করা হয়ে থাকে। হোমিও স্পেশালিষ্টদের মতে, আল্লাহর রহমতে শতকরা পঞ্চাশভাগ থ্যালাসেমিয়া রোগীকে হোমিও চিকিৎসার মাধ্যমে পুরোপুরি রোগ মুক্ত করা সম্ভব। অবশিষ্ট থ্যালাসেমিয়া রোগীরা সম্পূর্ণ রোগমুক্ত না হলেও অভিজ্ঞ হোমিও চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসা নিলে মাসে বা বছরে একবার রক্ত নিলেই চলে।
থ্যালাসেমিয়া রোগটি দুই পর্যায়ের হতে পারে প্রাথমিক এবং মাঝারি থেকে মারাত্মক। দুই পর্যায়ের থ্যালাসেমিয়ার জন্য আলাদা ধরণের চিকিৎসা রয়েছে।
ধৈর্য্য ধরে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা নিলে ইংশা-আল্লহ সুফল পাওয়া যাবে। প্রাথমিক থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে লক্ষণ ও উপসর্গ খুবই কম থাকে। ফলে খুবই অল্প চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। ব্যতিক্রম কিছু ঘটলে যেমন- কোন বড় অপারেশন করা হলে কিংবা গর্ভবতী মা সন্তান প্রসবের পর অথবা অন্য কোনো কারণে রক্ত দেয়ার প্রয়োজন
পড়তে পারে।
মাঝারি বা মারাত্মক পর্যায়ের থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে রোগের পর্যায় অনুসারে বছরে বেশ কয়েকবার রোগীকে রক্ত দেয়ার প্রয়োজন হতে পারে ও ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ধৈর্য্য ধরে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে।