02/11/2022
হোমিওপ্যাথি হল আসলে একটা বুজরুকি, আরো অনেক হোমিওপ্যাথির কট্টর সমালোচক অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসকের মত তাঁরও ছিল এই মত, আর সেই তাঁর হাতেই কিনা এল মর্গানের ফিলজফি অফ হোমিওপ্যাথির সমালোচনা লেখার কাজ!! এবার কড়া করে বুজরুকদের একটা জবাব দিতে হবে, ভেবে পড়া শুরু করলেন বইটি। তারপর কী হল??
তার আগে একটু এই অসম্ভব মেধাবী, নাস্তিক, বিজ্ঞান সাধকের সম্পর্কে একটু জেনে নেওয়া যাক। ২রা নভেম্বর ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে হাওড়ার পাইকপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মহেন্দ্রলাল সরকার। পিতার নাম তারকনাথ সরকার। খুব অল্প বয়সে পিতা মাতা দুজনকেই হারিয়ে মামাদের তত্ত্বাবধানে মানুষ হতে থাকেন। অসম্ভব মেধাবী এবং বিজ্ঞানে উৎসাহী মানুষটি স্কুলের পড়া শেষ করে মেডিসিন নিয়ে পড়ার জন্য ভর্তি হন কলকাতা মেডিকেল কলেজে। মেধাবী ছাত্রটি কিছুদিনের মধ্যেই হয়ে ওঠেন অধ্যাপকদের প্রিয়পাত্র। এইসময়ে তাঁর মেধা এতটাই বিকশিত হয় যে উঁচু ক্লাসের ছাত্রদের লেকচার দিতে ডাক পড়ত তাঁর। ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে অনার্স সহ এল এম এস ডিগ্রী এবং ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় ভারতীয় ছাত্র হিসেবে এমডি ডিগ্রী লাভ করেন।
কর্মজীবনে স্বাধীন ভাবে প্র্যাকটিস শুরু করেন এবং অল্পদিনের মধ্যেই চিকিৎসক হিসেবে নাম ছড়িয়ে পড়ে। কলকাতায় ব্রিটিশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি ও পরে সহ সভাপতি হন।
এইসময়ে কলকাতার বিখ্যাত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক ছিলেন বাবু রাজেন্দ্রলাল দত্ত, যাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় কলকাতায় তৈরি হয় একটি হোমিওপ্যাথিক হাসপাতাল। বহু বিখ্যাত ব্যক্তির চিকিৎসক ছিলেন তিনি, এবং বঙ্গদেশে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা প্রচলনে তাঁর অবদান অপরিসীম।
ডাক্তার সরকার প্র্যাকটিস শুরু করার কিছুদিন পর ১৮৬৩ সালে ‘ব্রিটিশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন’-এর বঙ্গীয় শাখার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে গিয়ে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাপদ্ধতিকে ‘হাতুড়ে চিকিৎসা’ বলে কটাক্ষ করেন। মহেন্দ্রলাল ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের সম্পাদক। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই ঘটনা অন্যদিকে মোড় নেয়। মহেন্দ্রলালের অ্যালোপ্যাথি থেকে হোমিওপ্যাথিতে ঢুকে পড়া এক অপ্রত্যাশিত ও আকস্মিক ঘটনা। এই মত পরিবর্তনের ব্যাখ্যা তিনি নিজেই করে গিয়েছিলেন তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা ‘ক্যালকাটা জার্নাল অব মেডিসিন’-এ। ১৯০২ সালের জুলাই সংখ্যায় তিনি লেখেন: ডাক্তার হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তাঁর পরিচিত এক ব্যক্তি ‘ইন্ডিয়ান ফিল্ড’ নামক একটি পত্রিকার জন্য ডাক্তার মরগ্যানের লেখা ‘ফিলোজফি অব হোমিওপ্যাথি’ বইটির সমালোচনা লিখতে অনুরোধ করেন। ডাক্তার সরকার ভাবেন, হোমিওপ্যাথির মুণ্ডপাত করার এই এক সুবর্ণসুযোগ। কিন্তু বইটি পড়তে পড়তে ক্রমশ তাঁর দৃষ্টি উন্মোচিত হতে থাকে এবং সমালোচনা লেখার সময় তিনি স্বীকার করেন, হোমিওপ্যাথ মেডিকেল সিস্টেম সম্পর্কে এতদিন কিছু না জেনেই তিনি অন্ধের মতো বিরুদ্ধ-মত পোষণ করে গেছেন। অবশ্য বিনা পরীক্ষায় তাঁর মত পরিবর্তন হয়নি। রাজেন্দ্র দত্তের হাসপাতালে রীতিমত রোগীদের দুটি গ্রুপে ভাগ করে তাদের ওপর পরীক্ষা চালান যে সত্যিই ওষুধের গুণে ভাল হচ্ছে নাকি পথ্য এবং শুশ্রুষার জন্য সেরে উঠছে। ১৮৬৭ সালের মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের চতুর্থ বার্ষিক সভায় তিনি বক্তৃতা দেন, এবং স্পষ্টভাবে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাকে অ্যালোপ্যাথির থেকে শ্রেষ্ঠ বলে মত প্রকাশ করেন। ফলস্বরূপ বহিষ্কৃত হন ব্রিটিশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন থেকে। বন্ধুবান্ধব শুভানুধ্যায়ীরা হঠকারিতা থেকে সরে আসার পরামর্শ দেন। কিন্তু তিনি লক্ষ্যে অবিচল। তাঁর কথা থেকে জানা যায় হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা শুরু করার পর প্রথমদিকে যখন পেশেন্ট হত না, তখন তিনি চেম্বারে বসে মনোযোগ সহকারে বিভিন্ন মেটিরিয়া মেডিকা পাঠ করতেন। যা পরে কাজে লেগেছিল তাঁর। ধীরে ধীরে রাজেন্দ্রলাল দত্তের সহযোগিতা এবং নিজের মেধার জোরে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক হিসেবে খ্যাতিলাভ করতে থাকেন, এবং বাঙলা তথা দেশের এক লব্ধপ্রতিষ্ঠ চিকিৎসক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। বহু বিখ্যাত ব্যক্তির চিকিৎসক ছিলেন তিনি, চিকিৎসক হিসেবে তাঁকে নিয়ে অনেক কাহিনী প্রচলিত, যা এই স্বল্প পরিসরে লেখা অসম্ভব। তবে সবচেয়ে আলোচিত রামকৃষ্ণ পরমহংসের চিকিৎসক হিসেবে তাঁর ভূমিকা। শ্রীরামকৃষ্ণের গলার ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য ডাক পড়ে তাঁর। নাস্তিক মানুষটি আদৌ রামকৃষ্ণের অবতার তত্ত্ব বা এইসবে পাত্তা দিতেন না। সোজাসুজি জিজ্ঞেস করেছিলেন "এইসব পরমহংসগিরি করছ কেন??" কিন্তু ধীরে ধীরে এই দুই নাস্তিক এবং আস্তিক মানুষের মধ্যে এক অদ্ভুত হৃদ্যতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে, পরবর্তীকালে দেখা যাবে ডাঃ সরকারের অন্যান্য সব কীর্তির থেকে শ্রীরামকৃষ্ণের চিকিৎসক হিসেবেই অধিক পরিচিতি ছড়াবে।
দেশবাসীর বিজ্ঞানচর্চার উন্নতিকল্পে আজীবন বিজ্ঞানব্রতী এই মানুষটি ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করেন ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দি কালটিভেশন অফ সায়েন্স। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সহ দেশের জ্ঞানীগুণী এবং ধনী মানুষেরা সামিল হয়েছিলেন তাঁর এই উদ্যোগে। আমৃত্যু এই সংস্থার সম্পাদক ছিলেন ডাঃ সরকার, পরবর্তীকালে এখানেই গবেষণা করে নোবেল পুরস্কার পান ডঃ সি ভি রমন। অথচ সেই মহেন্দ্র ডাক্তারকেই ১৮৭৮-এর এপ্রিল মাসের মিটিং-এ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বিজ্ঞান সমিতি’ সেনেটের সদস্যপদ থেকে বিতাড়িত করতে উদ্যত হয়। বিরক্ত মহেন্দ্রলাল নিজেই ভাইস-চ্যান্সেলরকে দুটি চিঠি লিখে পদত্যাগ করেন।
নামকরা হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক ছিলেন কিন্তু কট্টর ছিলেন না। বিজ্ঞানমনস্ক হওয়ার কারণে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে মহেন্দ্রলালের কোনও গোঁড়ামি ছিল না। তাঁর এই স্বাধীন দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণ রয়েছে ১৮৭৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরকে লেখা চিঠিদুটিতে। সেখানে তিনি হিপোক্রেটিসের চিকিৎসা পদ্ধতি সহ ভিন্ন ধারার চিকিৎসা দর্শন নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি লেখেন— ‘হ্যানিম্যান বিশ্বাস করেন, রোগমুক্তির একটিমাত্র পথ, অন্য পথ নেই। এই ধরনের ভাবনা কিন্তু ঠিক নয়। বিভিন্ন পথেও রোগ মুক্তি ঘটে।’ ম্যালেরিয়া হলে তখন হ্যানিম্যানের পথ নয়, বরং কুইনাইনই একমাত্র চিকিৎসা বলে তাঁর মত ছিল। একইরকমভাবে পৃথক ধারার চিকিৎসকদের কাছেও তাঁর নিবেদন ছিল, হোমিওপ্যাথিকে অগ্রাহ্য করার কোনও কারণ নেই। তাঁর কাছে কোন পথে চিকিৎসা হচ্ছে তা জরুরি নয়, সর্বাগ্রে জরুরি রোগীর পীড়ার উপশম।
সমাজ সংস্কারক হিসেবেও তাঁর ভূমিকা কম নয়। ডা সরকারের পরামর্শে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার সরকারি বিবাহবিধি প্রণয়নে ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে ম্যারেজ অ্যাক্ট থ্রি অনুসারে মেয়েদের বিবাহের ন্যূনতম বয়স ষোল বৎসর নির্ধারণ করে। তিনি ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনের সভাপতিত্ব করেন। তার সভাপতিত্বে অসমের চা শ্রমিকদের দুরবস্থার সম্বন্ধে প্রস্তাব নেওয়া হয়। তিনি শ্রমিকদের অপমানসূচক "কুলি" শব্দ ব্যবহারে আপত্তি করেন। দেওঘরে তিনি তার স্ত্রীর নামে রাজকুমারী কুষ্ঠাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন।
ডা সরকার ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো হন। ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার শেরিফ, অনারারি ম্যাজিসেট্রট নির্বাচিত হন। ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে বৃটিশ সরকার তাঁকে 'কম্পানিয়ন্স অফ দ্য অর্ডার অব দ্য ইন্ডিয়ান এম্পায়ার' (সিআইই) প্রদান করে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে ডক্টর অব ল' উপাধি প্রদান করে।
১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি ২৪ পরগনা জেলার বন্দিপুর গ্রামের মহেশচন্দ্র বিশ্বাসের কন্যা রাজকুমারীকে বিবাহ করেন। তাঁদের একমাত্র পুত্র অমৃতলাল সরকারও ছিলেন একজন খ্যাতনামা চিকিৎসক। পিতার মৃত্যুর পর তিনি ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কালটিভেশন অব সায়েন্সের সম্পাদক হন।
জন্মদিনে এই বিজ্ঞানসাধককে জানাই সশ্রদ্ধ প্রণাম।
ছবি : উইকিপিডিয়া।
তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, বঙ্গদর্শন ও অন্যান্য সাইট এবং কিছুটা স্মৃতি থেকে।
✍️ ডাঃ অংশুমান দে।