21/03/2026
" ঈদের ডিউটি "।
সরকারি চাকরিতে ঢোকার পর, ১৯৮৫ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত , 'স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের' বদান্যতায়ই হোক অথবা বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারভুক্ত হওয়ার
আজন্ম পাপেই হোক, একই পদে (মেডিকেল অফিসার হিসাবে)দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত উপজেলা হাসপাতালে কর্মরত থাকতে হয়েছে একটানা সুদীর্ঘ ২৬ বছর।
এই ২৬ বছরে, ৫২ যোগ ১, মোট ৫৩ টি ঈদের দিন হাসপাতালে ডিউটি করতে হয়েছে।
ডিউটি মানে ঈদের আগের দিন সন্ধ্যায় হাসপাতালে ঢুকে,ঈদের পরের দিন সকাল ১০টা নাগাদ ছাড়া পাওয়া, অর্থাৎ মোটামুটি ৪০ ঘন্টা একটানা হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ডিউটি রুমে অবস্থান করতে হত।
ঈদের আগের দিন সন্ধ্যায় বাসা থেকে টিফিন ক্যারিয়ারে রাতের খাবার নিয়ে হাইবারনেশনে চলে যেতাম।
এজন্য কোন আক্ষেপ ছিল না, দুঃখবোধ ও ছিলনা, কর্তৃপক্ষের কোন চাপও ছিলনা, নিজ দায়িত্বে, সানন্দ চিত্তে, এই ৪০ ঘন্টার একটানা ডিউটি নিজের কাঁধে নিয়ে নিতাম। কারন আমি ছিলাম বরাবরের মতই একমাত্র নন মুসলিম মেডিকেল অফিসার। তাই কলিগরা যখন ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়া, শশুড় বাড়ি যাওয়া, বিয়ের দাওয়াতে যাওয়া ইত্যাদি বহুবিধ যাওয়া নিয়ে দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়তেন, তখন ত্রাণকর্তার মত আবির্ভূত হয়ে, তাদেরকে ছুটি দিয়ে দিতাম।
একজন হিন্দু নার্স, একজন হিন্দু পরিচ্ছন্নতা কর্মী আর স্বয়ং আমি, এই ৩ জন মিলে ৪০ ঘন্টার জন্য হাসপাতালের পুরা দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে নিতাম, আর কাওকেই প্রয়োজন হত না।
ডিউটি রুমে আয়োজন একেবারে মন্দ থাকতো না। ঘুমানোর মত বেড, বিশুদ্ধ পানির ফিল্টার, রংগীন টেলিভিশন, কয়েকদিনের পেপার- পত্রিকা, উপন্যাস সবই হাতের কাছে থাকতো।
সিস্টার তার ডিউটি রুমে থাকতেন, ওয়ার্ডবয় অথবা পরিচ্ছন্নতা কর্মীরও ঘুমানোর ব্যবস্থা হত।
সমস্যা হত পরদিন থেকে খাবার দাবারের, খাবার দাবারের দোকান, রেঁস্তরা সব বন্ধ থাকতো।
মাঝে মাঝে আশে পাশের বাড়ি থেকে দাওয়াত পাওয়া যেত, কিন্তু সেটা ছিল অনিয়মিত এবং ঝুঁকিপূর্ণ, কারন দাওয়াত খেতে গেলে দুর্গ অরক্ষিত থাকতো, আর কোন অঘটন ঘটলে এই সময়টুকুর মধ্যেই ঘটে যেতে পারতো, তাই ও পথে না গিয়ে নিজেরাই, মানে পরিচ্ছন্নতা কর্মী কর্তৃক রান্নার আয়োজন চলতো। বলতে দ্বিধা নাই, এই খাবারটা ছিল সরকারি খাবারের অংশ, অর্থাৎ,ডায়েট কন্ট্রাক্টর কর্তৃক সরবরাহকৃত।
অনেকে বলতে পারেন এটাতো অনৈতিক! , হ্যা, এইটুকু অনৈতিক কাজ মনের বিরুদ্ধে হলেও মেনে নিতে হত।
বেশিরভাগ সময় তেমন কাজ থাকতো না, আবার কোন কোন সময় একের পর এক মুমূর্ষু রোগী আসতে থাকতো। ঈদের সময় রোগী আসা মানে আমরা মানসিক ভাবেই প্রস্তুত থাকতাম অতীব জরুরি রোগীর জন্য, আর তা সর্বোতভাবে মোকাবেলার প্রস্তুতি আমাদের থাকতো।
কোন কোন রাত ক্রমাগত খারাপ রোগী চলে আসতে থাকতো, প্রচণ্ড শ্বাস কষ্ট নিয়ে আসতো কেউ, এক দংগল লোক হুরমুর করে ঢুকে পরতো দেখা যেত সাথে স্ট্রোকের রোগী, ডেলিভারি ব্যাথ্যায় কাতরাতে কাতরাতে আসতো অসহায় মা, ছোট বাচ্চা মারাত্মকভাবে আক্রান্ত নিউমোনিয়া বা ডায়রিয়া নিয়ে চলে আসতো। খারাপ লাগতো যখন ঈদের দিনেও মারামারি করে মারাত্মক জখম নিয়ে আসতো আর মারামারির রেশ ধরে আমাদের উপরেও ঝাড়ি মারার চেষ্টা করতো, সেই সংগে চিকিৎসা শুরুর আগেই জখমী সার্টিফিকেট এর জন্য পিড়াপিড়ি শুরু করতো।কোন কোন সময় একসাথে অনেক জন রোগী, রোড ট্রাফিক এক্সিডেন্ট এর কারনে বিভিন্ন রকমের জখম নিয়ে চলে আসতো।
একসাথে ম্যানেজ করতে গিয়ে কিছুটা হিমশিম খেতে হত।
আরো খারাপ লাগতো যখন উৎসবের দিনে, স্বামী - স্ত্রী সামান্য ঝগড়া, বা শশুড় - শাশুড়ির সামান্য গঞ্জনা সইতে না পেরে- নববধূ, কৃষকের ঘরের অতি পরিচিত কীটনাশক পান করে চলে আসতো জরুরি বিভাগে।
অতি কষ্টকর 'স্টমাক ওয়াশ ' ও অন্যান্য চিকিৎসা দিয়ে বাঁচানোর চেষ্টা করা হত, বেঁচে গেলে খুবই ভাল লাগতো, কিন্তু মারা গেলে মরে যাওয়ার শোকের সাথে যুক্ত হত আইনগত ঝুট ঝামেলা, থানাতে জানাতে হত,
থানা থেকে লোক না আসা পর্যন্ত আমাদেরকেই চোখে চোখে রাখতে হত নববধূর লাশ।
একজন মুমূর্ষু রোগীকে এম্বুলেন্সএ সদরে পাঠানোর পরপরই যদি আরো একজনকে পাঠানোর প্রয়োজন হত, তখন বিড়ম্বনায় পরতে হত।
এই সব মোকাবিলা করতে করতে কখনো কখনো রাত পার হয়ে যেত, আমাদের খাওয়াই হত না।
এর উপরে যদি স্থানীয় প্রভাবশালী কেউ বা তার আত্মীয়স্বজন কেউ, তথাকথিত জরুরি রোগী দেখাতে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য পিড়াপিড়ি করতো তখন মেজাজ ধরে রাখা, শান্ত থাকা, সত্যিই কষ্টকর হয়ে যেত।
এতদসত্বেও আমরা মনে হয় সানন্দে কাজ করে যেতাম এবং ভাল লাগতো, মনে হত আমরা একটা ছোট্ট দল,স্বাভাবিক সময়ে নয়, যুদ্ধকালীন সময়ে -
সার্বক্ষণিক যুদ্ধে নিয়োজিত আছি এবং সে যুদ্ধে
আমাদের হেরে গেলে চলবে না!।
এত সবের মধ্যেও গুরুচরন দাষ, পোলাও - মাংশ রান্না করে ফেলতো কোন এক ফাঁকে, আমরা খেয়েও নিতাম পালাক্রমে। কাজ কমে গেলে, টিভিতে ঈদের অনুষ্ঠান ও দেখা হত ফাকে ফাকে।
ভাল লাগতো যখন দেখতাম অসুস্থ্য বাচ্চা দ্রুত সুস্থ্য হয়ে যাওয়ার পর মুহুর্তেই, বাবা মা পোটলা পাটলি নিয়ে একটা অনেক বড় ধন্যবাদ জানিয়ে, দ্রুত বাড়ির দিকে ছুটে যেত ঈদ উদযাপনের উদ্দেশ্যে।
শ্বাসকষ্টের রোগীটি একটু আরাম পেতেই তাকে ঘিরে থাকা আপনজনেরা উশখুশ করতো বাড়ি যাওয়ার জন্য, তাদেরকে বলতাম ' তোমাদের বাবার সকল দায়িত্ব আমরা নিলাম, তোমরা নিশ্চিন্তে গিয়ে ঈদ কর, '
তাদের মুখে হাসি দেখা যেত, দল বেধে ঈদের জামাত ধরতে চলে যেত, লম্বা একটা ধন্যবাদ জানাতে ভুলতোনা।
বিষ খাওয়া রোগীকে মৃত অবস্থায় আনা হয়েছে, থানায় খবর দিতে হবে,লাশ নিয়ে টানা হেচড়া হবে, পোষ্ট মর্টেম হবে, টাটকা খবরের নেশায় দুই একজন সাংবাদিক ফোনও দিতে শুরু করেছে, তার পর ও অসহায় দরিদ্র পরিবারের মুখের দিকে তাকিয়ে, রিস্ক নিয়ে বলে দিয়েছি, "লাশ বাড়ি নিয়ে যাও, বাড়িতেই মারা গিয়েছে, এখানে আনা হয়নি, রেজিস্টারএও নাম লেখা হয়নি, স্থানীয় চেয়ারম্যান কে বলে লাশ দাফনের ব্যবস্থা কর গিয়ে"। তখন ভীত সন্ত্রস্ত আতংকিত মুখগুলোর মধ্যে কিঞ্চিৎ ভরসা দেখে ভাল লাগতো।
ইদানীং দেখা যাচ্ছে, আমাদের তরুন চিকিৎসকেরা ঈদের ডিউটি নিয়ে অনেকেই উষ্মা প্রকাশ করছেন।
তাদের উদেশ্যে আমার কিঞ্চিৎ বয়ান আছে, ২৬ বছরের ঈদ ডিউটির সময় আমি লক্ষ্য করেছি, এই ছুটির সময় শুধু আমরা চিকিৎসকরাই দায়িত্ব পালন করি না, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, পুলিশ, ফায়ার ব্রিগেড কর্মী, বিদ্যুৎ কর্মী, টেলিফোন কর্মীসহ আরো অনেকেই জরুরি দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
ইদানীং আরো একটি বিষয় চিকিৎসকদের ক্ষোভের কারন হয়েছে, তা হল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক ইস্যুকৃত একটি পত্র, যাতে বলা হয়েছে - " ঈদের পরদিন সীমিত আকারে হাসপাতাল আউটডোর খোলা রাখতে হবে "।
এটা খুব যুক্তিযুক্ত বলে ব্যাক্তিগত ভাবে আমি মনে করি না। একজন চিকিৎসক যে কিনা ঈদের ছুটিতে খুলনা গিয়েছেন, তার পক্ষে কীভাবে ঈদের পরদিন কর্মস্থল বগুড়াতে উপস্থিত হয়ে সীমিত আকারের আউটডোর সেবা প্রদান সম্ভব তা বোধগম্য নয়।
আমার ২৬ বছরের ঈদ ডিউটির অভিজ্ঞতায় বলতে পারি ২ জন নিবেদিত চিকিৎসা কর্মকর্তা, আর কয়েকজন সাপোর্ট স্টাফ মিলে ঈদের ৩ দিনের ছুটির সময় খুব ভাল ভাবে উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও ইনডোর সার্ভিস দেওয়া সম্ভব, এমনকি জেলা হাসপাতালেও।
বিষয়টি নীতি নির্ধারণকারী কর্তৃপক্ষের সুবিবেচনার দাবী রাখে।
এই ঈদের দিনেও সব পর্যায়ের হাসপাতালে একজন না একজন চিকিৎসক আপনার যে কোন স্বাস্থ্যগত বিপদ মোকাবিলার নিমিত্তে নিয়োজিত আছেন।
আপনার ঈদ উদযাপন সুখকর ও আনন্দদায়ক হোক।
ভাল থাকুন, সুস্থ্য থাকুন, -- ঈদ ( ইদ) মোবারক।
ডাঃ সুকুমার সুর রায়।