23/11/2025
হাঁটু প্রতিস্থাপন: কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য।
1। ডাক্তারবাবু বলেছেন আমার হাঁটু তে ক্ষয় বা অস্টিওআর্থ্রাইটিস হয়েছে। আমাকে হাঁটু বদল বা knee replacement করতে হবে। এটা কি খুব অস্বাভাবিক ব্যাপার?
একদম ই নয়। 40 বছর বয়স এর পর থেকে আমাদের সকলের ই কম বেশি হাঁটু র ক্ষয় আরম্ভ হয়ে যায়। কারো একটু আগে আর পরে, কারো একটু বেশি না কম। দাঁত পড়া, চুল পাকা, চামড়া কুচকানোর মতো হাঁটু র বাত ও প্রায় অবশ্যম্ভাবী।
2। আচ্ছা অপারেশন এর পর আমি কি হাঁটতে পারবো?
অবশ্যই। না হলে অপারেশন তো কেউ করাতো না। এমনিতে knee replacement একটি অত্যন্ত সফল এবং জনপ্রিয় অস্ত্রোপচার। এর সাফল্যের হার 90 শতাংশের বেশি।
3। Knee replacement কি খুব ব্যয়বহুল অপারেশন? এতে কত খরচ হতে পারে?
কিছুটা ব্যয়বহুল তো বটেই।
তবে খরচ টা অনেক টাই নির্ভর করে ইমপ্ল্যান্ট বা মেটাল এর হাঁটু যেটা প্রতিস্থাপিত হবে তার ওপর। কিছু প্রিমিয়াম কোয়ালিটি ইমপ্ল্যান্ট আছে যেগুলোর দাম 2-3 লাখ টাকা। তো সেক্ষেত্রে কর্পোরেট হাসপাতাল এ এক দিকের হাঁটু প্রতিস্থাপন খরচ প্রায় 4-5 লাখ পর্যন্ত যেতে পারে।
তবে যদি কেউ অর্থনৈতিক দিক দিয়ে দুর্বল হন তবে সেক্ষেত্রে মাঝারি গোত্রের হাসপাতাল বা নার্সিং হোম এ এবং তুলনায় কম দামের ইমপ্ল্যান্ট দিয়ে করলে খরচ অনেকটাই কম পরে। সেক্ষেত্রে এক দিকের হাঁটু একলক্ষ তিরিশ হাজার আর দুই দিকের টা একসঙ্গে করলে আড়াই লক্ষ টাকার মতো খরচ পরে।
4। সেক্ষেত্রে কি গুণমানের সঙ্গে আপস করতে হয়?
খুব যে কিছু আপস করতে হবে তা নয়। আমরা ইমপ্ল্যান্ট এর ব্যাপারে গুণমাণের ব্যাপার টা তে আপস করি না। প্রায় সব ক্ষেত্রেই এগুলি আমেরিকা অথবা ইউরোপ এ তৈরি হয়, কেবল প্যাকেজিং হয় ভারত এ (ট্যাক্স বাঁচাতে)। এছাড়া ইনফেকশন এর সম্ভাবনা কমাতে স্টেরাইল নী ড্রেপ এবং অপারেশন থিয়েটার ফুমিগেশন যা যা সম্ভব করা হয়। ছোট সেট আপ এ লামিনার এয়ারফ্লো ইত্যাদি ও.টি তে থাকে না, সত্যি বলতে ওটুকুই আপস করতে হতে পারে।
5। এই তুলনায় কম দামের ইমপ্ল্যান্ট এর দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল কেমন?
খারাপ না। এগুলিও বাজার এ রয়েছে 20 বছরের আসে পাশে। প্রিমিয়াম ইমপ্ল্যান্ট এর সাথেও দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল এর পার্থক্য সামান্যই। মানে বলতে চাইছি ভালো মানের ইমপ্ল্যান্ট এ ইনভেস্ট করা সবসময় ই ভালো। কিন্তু সেটা না হলে বা পকেট এ না কুলোলে একটু মাঝারি মানের ইমপ্ল্যান্ট ব্যবহার করলে যে বিরাট কিছু ক্ষতি হয়ে যাবে তেমন টা নাও হতে পারে।
6। এই অপারেশন এ নিশ্চই কিছু ঝুঁকি ও আছে। সেগুলি কতটা এবং কি কি?
হ্যাঁ যে কোনো অপারেশন এই ঝুঁকি আছে, টা যত সামান্য ই হোক। এক্ষেত্রে এই ঝুঁকি পরিমাণ 3-5 শতাংশ মতো।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি নিঃসন্দেহে ইনফেকশন বা সংক্রমণ। ওটা আটকানো ই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং তার জন্য যা যা সম্ভব সব করা হয়। এছাড়া ডিস্লোকেশন, আসেপটিক লুসেনিং এসবের সম্ভাবনা থাকে, তবে খুব কম।
7। মোটামুটি কতদিন চলে এই ইমপ্ল্যান্ট গুলি?
শুধু ইমপ্ল্যান্ট না অপারেশন এর মান এর ওপরেও এই ব্যাপারটা নির্ভর করে। স্ট্যান্ডার্ড ইমপ্ল্যান্ট স্ট্যান্ডার্ড সার্জন এর হাতে অপারেশন এর পর এভারেজ 15 বছর অব্দি চলতে পারে। অবশ্যই প্রত্যেক এর ক্ষেত্রে এটা আলাদা তবে সফল নী রিপ্লেসমেন্ট এর পর 30 বছর ইমপ্ল্যান্ট কোনো সমস্যা ছাড়াই চলছে এমনটা কিন্তু দুর্লভ অভিজ্ঞতা নয়, আমার এরকম রোগী অনেক দেখি।
8। অনেকে বলেন দক্ষিণ ভারতে হাঁটু প্রতিস্থাপন করিয়ে এলেন। সত্যিই কি দক্ষিণ ভারত এ এখানকার থেকে ভালো অপারেশন হয়?
এর উত্তর এক কোথায় দেওয়া শক্ত।
যখন এ অঞ্চলে এ এই ধরনের প্রিয়েশন হতো না মানে নব্বই এর দশকে তখন দক্ষিণ ভারতে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। কিন্তু এখন তো দুর্গাপুর এ কর্পোরেট হাসপাতাল তো বটেই এমনকি নার্সিং হোম গুলিতেও নিয়মিত এবং ভালো সংখ্যায় এই অপারেশন করা হয়, অনেকেই করিয়ে ভালো আছেন।
এখানে কথা টা হচ্ছে এই অপারেশন এ অপারেশন এর সঙ্গে অতটাই গুরুত্বপূর্ণ তার পরের ফিজিওথেরাপির এবং রিহ্যাব, যেটা হতে হবে সার্জন এর তত্ত্বাবধানে। অন্য জায়গা থেকে অপারেশন করে এলে এই জায়গা টা সবচেয়ে ফাঁকি পরে। কেউ ভুল রিহ্যাব করেন, কেউ মোটেই করেন না। শেষ অব্দি ফল ও ভালো হয় না।
এছাড়া যদি ইনফেকশন বা কোনো কম্লিকেশন হয় সেক্ষেত্রে আপনি প্রতি সপ্তাহে বা প্রতি মাসে রোগী কে নিয়ে দক্ষিণ ভারত ছুটতে পারবেন কিনা সেটাও ভেবে দেখবার বিষয়।
9। এই অপারেশন ঘিরে একটা মিথ কাজ করে যে অনেক মানুষ না কি এই অপারেশন করে আর হাঁটতে চলতে পারেন নি, ঘরেই শুয়ে থাকেন। অনেকে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী জি র উদাহরণ দেন যে উনি আর কখনও চলতে পারেন নি। এই ধারণা গুলি কতটা ঠিক?
আমাদের ও অনেকে এগুলি জিজ্ঞাসা করেন কিন্তু লক্ষ্য করেছি ঠিক কোন রোগী অপারেশন এর পর চলতে পারেন নি তার সম্পর্কে বিশদ জিজ্ঞাসা করলে তাঁরা আর ঠিকমতো তথ্য দিতে পারেন না। মনে হয় এর অনেকটাই myth। মাননীয় শ্রী বাজপেয়ী জি র প্রথম বার এর অপারেশন অত্যন্ত সফল ছিল। ২০০০ সালে দ্বিতীয় বার এই অপারেশন এর সময় উনি ডায়াবেটিস এবং বার্ধক্য জনিত সমস্যা তে ভুগছিলেন, একারণে ওনার রিহ্যাব সেভাবে করা সম্ভব হয়নি এমন ই বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়। আগেই বলেছি এই অপারেশন এ রিহ্যাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।