30/03/2026
নিম্নবর্গের সাংবাদিকতা ও তাজু ভাই
আরবানদের সংকট কোথায়?
১. স্থানীয় রাস্তাঘাটের অবস্থা নিয়ে আগের মতো মিডিয়াতে তেমন রিপোর্ট হয় না। আর যদি গ্রামের হয়, তাহলে তো প্রশ্নই ওঠে না সেটা নিয়ে মিডিয়া রিপোর্ট করবে। তাজু ভাই এলাকার লোকদের ধরে ধরে জিজ্ঞাসা করছেন, এলাকার কোন রাস্তাটি খারাপ। স্থানীয়রা সেটাতে মন্তব্য করছেন, নিজেদের ভোগান্তির কথা বলছেন।
তাজু ভাই শেষে বলছেন, নতুন সরকার, নতুন এমপি; এই সড়কগুলো যেন তারা ঠিক করে দেয়।
২. একই বিষয়ে আরেকটা কনটেন্ট তাজু ভাইয়ের দেখলাম। একটা এলাকার মানুষ নৌকায় উঠছে, মোটরসাইকেলও নৌকায় তুলছে। নৌকায় উঠতে যে কষ্ট হচ্ছে, সেটা তাজু ভাই তাঁর ভিডিওচিত্রে ফুটিয়ে তুলেছেন।
এটাও কুড়িগ্রামের নারায়ণপুর ইউনিয়নের যোগাযোগের করুণ দৃশ্যকে তুলে ধরেছে।
৩. কুড়িগ্রাম থেকে ট্রেনে কখন যেতে হবে, সেই সময়সূচির ওপর তাজু ভাইর একটি ছোট কনটেন্ট আছে। সেটা গরিব মানুষের জন্য দরকারি।
৪. রাজমিস্ত্রির শ্রমিকদের নিয়ে তাজু ভাইর একটি কনটেন্ট আছে। সেখানে তিনি দেখাচ্ছেন, শীতের রাতে শ্রমিকেরা কীভাবে কাজ করছেন; পেছনে আগুন জ্বালিয়ে কাজ করছেন। তাজু ভাইর এই কাজটি অসাধারণ। এই কনটেন্টের মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারছি শ্রমিকেরা কী ভয়াবহ কষ্ট করেন। এই কষ্টের কথা মেইনস্ট্রিম মিডিয়া বলছে না।
৫. কৃষকদের ফসল উৎপাদন নিয়ে একটি কনটেন্ট তিনি বানিয়েছেন। সেখানে দেখা যাচ্ছে, সরিষাক্ষেতে সেচ দেওয়ার কারণে সরিষার ফলন ভালো হয়েছে—সেটা তিনি বলছেন।
ঢাকার বড় অংশের সাংবাদিকেরা জানেন না আদৌ সরিষা চাষ কীভাবে হয়। সরিষা আসলে রবিশস্য। এই শস্য উৎপাদনে পানি ব্যবহার করা হয় না। কিন্তু তাজু ভাই আমাদের জানাচ্ছেন, সেচ ব্যবহার করলে শস্যের উৎপাদন বাড়ে। এটা বাংলাদেশের কৃষকদের জন্য নতুন একটা জ্ঞান।
৬. কুড়িগ্রামের নারায়ণপুরে একটি নদীর দুর্ভোগের ওপর তাজু ভাইয়ের কয়েকটা কনটেন্ট আছে। তার মধ্যে এই কনটেন্টটি রীতিমতো দুর্দান্ত। তিনি বলছেন, কুড়িগ্রামের গরিব এলাকায় গরু নদী পার হয়ে ঘাস খেয়ে আবার নদী পার হয়ে আসে। কমেন্ট করে জানায় দেন, তাহলে নতুন সরকার নতুন এমপি নারায়ণপুরে একটা ব্রিজ করে দেবে।
৭. সব থেকে আলোচিত কনটেন্ট হলো—জিলাপির দাম কি সরকারি রেটে বিক্রি হচ্ছে? এই কনটেন্টটি দেখেছেন ৫৬ লাখ মানুষ। এই কনটেন্টটি নিয়ে তাজু ভাইর ওপর রীতিমতো হামলে পড়েছে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীরা।
২০২৬ সালের রমজান মাসে ঢাকার পাঁচ তারকা হোটেল ‘দ্য ওয়েস্টিন ঢাকা’-তে প্রতি কেজি জিলাপির দাম ৪ হাজার টাকা ছিল। ইলিয়েন-এর পাঞ্জাবি আপনাদের বাচ্চা বাচ্চা নেতারা কেনেন ৩৫ হাজার টাকায়, 'হাউস অব আহমেদ'-এর একটি পাঞ্জাবির দাম ৫ লাখ টাকায় কেনেন আপনারা শহুরেরা। আর কুড়িগ্রামের এই চরের মানুষের হয়তো 'হাউস অব আহমেদ'-এর একটি পাঞ্জাবির দাম সমান তাদের জীবনের ৫ বছরের আয়। ফলে আপনারা কখনো বুঝবেন না—সরকারি রেটে কেন জিলাপি বিক্রি দরকার। কারণ আপনারা তো এক কেজি জিলাপি কিনতে পারেন ৪ হাজার টাকায়।
আপনাদের কখনোই বোঝা সম্ভব না, কুড়িগ্রামের তীব্র শীতের ভেতর খোলা জায়গায় নির্মাণশ্রমিকেরা যে কাজ করেন সেটা কত কষ্টের। তাদের মিনিমাম সেফটি ব্যবস্থা নেই। সেটাই তিনি তাঁর কনটেন্টে ফুটিয়ে তুলেছেন।
মিডিয়ার দায় কার কাছে?
গণমাধ্যমের প্রধান দুটি কাজ: ১. ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা। ২. ভয়েসলেস-এর ভয়েস বা ক্ষমতাহীনদের স্বার্থ রক্ষা করা। কিন্তু আমাদের মিডিয়া এসব কি করে? করে না। অবশ্য বৈশ্বিকভাবেও এই সাংবাদিকতা আজ নাই হয়ে গেছে।
ধরুন, ঢাকার একটি বড় ব্র্যান্ড হলো রাঁধুনী। আমরা রাঁধুনীর শুকনা মরিচের গুঁড়া কিনে খাই। ১০০ গ্রাম রাঁধুনী গুঁড়া মরিচ ও ১০০ গ্রাম হলুদের গুঁড়ার দাম ধরুন ৭৫ টাকা। ৫০০ গ্রাম ধনিয়ার গুঁড়ার দাম ৭৫০ টাকা। আপনারা কি জানেন, কুড়িগ্রামের ঠিক কত টাকা কেজিতে শুকনা লাল মরিচ বিক্রি করে কৃষক? আপনারা কি জানেন শুকনা হলুদ ও শুকনা ধনিয়ার কেজি কত?
কুড়িগ্রামের এসব গ্রাম এলাকায় এক কেজি শুকনা মরিচের দাম ৮০ টাকার নিচে, শুকনো হলুদের দাম কাছাকাছি কেজিতে বিক্রি হয়। সব থেকে অবাক হবেন ধনিয়ার দাম শুনলে। শুকনা ধনিয়া প্রতি কেজি সিজনে ৮০ থেকে ৮৫ টাকা।
এটার সাথে গণমাধ্যমের দায় ও তাজু ভাইর কনটেন্ট বানানোর সম্পর্ক কী? খুব বড় সম্পর্ক রয়েছে। কৃষকরা যে ফসলের ন্যায্যমূল্য পায় না, আর সেই গরিব কৃষকের পণ্য ঢাকা বা শহরে এলে ৭ বা ৮ গুণ দামে আমরা ভোক্তারা কিনছি—এই প্রশ্নটাই করার কথা ছিল। যদি ধরেন এটাই তাজু ভাইর সরকারি রেট আর আপনারা বিদ্বান তাদের ভাষায় ন্যায্যমূল্য। এখন আপনারা তো দিনের পর দিন এই সাংবাদিকতা করেন নাই। কারণ কী?
কারণ হলো, রাঁধুনীর সাথে পত্রিকাওয়ালারা মিলে দিবস উদযাপন করে। তারা রাঁধুনীর নামে নারীকে তুলে ধরে, কিন্তু নারী কৃষকের যে ঘাম ঝরানো ফসলের দাম থেকে বঞ্চিত হয়, সেটা কিন্তু আধুনিক ঢাকার আরবান মিডিয়া বলে না। কারণ করপোরেট স্বার্থ। বছরে এই ধরনের করপোরেটের কাছ থেকে দেশের মিডিয়াগুলো শত শত কোটি টাকা আয় করে থাকে। তাহলে এই মিডিয়াগুলো তো করপোরেটের মুখ ও তার স্বার্থ ছাড়া কিছুই প্রকাশ করে না।
অন্যদিকে তাজু ভাই, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম বা রিসার্চ মেথডোলজি শিখায় এমন কোনো ডিপার্টমেন্টে পড়েন নাই। তিনি আঞ্চলিক শব্দ ছাড়া বলতে পারেন না। তাজু ভাই জানেনও না নোয়াম চমস্কি নামে একজন মানুষ আছেন, যিনি দেখিয়েছেন কনসেন্ট বা সম্মতি কেমনে আদায় করে। এই থিওরি তাজু ভাই জানেন না। কিন্তু যারা জানেন, সেই আরবান এলিট জার্নালিস্ট ও তাদের হাউস কোনোদিন কৃষকের ফসলের দাম না পাওয়ার গল্প এভাবে কানেক্ট করেন না যে এর জন্য রাঁধুনী দায়ী বা এরকম করপোরেট ব্র্যান্ডগুলো দায়ী। কারণ তাদের রসের ঠিলা তো করপোরেটের খেজুর গাছে বাঁধা আছে।
আর তাজু যে কিনা এসব জানেন না, না জেনেও অ্যাকাডেমিকভাবে ঠিকঠাক সাংবাদিকতা করে ফেলেন, ঠিক তখন আরবান মিডলক্লাসরা ব্যাপক ক্ষেপে যান। তখন আমরা বুঝতে পারি, ‘তোমার কোথায় কোথায় ব্যথা গো ললিতা।’