26/03/2026
১. শুরুতে কথা: ডিএমএফ চিকিৎসকরা আসলে কে?
ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল ফ্যাকাল্টি (ডিএমএফ) একটি স্বীকৃত মেডিকেল ডিপ্লোমা কোয়ালিফিকেশন। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমঅ্যান্ডডিসি) এই ডিগ্রিধারীদের নিবন্ধন দেয়। নিবন্ধন পাওয়ার অর্থ হলো—তারা আইনত রোগী দেখতে পারে, প্রয়োজনমতো ওষুধ লিখতে পারে (নির্ধারিত সীমার মধ্যে) এবং চিকিৎসা দিতে পারে। অর্থাৎ তাদের কাজ অনেকটাই ডাক্তারী করা।
কিন্তু সমস্যা হলো, এখন তাদের যে নামে ডাকা হয়, সেটা যেন টেকনিশিয়ানের মতো। আর এই অস্পষ্ট পরিচয়ের কারণেই তারা প্রায়ই ভুয়া চিকিৎসক (কোয়াক) বলে অপমানিত হন। অথচ তাদের কাছে বিএমঅ্যান্ডডিসির বৈধ নিবন্ধন আছে, যা কোয়াক ডাক্তারদের থাকে না।
তাই তাদের পেশাগত পরিচয়ও এমন হওয়া উচিত, যা তাদের আসল কাজের প্রতিফলন করে।
২. নিবন্ধন মানেই ডাক্তার শ্রেণির অন্তর্ভুক্তি—না হলে নিবন্ধনের মানে কী?
বিএমঅ্যান্ডডিসি নিবন্ধন দেওয়ার অর্থ হলো—এই ব্যক্তি চিকিৎসা পেশার একজন বৈধ সদস্য।
—If being a BM&DC‑registered “practitioner” does not qualify one as a doctor tier—though at a lower or primary level—then what is the purpose of such registration?
সহজ ভাষায়: যাকে আপনি “প্র্যাকটিশনার” বলে নিবন্ধন দিচ্ছেন, সে যদি ডাক্তার না হয়, তাহলে সে কী? আর যদি ডাক্তার হয়, তবে তার উপাধি যেন তা স্পষ্ট করে।
৩. কেন “সহকারী চিকিৎসক” বা সমমর্যাদার পদবী?
আইনশাস্ত্রে একটি বিশেষ্য (Noun) যখন একটি বিশেষণ (Adjective) বা অন্য কোনো শব্দের সাথে যুক্ত হয় (যেমন: Diploma Doctor, Assistant Doctor), তখন তা মূল শব্দের একক অর্থকে রূপান্তরিত করে একটি নতুন “Legal Identity” তৈরি করে।
আইনশাস্ত্রে বা ভাষাতত্ত্বে এটি একটি প্রতিষ্ঠিত নীতি যে—
➡️ একটি মূল শব্দের আগে যখন কোনো Qualifier (বিশেষক/Adjective) যুক্ত হয়, তখন তা একটি নতুন অর্থ এবং স্বতন্ত্র পরিচয় (Distinct Identity) তৈরি করে।
ধরে নিলাম ‘ডা.’ (ডাক্তার) হলো পূর্ণাঙ্গ এমবিবিএস/বিডিএস চিকিৎসকদের জন্য সংরক্ষিত মূল উপাধি।
এর আগে ‘সহকারী’ বা ‘ডিপ্লোমা’ যুক্ত করলে যে যৌগিক উপাধি (Compound Title) তৈরি হয়, তা মূল ‘ডা.’-এর ছায়া নয়, বরং একটি স্বতন্ত্র আইনি সত্তা—যা আইনের ভাষ্যে ‘প্রতিষ্ঠিত নীতি’ (Settled Principle)।
এখানে “সহকারী চিকিৎসক” (Assistant Doctor) বা "ডিপ্লোমা ডা:" অনুরূপ কোনো মর্যাদাসম্পন্ন উপাধী বেশ কয়েকটি কারণে কার্যকর সমাধান হতে পারে। নিচে বিষয়গুলো খুলে বলা হলো—
ক. আইনি দিক থেকে ঠিক আছে
২০১০ সালের “বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল আইনে”- বিভিন্ন স্তরের মেডিকেল শিক্ষা ও নিবন্ধনের কথা বলা আছে। ২০২৬ সালের মার্চে হাইকোর্ট একটি রায় দিয়েছেন যাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ডিএমএফদের পরিচয় সংকট সমাধান করতে। আর ধারা ২৯-এ নিবন্ধিত ব্যক্তিদের কিছু শর্তে চিকিৎসা করার অনুমতি রয়েছে। “সহকারী/ডিপ্লোমা চিকিৎসক” নামটি এই আইনি কাঠামোর মধ্যেই পড়ে।
‘সহকারী ডা.’ বা ‘ডিপ্লোমা ডা.’ লেখা
মানে হলো—
ব্যক্তি নিজেকে মূল বা বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হিসেবে দাবি না করে বরং সচেতনভাবে স্বীকার করে নিচ্ছেন যে তিনি একজন নিম্নস্তর বা ডিপ্লোমা পর্যায়ের চিকিৎসাসেবাদাতা।
খ. ইতিহাসের সঙ্গেও মিলে যায়
১৯৮০ সালের “বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল অর্ডিন্যান্স”-এ ডিএমএফ ডিগ্রিধারীদের স্বীকৃত চিকিৎসক বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। তখন থেকেই তারা সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে চিকিৎসা দিয়ে আসছেন। তাই আজ নতুন করে কোনো অজানা ব্যবস্থা চালু হচ্ছে না—বরং পুরনো স্বীকৃতিকেই বর্তমান সময়ের উপযোগী একটি পদবির মাধ্যমে সুস্পষ্ট করা হচ্ছে।
গ. বাস্তব কাজের সঙ্গে নামের মিল
একজন ডিএমএফ চিকিৎসক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, প্রাইভেট ক্লিনিকে বা কমিউনিটি ক্লিনিকে রোগী দেখেন। তিনি রোগী নির্ণয় করেন, প্রয়োজনীয় ওষুধ লিখে দেন, প্রাথমিক চিকিৎসা করেন। “সহকারী চিকিৎসক” নামটি এই কাজের সাথে মানানসই। এটি বোঝায়—তিনি একজন ডাক্তার, তবে জটিল ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ এমবিবিএস/বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেবেন। এটি ডাক্তারের মধ্যে একটি স্তর, টেকনিশিয়ানের কোনো নাম নয়।
ঘ. রোগীর জন্য সুবিধা
বর্তমানে রোগী বিভ্রান্ত হন। অনেক রোগী মনে করেন ডিএমএফধারীরা আসলে ডাক্তার কিনা। “সহকারী চিকিৎসক” নাম শুনলে রোগী সহজেই বুঝতে পারবেন—ইনি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একজন ডাক্তার, তবে এমবিবিএস/বিশেষায়িত নন; স্বাস্থ্যসেবার প্রথম ধাপে আছেন। এতে রোগীর আস্থা বাড়ে, ভুয়া চিকিৎসকের হাতে পড়ার আশঙ্কা কমে।
ঙ. আন্তর্জাতিক উদাহরণ আছে
ভিয়েতনাম/চীনে দীর্ঘদিন ধরে “অ্যাসিস্ট্যান্ট ডক্টর” (助理医师) নামে একটি স্তর রয়েছে। তারাও বিএমঅ্যান্ডডিসির মতো কাউন্সিলের নিবন্ধন পান, রোগী দেখতে পারেন এবং নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে চিকিৎসা দেন। এই ব্যবস্থা সফলভাবে চীনের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী করেছে। বাংলাদেশও সেই পথে হাঁটতে পারে।
চ. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: পরিচয় রক্ষা ও কোয়াক থেকে পৃথক করা
বর্তমানে ডিএমএফ চিকিৎসকদের “টেকনিশিয়ান”, “প্যারামেডিক” বা অস্পষ্ট নামে ডাকা হয়। এর ফলে একদিকে যেমন তাদের পেশাগত মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ তাদেরকে ভুয়া ডাক্তার (কোয়াক) বলে গালি দেয়। অথচ কোয়াক ডাক্তারদের বিএমঅ্যান্ডডিসির নিবন্ধন থাকে না, তারা অবৈধভাবে চিকিৎসা করে।
“সহকারী/ডিপ্লোমা চিকিৎসক” নাম দিলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে—তিনি নিবন্ধিত একজন ডাক্তার, শুধু উচ্চতর ডিগ্রি নেই। এতে ডিএমএফ চিকিৎসকরা আর কোয়াকদের সাথে মিশে যাবেন না। তাদের বৈধ অবস্থান সবার সামনে স্পষ্ট হবে।
৪. সরকারের করণীয় আর সময়সীমা
হাইকোর্ট ডিএমএফ চিকিৎসকদের পরিচয় সংকট সমাধানে নির্দেশ দিয়েছেন এবং এজন্য ছয় মাস সময় বেঁধে দিয়েছেন।
এর মানে, সরকারের কাছে এখন একটি নির্দিষ্ট সময় আছে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান দেওয়ার। “সহকারী চিকিৎসক” বা সমমর্যাদাপূর্ণ পদবী একটি পরীক্ষিত ও কার্যকর পথ। এই সময়ের মধ্যে সরকার যদি এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে, তাহলে—
· হাইকোর্টের নির্দেশনা পালন হবে,
· ডিএমএফ চিকিৎসকদের বহুদিনের পরিচয় সংকটের সমাধান হবে,
· প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় কর্মী সংকট কিছুটা হলেও কমবে, কারণ এই চিকিৎসকরা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করছেন,
· আর সবচেয়ে বড় কথা, ভুয়া ডাক্তার আর বৈধ ডিএমএফ চিকিৎসকের মধ্যে একটি পরিষ্কার বিভাজন তৈরি হবে, যা রোগীদের জন্যও নিরাপদ।
৫. শেষ কথা
ডিএমএফ চিকিৎসকরা দেশের স্বাস্থ্যসেবার একটি বড় অংশ জুড়ে আছেন। বিএমঅ্যান্ডডিসির নিবন্ধন থাকার পরেও তাদের নামকরণে অবহেলা করা হচ্ছে। তাঁরা চান না একটি টেকনিশিয়ানের মতো নাম তাঁদের পরিচয় মুছে ফেলুক। তাঁরা চান একটি মর্যাদাসম্পন্ন পদবী—যা বুঝিয়ে দেবে, তাঁরা নিম্নস্তরের হলেও বৈধ ডাক্তার, কোয়াক নন।
“সহকারী ডা:” কিংবা "ডিপ্লোমা ডা:" প্রিফিক্স আইনি, ঐতিহাসিক, বাস্তবসম্মত, রোগী-বান্ধব ও আন্তর্জাতিক মানের। এটি কোয়াক ডাক্তারদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার সুযোগ দূর করে। সরকারের উচিত দ্রুত এই সিদ্ধান্ত নিয়ে হাইকোর্টের আদেশ বাস্তবায়ন করা এবং স্বাস্থ্যখাতে একটি স্থায়ী সমস্যার সমাধান দেওয়া।