07/03/2026
শুভ জন্মদিন ! ড্যানিয়েল ডেভিড পালমার ।
১৮৯৫ সাল। আমেরিকার আইওয়া অঙ্গরাজ্যের ডেভেনপোর্ট শহর।
একটি সাধারণ অফিস ভবনের জানিটর হার্ভি লিলার্ড দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে প্রায় কিছুই শুনতে পাচ্ছিলেন না। একদিন ভবনের একজন চিকিৎসক তাঁর পিঠে একটি অস্বাভাবিক উঁচু স্থান লক্ষ্য করলেন এবং সেই জায়গায় হাতের নিয়ন্ত্রিত চাপ প্রয়োগ করলেন। কয়েকদিনের মধ্যে লিলার্ড জানালেন — তিনি আবার শুনতে পাচ্ছেন।
সেই চিকিৎসকের নাম ড্যানিয়েল ডেভিড পালমার। আর সেই মুহূর্তটি ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে আছে কাইরোপ্র্যাকটিক চিকিৎসার জন্মক্ষণ হিসেবে।
পালমার জন্মেছিলেন ১৮৪৫ সালের ৭ই মার্চ, কানাডার অন্টারিও প্রদেশের একটি ছোট্ট গ্রামে। মাত্র ১১ বছর বয়সে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শেষ। ২০ বছর বয়সে পরিবারের সাথে আমেরিকায় পাড়ি জমালেন। এরপর জীবনের নানা বাঁকে কাজ করেছেন মৌচাষী হিসেবে, স্কুলশিক্ষক হিসেবে, মুদির দোকানদার হিসেবে।
কিন্তু মানুষের শরীর ও স্বাস্থ্য নিয়ে তাঁর কৌতূহল কখনো থামেনি। ১৮৮০-এর দশক থেকে তিনি "ম্যাগনেটিক হিলিং" বা চুম্বকীয় নিরাময় পদ্ধতির চর্চা শুরু করেন। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে গড়ে উঠল তাঁর মৌলিক চিন্তাভাবনা।
পালমারের মূল বিশ্বাস ছিল অত্যন্ত সরল কিন্তু গভীর। তিনি মনে করতেন, মানবদেহে একটি প্রাকৃতিক নিরাময় শক্তি আছে — যাকে তিনি বলতেন "Innate Intelligence" বা সহজাত বুদ্ধিমত্তা। এই শক্তি স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে সারা শরীরে প্রবাহিত হয়। যখন মেরুদণ্ডের কশেরুকা সামান্য স্থানচ্যুত হয় — যাকে বলা হয় "Subluxation" — তখন এই প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং রোগের জন্ম হয়।
সমাধান? ওষুধ নয়, অস্ত্রোপচার নয়। সঠিক হাতের চাপে মেরুদণ্ডের সেই স্থানচ্যুতি ঠিক করে দাও — শরীর নিজেই সুস্থ হয়ে উঠবে।
সেই সময়ের চিকিৎসা সমাজ এই ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। পত্রিকায় তাঁকে "কোয়াক" বলে উপহাস করা হয়েছিল। কিন্তু পালমার দমেননি।
১৮৯৭ সালে পালমার ডেভেনপোর্টে প্রতিষ্ঠা করলেন "দ্য পালমার স্কুল অ্যান্ড কিউর" — যা পরবর্তীতে Palmer College of Chiropractic নামে পরিচিত হয় এবং আজও সক্রিয়।
তবে পথ সহজ ছিল না। ১৯০৬ সালে লাইসেন্সবিহীন চিকিৎসার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হলো। জরিমানা দেওয়ার বদলে তিনি বেছে নিলেন কারাবাস — ১৭ দিন জেল খাটলেন। এই ঘটনার পর তিনি স্কুলটি পুত্র বি.জে. পালমারের কাছে বিক্রি করে পশ্চিম আমেরিকায় চলে গেলেন এবং সেখানে নতুন কাইরোপ্র্যাকটিক স্কুল গড়তে সহায়তা করলেন।
১৯১৩ সালের ২০শে অক্টোবর লস অ্যাঞ্জেলেসে পালমার মৃত্যুবরণ করেন।
আজ বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে কাইরোপ্র্যাকটিক চর্চা হচ্ছে। আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপে এটি লাইসেন্সপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা পেশা। মেরুদণ্ডের ব্যথা, ঘাড়ের ব্যথা ও মাথাব্যথায় এই চিকিৎসা বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে স্বস্তি দিচ্ছে।
বাংলাদেশেও এই চিকিৎসার প্রসার ঘটছে। ঢাকা রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন শহরে এখন পেশাদার কাইরোপ্র্যাকটিক ও অস্টিওপ্যাথি সেবা পাওয়া যাচ্ছে — অস্ত্রোপচার বা ওষুধ ছাড়াই মেরুদণ্ড ও জয়েন্টের সমস্যার সমাধান হচ্ছে।
যে মানুষটিকে একদিন "কোয়াক" বলা হয়েছিল, আজ তাঁর নামেই পরিচিত একটি সম্পূর্ণ চিকিৎসা বিজ্ঞান। ড্যানিয়েল ডেভিড পালমার প্রমাণ করে গেছেন — সত্যিকারের বিশ্বাস এবং অদম্য সাহস থাকলে ইতিহাস বদলানো সম্ভব। 💙