08/02/2026
একদা মাওলানা রুমির নিমন্ত্রণে তার উস্তাদ শামস তাব্রিজি এলেন এক রাতে। খাওয়াদাওয়া শেষে, রুমির কাছে মদের আবদার করে বসলেন ওস্তাদজী।
রুমি স্তব্ধ! "আপনি মদ্যপান করেন?" তাব্রিজির শান্ত জবাব, "হ্যাঁ।"
শিষ্য ইতস্তত, যেতে চান না মদ আনতে— "মদ আনতে গেলে তো আমার মানসম্মান সব শেষ হয়ে যাবে! সমাজে আমাদের একটা সম্মান আছে!"
গুরু পরামর্শ দিলেন— "কোনো সেবককে পাঠাও, নিয়ে আসবে।" রুমি হতভম্ব— "এ কী করে সম্ভব! ওদের কাছে আপনার-আমার মানমর্যাদা যে ধূলোয় মিশে যাবে!"
"তাইলে তুমি নিজেই যাও"— নাছোড় নির্বিকার শামস তাব্রিজির আদেশ।
ভয়ার্ত, বিব্রত রুমি বেরিয়ে পড়লেন। লুকিয়ে-চুরিয়ে হাঁটা ধরলেন পরিচিত এক মদ্য-পল্লীর দিকে। চারদিকে তাকিয়ে, ঢুকে গেলেন শুঁড়িখানায়। মদ-ভর্তি একটি বোতল কিনে, আলখাল্লার ভিতরে লুকিয়ে, বেরিয়ে এলেন তিনি দ্রুত। জনৈক পরিচিত দেখে ফেললো তাকে, মদ কিনতে।
খবর ছড়িয়ে পড়লো। তাকে অনুসরণ করতে লাগলো বিরাট জনতার দল, চুপচাপ, অন্ধকারে। মসজিদের দুয়ারে আসতেই, উচ্চ শব্দে হইহই করে উঠলো অনুসৃত দলের রুষ্ট কণ্ঠ, "হায় ইমাম, এত জ্ঞান দেন অথচ মদ কিনে আনলেন কোন সাহসে আপনি! হায়!"
আলখাল্লার নিচ থেকে, লুকোনো মদের বোতল উদ্ধার করলো ক্ষিপ্ত জনতা। শুরু করলো থুতু নিক্ষেপ, হাত তুলতে উদ্ধত হলো কেউ, সম্মানিত-পাগড়ি টেনে ফেলে দিলো ধূলোয়।
রুমির মুখে শব্দ নেই, তিনি অপরাধবোধ ও ভয়ে নির্বাক। ক্ষুব্ধ জনতার ক্রোধ বাড়তে থাকলো, মাওলানাকে হ'ত্যার ইচ্ছে পোষণ করলো কেউ কেউ।
তখনই মসজিদ থেকে বেরিয়ে এলেন গুরু শামস তাব্রিজি। ক্ষুব্ধ স্বরে ধিক্কার জানালেন উন্মত্ত জনতাকে, "ধিক্ তোমাদের! ধিক্! তোমরা কোন বিবেকে ভেবে নিলে যে, মাওলানা জালালুদ্দিন রুমির মতো মানুষ মদ্যপান করেন? এ-ই তোমাদের বিবেচনা?
রুমির দিকে তাকিয়ে বললেন,বোতলটি খুলে জনসম্মুখে দেখাও, ওটায় আছে সিরকা, রান্নার জন্য। বোতলটি খোলা হলো। ওটা সিরকায় ভর্তি। রুমি নিজেও অবাক!
মারমুখী জনতা স্তম্ভিত, লজ্জিত, অনুতপ্ত। নিজেদের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চেয়ে বিদায় নিলো তারা।
মসজিদে প্রবেশ করলেন উভয়ে। শামস তাব্রিজি জানালেন শিষ্যকে— "আসার সময় শুঁড়িওয়ালাকে বলে রেখেছিলাম, তুমি এলে সে যেন তোমাকে সিরকা-ভর্তি বোতল দেয়।" মাওলানা রুমি অভিমান করলেন— "কেন আমার সম্মান নিয়ে এমন কৌতুক করলেন আপনি?"
শামস উত্তর দিলেন, "যাতে তুমি এ শিখতে পারো যে: মানুষের দেওয়া সম্মান মূলত একধরণের মোহ। সামান্য একটু সন্দেহের বশবর্তী হয়ে যারা তোমাকে চরম অপমান করে তুমি যেনো সম্মানের জন্য তাদের মুখাপেক্ষী কখনো না হও। হৃদয়কে মানুষ থেকে এমনভাবে অমুখাপেক্ষী করো, মানুষের প্রশংসা কিংবা অপমান কোনোটাই যেনো তোমার অন্তরে প্রভাব সৃষ্টি করতে না পারে।"
সত্যই সম্মান এক ধরনের মোহ। প্রশংসা ও সমালোচনার উর্ধ্বে উঠতে পারলেই স্বাধীনতার স্বাদ উপভোগ করা যায়।
* সংগৃহীত ও ঈষৎ পরিমার্জিত