P. C. Sen Charitable Trust

P. C. Sen Charitable Trust Our services are: Polyclinic, Diagnostics, Hospital, Paramedical Institute, Nursing College. Registration no : 190302007

20/04/2022
Our Orthopaedic Consultant ex - AIIMS-Delhi Surgeon DR. ANUPAM DAS is also an Artist. His art-works in an exibition at J...
20/04/2022

Our Orthopaedic Consultant ex - AIIMS-Delhi Surgeon DR. ANUPAM DAS is also an Artist. His art-works in an exibition at Jamini Roy Art Gallery, Kolkata on 17 April.

28/03/2022

লিটম্যানের স্টেথোস্কোপ

নির্মাল্য ব্যানার্জ্জ
**********************
সকাল থেকে নিজের চেম্বারে একটা অদ্ভুত অস্বস্তি নিয়ে ডাক্তার রণেন সিনহা বসেছিলেন । মাথায় হাজার চিন্তা । কলকাতার নামী হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের মধ্যে তাঁর নাম এখন একেবারে প্রথম সারিতে । দিনের এই ব্যস্ত সময়ে এই ভাবে চুপ করে বসে থাকা তাঁর পক্ষে ভারী অস্বাভাবিক । সারা দিনে রাতে তিনি অজস্র রোগী দেখেন । তার ওপর এই কর্পোরেট হাসপাতালের কাজ ! শরীর - মন সব যেন একেবারে নিংড়ে নেয় । তার মধ্যে এইভাবে চুপচাপ বসে থাকার সময় কোথায় ?

কিন্তু আজকের দিনটা ভীষণ রকমের আলাদা । আজ একটু পরেই তাঁর সঙ্গে দেখা হবে ডাক্তার সমীরণ সান্যালের । সমীরণ স্যার মেডিক্যাল কলেজে ওঁর শিক্ষক ছিলেন । গুরু বললেই বোধ হয় ঠিক হয় । তার সাথে পুরো ব্যাপারটা বড়ই জটিল অবস্থায় । উনি তাই এসেই বলে দিয়েছেন, স্যার চলে না যাওয়া অবধি উনি কোন পেশেন্ট দেখবেন না । পেশেন্টদের হয়তো দু’চার ঘন্টা বেশি অপেক্ষা করতে হবে । তাতে কী এসে যায় ? ডাক্তার রণেন সিনহাকে দেখাতে হলে আট দশ ঘন্টা - অপেক্ষা করতে হয়, এটা হয়তো কার্ডিওলজিস্ট হিসেবে ওঁর খ্যাতি আরো বাড়িয়েই দেবে ।
সত্যি বলতে কী ডাঃ সিনহা কার্ডিওলজির যতটুকু শিখেছেন তার বারো আনাই ওই স্যারের কাছে । এমডি পড়ার সময় সমীরণ স্যার ছিলেন ওঁদের কাছে এক বিস্ময় । অদ্ভুত ছিল ওঁর ডায়াগনোসিস । আর টেস্ট করাতেন বড় কম । অনেক বেশি জোর দিতেন স্টেথোস্কোপ আর অন্যান্য ক্লিনিক্যাল টেস্টের ওপর । কোন পেশেন্টকে হয়তো ওঁর কাছে রেফার করা হয়েছে - হার্টের বড় সড় সমস্যা - মাঝে মাঝেই হার্ট বিট ড্রপ হচ্ছে । পরিভাষায় যার নাম অ্যারিথিমিয়া । স্যার স্টেথো লাগিয়ে খুব মন দিয়ে শুনলেন । তারপর ঘোষণা করলেন - ধ্যাৎ, এর কিস্যু হয়নি । এর এটাই নর্ম্যাল । কারো ক্ষেত্রে আবার হয়তো স্টেথো লাগিয়েই বললেন, ইমিজিয়েট বাইপাস অপারেশান দরকার । রণেনরা তখন সবে শিখেছেন - এস ওয়ান, এস-ট্যু সাউন্ড । শুনতে চেষ্টা করছেন অতি ক্ষীণ অ্যাবনরমাল হার্ট সাউন্ড । চিনতে শিখছেন এস-থ্রি, এস-ফোর গ্যালপ সাউন্ড, মারমার, ক্লিক, রাবিং সাউন্ড । দু’চার বার ওঁরা ধোঁকাও খেয়েছেন ।

একবার এক মহিলা এসেছেন - গাইনি থেকে রেফার্ড হয়ে । বয়েস বছর তেইশ । সাতাশ সপ্তাহের প্রেগন্যান্ট । সাজ পোশাক দেখেই বোঝা যাচ্ছে - অতি নিম্নবিত্ত পরিবারের । তাঁর নাকি বুকের বাঁদিকে মাঝে মাঝেই ব্যথা হয় । স্যার স্টেথো লাগিয়ে শুনলেন । তারপর ঘরের একেবারে অন্য প্রান্তে বসে ডাঃ সিনহাদের দিকে ইশারা করলেন । ওঁরা সবাই এক এক করে স্টেথো লাগিয়ে শুনলেন । শব্দ শুনে টুনে ডাঃ সিনহা এবং তাঁর সহপাঠিরা স্যারকে একবাক্যে জানালেন, হ্যাঁ, মারমার সাউন্ড পাওয়া যাচ্ছে । বেশ লাউড ।

স্যার মিচকে মিচকে হাসছেন । বললেন, সিস্টোলিক না ডায়াস্টোলিক ? কোন লেভেলের রে ? একেবারে সিক্সথ্‌ নাকি ?

রণেনরা সবাই সমস্বরে জানালেন সিস্টোলিক । তবে লেভেলের ব্যাপারে কেউই নিশ্চিৎ নয় । কেউ বলছে ওয়ান, কেউ থ্রি । একজন তো সিক্সথ্‌ লেভেলই বলে বসলো ।

স্যার তার দিকে তাকিয়ে বললেন, বলিস কী ? একেবারে সিক্সথ ? একবার স্টেথো বাদ দিয়ে কান লাগিয়ে শুনবি নাকি ?

ইঙ্গিতটা খুব স্পষ্ট । রণেন এবং তাঁর বন্ধুরা লজ্জ্বা পেয়েছিলেন । স্যার এবার হেসে উঠে বললেন, যত্তো সব ছাগলগুলো এসেছিস কার্ডিওলজি পড়তে ! ওরে প্রেগন্যান্ট মেয়েদের সিস্টোলিক মারমার খুব স্বাভাবিক ব্যাপার । তবে সেটা লেভেল ওয়ান বা ট্যু-এর বেশি হয় না । এটা খুব হাই লেভেল সাউন্ড নয় । এই ব্যথাটা গ্যাস আর ইনডাইজেশন থেকে হচ্ছে । দেখবি ? প্রমাণ করে দেব ?

বলেই স্যার উঠে পেশেন্টের কাছে গেলেন । বললেন, হ্যাঁরে, মেয়ে, কী করিস তুই ?

মেয়েটা জানালো, ঘর মোছা - বাসন মাজার কাজ করে ।

- বর আছে তো, রে ? নাকি বর ছাড়াই মা হতে চলেছিস ?
মেয়েটা সলজ্জ্বে জানায়, না না, বর আছে ।

- সে কী করে ?
- আজ্ঞে, রিক্সা চালায় ।
- বাঃ তাহলে তো সোনায় সোহাগা ! রাতে কী খাস ? ভাত না রুটি ?
- রুটি ।
- কটা রুটি খাস ?
মেয়েটির মাথাটা যেন আরো নুয়ে পড়ে । বলে, দুটো কী তিনটে !

- আর সকালে কী খেয়ে কাজে যাস ? বাসি রুটি ?
- হ্যাঁ ।
- তার মানে যেদিন তোর বরের বেশি ক্ষিধে পায়, সেদিন রাতে কম করে খাস, আর নাহলে সকালে আর কিছু খাস না । তাই তো ?
মেয়েটা বলে, কী করবো, গা গুলোয় যে !
স্যার গলায় একটা অদ্ভুত আওয়াজ করেন, হুঁহ্‌ ! গা গুলোয় ! গা গুলোলেই আচার খাস, তাই না ?
মেয়েটা ফিক করে হেসে ফেলে । তারপর মাথা নাড়ে, হ্যাঁ ।

- থাকিস কোথায় ?
মেয়েটি যে জায়গাটা জানায় সেটা শুনেই স্যার বলেন, আরে ও তো আমার বাড়ির কাছেই রে ! তা তোর বর কোথায় ? এসেছে ?

- হ্যাঁ, বাইরে বসে আছে ।
- যা ডেকে আন ।
মেয়েটি গিয়ে একটি লোককে সঙ্গে নিয়ে আবার ঢোকে । স্যার তাকে বলেন, এই, শোন, তুই থাকিস তো আমার বাড়ির কাছেই । রোজ সন্ধ্যেবেলা আমার বাড়ি চলে আসবি । সন্ধ্যেবেলা আমার চেম্বারে যারা আসে তাদের যেখানে যেখানে বলবো - পৌঁছে দিবি । ভাড়া আমি যা বলে দেবো তাই নিবি । আর তারপর রাতে আমার বাড়ি থেকে রাতের আর পরদিন সকালের জন্যে যা রুটি লাগবে, নিয়ে বাড়ি চলে যাবি । এ ক’দিন আর বৌটাকে খাটাসনি । আর একটা বড়ি দিচ্ছি - আগামী পনেরোদিন রোজ সকালে খালি পেটে খাওয়াবি । আর ও রোজ রাতে চারটে আর সকালে তিনটে রুটি খাবে । সকালে বড়িটা খাইয়ে বিছানা ছাড়ার আগে একটা রুটি খাইয়ে দিবি । আর একঘন্টা অন্তর ঠিক এক মুঠো করে মুড়ি খাবে । আর তাহলেই আর বুকের ব্যথা হবে না । বুঝলি ?

লোকটা সম্মতি সূচক মাথা নাড়ে । স্যার মেয়েটাকে বলেন, একদম আচার খাবি না, বুঝলি ? যা পাবি, পেট ভরে খাবি । ভাতের ফ্যান ফেলে দিবি না, নুন মিশিয়ে চায়ের মতো করে খেয়ে নিবি । এই তো লিকলিকে চেহারা । ভালো করে খাওয়া দাওয়া না করলে মা হওয়ার ধকল নিবি কী করে ?

মেয়েটি সলজ্জ্বে হাসে । স্যার এবার যে ওষুধটা লিখে দেন সেটা অতি সাধারণ, - প্যান্টোপ্রাজোল আর ডোমপেরিডোনের একটা কম্বিনেশন । মজার ব্যাপার, মেয়েটি আর তার বর স্যারের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে । স্যার হাসেন । তারপর ওদের বিদায় করে রণেনদের দিকে তাকিয়ে বলেন, শোন, ডাক্তারি করতে হলে শুধু বই পড়লেই হয় না, চোখ কান খোলা রেখে চিকিৎসা করবি । আরে, মেয়েটা বরকে খাইয়ে নিজে খালি পেটে থাকে । উইন্ড ফর্ম করে বুকে ব্যথা হয় । সকালে মর্নিং সিকনেস হয় - আর তার ওপর খুব কষে আচার খায় । সেসব না বুঝে তোরা ডাক্তারী বই কপচাতে লাগলি ! তাও যদি ভালো করে বইগুলো পড়তিস ।

পুরো ব্যাপারটা ভাবতে গিয়ে ডাঃ সিনহার হাসি পায় । স্যার কী অক্লেশে পেশেন্টকে তুই তোকারি করতেন ! মাঝে সাঝে বেদম ধমক ধামক দিতেন । এই কর্পোরেট হাসপাতালের কড়া নির্দেশে ডাঃ সিনহা প্রতিটা রোগীকে স্যার বা ম্যাডাম বলে ডাকেন । যতটা সম্ভব মিষ্টি করে কথা বলেন । তাঁদের পোশাক, টাই ইত্যাদি বিষয়ের দিকেও ম্যানেজমেন্টের তিক্ষ্ণ নজর থাকে । অবশ্য ওইরকম গরীব ঘরের পেশেন্ট কস্মিনকালেও এই সব হাসপাতালে আসবে না । তাহলেও - ওইরকম হৃদয় ঢেলে চিকিৎসা করার কথা ডাঃ সিনহা ভাবতেও পারেন না । আবার কোন পেশেন্ট পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করছে, সেটাও ভাবতে পারেন না । স্যারের ক্ষেত্রে এটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল । বিশেষত ওঁর বাড়ির চেম্বারে । সেকেন্ড ইয়ারে পড়তে ডাঃ সিনহা স্যারের বাড়ির চেম্বারে ওঁর অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে যোগ দেন । তবে সেটার পেছনে একটা ঘটনা পরম্পরা ছিল ।

তখন রণেন সেকেন্ড ইয়ার পার করে ফেলেছেন । কিছুটা শিখেও ফেলেছেন । অনেক ক্ষেত্রেই সঠিক ডায়াগনোসিস করতে পারেন । এই রকম সময়ে এক পেশেন্ট এলো । বয়েস বছর ষাটেক । বেশ মোটাসোটা । পেটটা ফোলা ফোলা । পা ফোলা । সমস্যা - ঘন ঘন চেস্ট পেন । বেশ কয়েকবার ব্ল্যাক আউট হয়েছে । ভীষণ হাঁফ ধরে । স্যার নিজে রোগীকে পরীক্ষা করলেন । বিশেষ কিছু বোধ হয় বোঝা গেলো না । রণেনদের ইঙ্গিত করলেন । কেউই হার্টে কোন অ্যাবনরম্যাল সাউন্ড পেলো না । রণেনের কী মনে হলো দ্বিতীয়বার খুব মন দিয়ে স্টেথো লাগালেন । একটু শুনতেই ওঁর বুকটা ধ্বক করে উঠলো । খুব সূক্ষ একটা মারমার সাউন্ড পেলেন । চোখ বন্ধ করে শুনতে লাগলেন । নিশ্চিত হলেন লাব আর ডুপের সাথে সূক্ষ মারমার সাউন্ড রয়েছে । রিগারজিটেশন হচ্ছে । অর্থাৎ মিট্রাল ভালভ ঠিকমত বন্ধ হচ্ছে না । রক্ত চোরা পথে ফিরে যাচ্ছে হার্টে । রণেন স্যারকে একটু ভয়ে ভয়েই কথাটা জানালেন । স্যার শুনে লাফিয়ে উঠে স্টেথো কানে লাগালেন । চোখ বন্ধ করে শুনলেন । তারপর উঠে রণেনের পিঠটা চাপড়ে দিলেন ।

তার দিন কয়েক পরে স্যার হাসপাতালে এসেই রণেনকে ডাকলেন । রণেন এগিয়ে এলেন । তাঁর ব্যাগের ভেতর থেকে একটা বাক্স বার করে রণেনের দিকে এগিয়ে দিলেন । রণেন হাতে নিয়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন । বিশ্ববিখ্যাত লিটম্যান কোম্পানির স্টেথোস্কোপ । তখন রণেন অত দামী স্টেথোর কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারেন না । সাধারণ ডাক্তাররাও সচরাচর লিটম্যান স্টেথো ব্যবহার করে না । স্যার বললেন, সেদিনের গুরুমারা ডায়াগনোসিসের প্রাইজ ।

রণেন বাক্স থেকে স্টেথোটা বার করলেন । তাঁর নাম এনগ্রেভ করা - ডাঃ আর সিনহা । রণেন স্যারের পায়ের সামনে ভেঙ্গে পড়লেন । প্রণাম করে উঠতেই স্যার ওঁর মাথার চুলগুলো একটু এলোমেলো করে দিয়ে বললেন, যত্ন করে রাখবি ।

কথাগুলো মনে পড়তে ডাঃ সিনহার আবারও হাসি পেলো । ইদানিং উনি স্টেথো বিশেষ ব্যবহারই করেন না । রোগী এলে ওঁর জনা দুই তিন অ্যাসিস্ট্যান্ট আগেই ইসিজি, ইকো, ডপলার, চেস্ট এক্স-রে, ব্লাডের হাজার গন্ডা পরীক্ষা সব করিয়ে ফেলে । অনেক সময় অনেক অপ্রয়োজনীয় টেস্টও করানো হয় । উপায় কী ? এই কর্পোরেট হাসপাতালের দেওয়া টার্গেট পূরণ না করলে হাসপাতাল ওঁকে রাখবেই বা কেন ? আর ওঁকে হাসপাতাল যা টাকা দেয় সেটা সমীরণ স্যার কল্পনাতেও আনতে পারবেন না । স্যার বলতেন, ভালো ডাক্তার, ভালো ইঞ্জিনিয়ার, ভালো উকিল, যাই হোস, তার আগে ভালো মানুষ হতে হয় । তার জন্যে রোজগার নাহয় দুটো পয়সা কমই হলো !

আসলে স্যার বুঝবেন না, যে, বুনো রামনাথের দিন আজ আর নেই । ডাঃ সিনহা এবং তাঁর পরিবারও এই বিরাট রোজগারে অভ্যস্ত হয়ে গেছে । স্যার চড়তেন একটা অ্যামবাসাডার । আর ডাঃ সিনহার এখন একটা মার্সিডিজ, একটা বিএমডব্লু, দুটো এ’দেশি নাম করা গাড়ি । তাঁর ফ্ল্যাটটা আড়াই হাজার স্কোয়্যার ফিটের । অ্যাপার্টমেন্টে স্কাই ওয়াক, স্যুইমিং পুল - সব আছে । রাতে উনি স্কটল্যান্ডের যে হুইস্কিগুলো খান তার এক একটা বোতলের দাম দশ, বিশ, তিরিশ হাজার টাকা ।

ডাঃ সিনহার মনে পড়ে সেই দিনটার কথা । স্যারের কাছে লিটম্যানের স্টেথো পাওয়ার ঘটনায় হোস্টেলের বন্ধুরা ধরে বসে - মদ খাওয়াতে হবে । তখন আর রণেনের কতটুকুই বা ক্ষমতা ! উনি দু’বোতল রাম এর টাকা দিয়েছিলেন । সেই টাকাটা রোজগার করতে বাড়তি এক রাত প্রাইভেট নার্সিংহোমে ডিউটি করতে হয়েছিল ।

এটা অবশ্য বাড়তি রোজগারের জন্যে ওঁদের মধ্যে অনেকেই প্রায়ই করতেন । রণেনদের পরিবার নিম্ন-মধ্যবিত্ত বললেই ঠিক হয় । বাবার সামান্য চাকরি । ভাই বোন দুজনেই পড়াশুনো করছে । ফলে থাকা খাওয়া বাদ দিয়ে স্টাইপেন্ডের টাকাটা প্রায় গোটাটাই বাড়িতে পাঠিয়ে দিতেন । তারপর হাতখরচা, বই কেনা - এসবের জন্যে ওটা করতেই হতো । তখন হ্যারিসনের “প্রিন্সিপ্যালস অব ইনটারনাল মেডিসিন” কেনার টাকা জোগাড় করাই ওঁর কাছে দুঃসাধ্য ছিল । লেটেস্ট এডিশন না কিনে কোন লাভ নেই । ডাঃ সিনহা ভাবেন - এখন নতুন এডিশন বেরোনো মাত্র ওঁর কাছে পৌঁছে যায় । কিন্তু বহুকাল উনি ওটা খুলেও দেখেন না ।

আর ওই প্রাইভেট নার্সিংহোমে নাইট ডিউটি করতে গিয়েই রণেন একবার পড়লেন বিপদে । হাসপাতালে দিনের ডিউটি, নাইট ডিউটি করে পরের রাতে আবার প্রাইভেট নার্সিংহোমে নাইট ডিউটি করেছিলেন । পরদিন আউটডোর, রাউন্ড সব শেষ করে ইভনিং ডিউটি করতে বসেছিলেন । আইসিসিইউতে একটি ছোট ছেলে ভর্তি ছিল । কনজেনিটাল ভাল্ভ ডিজিজ । জন্ম থেকেই তার হার্টের একটি ভাল্ভ খারাপ । সেই অবস্থায় একদিন ইস্কুলে ফুটবল খেলতে খেলতে ছেলেটা অজ্ঞান হয়ে যায় । রণেন তার সামনে চেয়ারে বসেছিলেন মনিটরের দিকে চোখ লাগিয়ে । তখন রাত সাড়ে ন’টা । বসে থাকতে থাকতে ভীষণ ঘুম পাচ্ছিল । ঢুলে পড়েছিলেন প্রায় । সম্বিত ফিরল পিঠে মৃদু করাঘাতে । চোখ তাকিয়ে দেখেন ডাঃ সান্যাল । এত রাতে সিনিয়ার ডাক্তারদের রাউন্ডে আসাটা খুব অবাক কান্ড । ডাঃ সান্যাল কিন্তু কিচ্ছু বললেন না । বেডের পাশে লাগিয়ে রাখা টিকিটটা মন দিয়ে দেখলেন । একটা ইঞ্জেকশন দিতে বললেন ।

পরের দিন হাসপাতালে এসেই রণেনকে ডেকে পাঠালেন । আর তারপর প্রচন্ড বকাবকি । আইসিসিইউ - এর এসিটা কি ডাক্তারবাবু ঘুমোবেন বলে লাগানো থাকে ? এত যদি ঘুমের দরকার তাহলে ডাক্তারী না করে কেরাণী হলেই তো হতো । বেশ দশটা পাঁচটা ডিউটি, ঘুম, সব কিছু নিয়ম মেনে হোত । রণেন নিঃশব্দে বকুনি খেলেন । খানিকক্ষণ পরে স্যার বললেন, এত ঘুম কেন ? রাতে কি লেখাপড়া করছিলি ?

রণেন একবার ভাবলেন - হ্যাঁ বলেন । কিন্তু কেন কে জানে মিথ্যে কথা বলতে ইচ্ছে করলো না । সত্যিটা বলেই দিলেন । স্যার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব জানলেন । বাড়ির অবস্থা, বাবা কী করেন - সব । গম্ভীর হয়ে গেলেন ।

দু’দিন পরে একদিন রাউন্ড শেষ করে স্যার আবার ওঁকে ডেকে পাঠালেন । বললেন, শোন, কাল থেকে রোজ সন্ধ্যেবেলা আমার বাড়ির চেম্বারে চলে যাবি । আমাকে অ্যাসিস্ট করবি । শুধু ইভনিং ডিউটি আর নাইট থাকলে সেদিন যেতে হবে না । আর একদম ওইসব প্রাইভেট নার্সিংহোমের ধার মাড়াবি না । আরে বাবা, শরীরটা ঠিক না রাখলে ডাক্তারি করবি কী করে ? তাই বলে ভাবিস না মাগনা খাটতে বলছি । মাসে মাসে মাইনে পাবি ।

তারপর যে যে মাস মাইনের অঙ্কটা বলেছিলেন সেটা রোজ নার্সিংহোমে ডিউটি করেও রোজগার করা যেতো না । রণেনের মনে হচ্ছিল স্যারকে আবার একবার প্রণাম করেন । পরের দিন থেকে শুরু হলো স্যারের প্রাইভেট চেম্বারে যাওয়া । আর রণেনের সামনে যেন একটা অদ্ভুত জগত খুলে গেলো । আউটডোরে অজস্র পেশেন্টের ভিড়ের মাঝে শেখার সুযোগ আর কতটুকু । এখানে সেটা অনেক বেশি । তার ওপর এখানে উনি একাই শিখছেন ।

স্যারের চেম্বারে দু ধরণের রোগী আসতো । রাত সাড়ে আটটা-ন’টা অবধি হার্টের রোগীরা । তাদের জন্যে ফিজ দুশো টাকা । আর তারপর শুরু হতো নিকটবর্তী অনেক বস্তির এবং পাড়ার লোকজনের জন্যে জেনারেল প্র্যাকটিস । রণেন অবাক হতেন । অতো বড়ো একজন কার্ডিওলজিস্ট কী অক্লেশে সর্দিজ্বর আর পেটের সমস্যার রোগী দেখছেন । স্যার বলতেন, জানিস, আমাদের দেশেই লোকে জেনারেল প্র্যাকটিশনারদের হতচ্ছেদ্দা করে । বিদেশে লোকে সবচেয়ে সম্মান করে জিপি-কে ।

এই রোগীদের ফিজ ঠিক করা ছিলো পঞ্চাশ টাকা । হাতে দেওয়া নয় । একটা বাক্সে ঢুকিয়ে দিতে হতো । কেউ দিতো, কেউ পারতো না । স্যারকে প্রণাম করে পায়ের ধুলো নিয়ে বিদায় নিতো । কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে আবার স্যারকেই উল্টে ওই বাক্স থেকে ওষুধ কেনার টাকা দিতে হতো । ফলে দিনের শেষ ওই বাক্সে সামান্যই পড়ে থাকতো ।

কিন্তু স্যারের লাভ ছিলো অন্য জায়গায় । সেটা হলো সম্মান । সেটা রণেন টের পেলেন কয়েকদিন পরেই । কোন কোন দিন রণেন স্যারের সঙ্গেই ওঁর গাড়ি করে চলে আসতেন । আবার এক এক দিন একটু পরে আসতেন । সেদিন আসার সময় ক্ষিধে পাওয়ায় স্যারের পাড়ার একটা দোকানে মুড়ি, চপ আর চা খেলেন । পয়সা দিতে যেতেই কেলেঙ্কারী । দোকানদার বললো, আপনি ছোট ডাক্তারবাবু না ? ডাক্তারবাবুর হেল্পার ! আপনাকে মুড়ি চপ খাইয়ে পয়সা নোবো ? কেন, আমার কি নরকের ভয় নেই ? আপনি যে দেব্‌তার সঙ্গে কাজ করেন তাঁর লোকের কাছে পয়সা নিলে আমার নরকেও ঠাঁই হবে না !

একদিন রণেন স্যারের সঙ্গে তাঁর গাড়ি করেই আসছিলেন । পাড়ার কাছাকাছি উল্টোদিক থেকে আসা অন্য একটা গাড়ির সঙ্গে তার একটা ছোটখাটো কলিশন হলো । উল্টোদিকের গাড়িটা ছিল স্থানীয় এক নেতার ছেলের । সে এই কলিশনের ফলশ্রুতিতে একটু মস্তানি দেখাতে গেল । পাঁচ মিনিটের মধ্যে কয়েকশো লোক জড়ো হয়ে গেল । আর তখন স্যার নিজে নেমে এসে সামাল না দিলে সেদিন ওই নেতার ছেলে গণপ্রহারে মারা যেতো । আধ ঘন্টার মধ্যে সেই নেতা এবং তাঁর ছেলে দু’জনেই এসে স্যারের কাছে ক্ষমা চেয়ে গেল ।

স্যার অনেক সময় বলতেন, আরে ডাক্তারিটা নেহাৎই একটা পেশা নয় রে ! এটা একটা ধর্ম । যেমন অক্সিজেনের ধর্ম - দহনে সাহায্য করা, তেমনি ডাক্তারের ধর্ম রোগীকে বাঁচতে সাহায্য করা । যদি ব্যবসা হিসেবে ধরিস তাহলে ডাক্তারি না করে আলু, পটল, লোহা কিংবা ধান-চাল কেনা বেচা কর । অনেক বেশি টাকা রোজগার হবে । ডাক্তারের সবচেয়ে বড়ো রোজগার যখন রোগীর বাড়ির লোক তোকে ফিজ এর টাকাটা দিয়েও বলবে, ডাক্তারবাবু, আপনি ওর প্রাণ বাঁচিয়ে দিলেন, আপনি ভগবান !

এমডি করার পরেও রণেন স্যারের সাথেই ছিলেন । একসময় দিল্লীর এইমস-এ সুযোগ পেলেন । সেটা শুনে স্যার হাসি মুখেই রণেনকে বিদায় জানিয়েছিলেন । দিল্লীর পর কয়েক বছরের জন্যে গেলেন বিদেশে । তারপর দেশে ফিরে ডাঃ সিনহা কিছুকাল প্রাইভেট প্র্যাকটিস করার পর একটা কর্পোরেট হাসপাতালে যোগ দিলেন । আরও দু’তিনটে হাসপাতাল বদল করে তিনি এখন এই জায়গায় । কিন্তু আজকের ব্যাপারটা ডাঃ সিনহাকে বেশ একটু অস্বস্তিতে ফেলে দিচ্ছে । ঘটনাটা দিন সাতেক আগের । প্রথমে ডাঃ সিনহা জানতেনই না যে পেশেন্ট সমীরণ স্যারের শ্বশুর মশাই । স্ট্রোক হয়ে ভর্তি হওয়ার পাঁচ মিনিটের মধ্যে ডাঃ সিনহা বুঝে গিয়েছিলেন পেশেন্ট বাঁচবে না । বিরানব্বই বছর বয়েস । ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকের পরে তাকে আর চিকিৎসা করে কী হবে ?

কিন্তু প্রথমেই আইসিসিইউ আর তার ঘন্টা দুয়েক পরেই ডাঃ সিনহা পেশেন্টকে ভেন্টিলেশনে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন । তার সবচেয়ে বড়ো কারণ, এ মাসে ডাঃ সিনহার টার্গেট পূর্ণ হয়নি । ডাঃ সিনহা কিন্তু তখনই জানতেন, পেশেন্ট মারা গেছে । তাহলেও নিয়মিত ওষুধ, ইঞ্জেকশন, ব্লাড টেস্ট সব কিছু চলেছে । কাল পেশেন্টের ছেলে জানালো, রোগীর পরিচয় । সেটা শুনে ডাঃ সিনহা কাল রাতেই রোগীর মৃত্যু ঘোষণা করেছিলেন । আর আজ সকালে স্যার ফোন করে জানালেন তিনি বডি নিতে আসছেন ।

ডাঃ সিনহা ভেবে রেখেছেন, স্যার আসা মাত্র তিনি স্যারকে শুনিয়ে অ্যাকাউন্টসকে নির্দেশ দেবেন, বিলের ওপর টোয়েন্টি ফাইভ পার্সেন্ট ডিসকাউন্ট দিতে । সেই মর্মে হাসপাতালের সিইও গোয়েঙ্কা সাহেবের অনুমতিও নিয়ে রেখেছেন । ডাঃ সিনহা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, স্যার এসে রোগীকে দেখলে হয়তো তক্ষুণি বুঝে ফেলবেন যে ওঁরা একটা মৃতদেহের ওপর সাতদিন ধরে চিকিৎসা চালিয়েছেন । আর স্যারের ছাত্ররা স্বাস্থ্যবিভাগের সর্বোচ্চ জায়গাতেও ছড়িয়ে আছে । এদিক সেদিক হলে হয়তো হাসপাতালের লাইসেন্স বাঁচানোই মুশকিল হবে ।

গোয়েঙ্কা সাহেব সব শুনে বলেছিলেন, আরে সেরকম বুঝলে পুরা বিল ফ্রি করিয়ে দিবেন । হামার কী আছে, হামার দো দশ খোখা নুকসান হোবে । বাদমে হামি দুসরা হসপিটাল বানিয়ে লিবে । লেকিন হাপনার তো রেজিস্ট্রিশান হি ক্যানসেল হইয়ে যাবে । তোখোন তো হাপনি ভিখ মাংবার ওবোস্থাতে ভি থাকবেন না ! যা হোক করে ম্যাটারটা সালটে লিন । চাইকি উনাকে এক দো খোখা ওফার ভি কোরবেন । জানেন তো, সোবাই বিকাও আছে । সিরিফ সহি প্রাইস ক্যোট কোরতে হোবে ।

সকাল থেকে তাই একটা অদ্ভুত অস্বস্তি নিয়ে ডাঃ সিনহা বসেছিলেন । অবশ্য আশার কথা একটাই । সন্দেহ করা আর প্রমাণ করার মধ্যে অনেক ফারাক । যদি পোস্ট মর্টেমও হয়, এসব কেস প্রমাণ করা বড়ো শক্ত । শেষ অবধি যখন খবর পেলেন, স্যার এসেছেন, ডাঃ সিনহা যেন স্বস্তি পেলেন । চেয়ার ছেড়ে উঠে তাড়াতাড়ি ঘরের বাইরে গেলেন ।

সেই চিরকালিন গটমট করে হাঁটার ভঙ্গিতে স্যার ঢুকলেন । বয়েস হলেও হাবভাব সেই আগের মতই । যদিও মুখে বেশ একটু বয়েসের ছাপ পড়েছে । দাড়ি কামাননি । গাল ভর্তি খোঁচা খোঁচা পাকা দাড়ি । ডাঃ সিনহা এগিয়ে গেলেন । প্রণাম করতে গেলেন । স্যার বাধা দিলেন । বললেন, আরে, থাক থাক, করিস কী ! এতো বড়ো হাসপাতালের কার্ডিওলজির হেড আমার মতো একটা খুচরো ডাক্তারকে প্রণাম করছে দেখলে লোকে কী বলবে ?

ডাঃ সিনহা স্যারকে ঘরে এনে বসালেন । চা কফি অফার করলেন । স্যার সম্মতি দিলেন না । বললেন, না রে, বডি নিয়ে তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে । আবার বিকেলের চেম্বারও তো বন্ধ করা যাবে না । সবার তো আর তোদের এই হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর মতো ক্ষমতা নেই ! তাদের এই হাতুড়েই ভরসা । আর বলিস না, আমার শ্বশুরমশাই মারা গেছেন শুনে পাঁচটা বস্তির লোক একেবারে ঝেঁটিয়ে এসেছে ।

কথাটা শুনে ডাঃ সিনহার হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার জোগাড় হয় । বস্তির লোকেদের ওপর স্যারের প্রভাব তো উনি বিলক্ষণ জানেন । তারা যদি একযোগে হামলা করে, তাহলে হাসপাতালের পোষা গুন্ডা, পুলিশ, কেউ কিছু করতে পারবে না । ডাঃ সিনহা ভাবেন, এবার ডিসকাউন্টের কথাটা পাড়বেন ।

স্যার বলতে থাকেন, তা সে যাকগে, আমার শালাবাবুকে বলেছি, পেমেন্ট করে দিয়ে বডি নিয়ে নিতে । তা হ্যাঁরে, এ কদিনে কী চিকিৎসা করলি একবার ফাইলটা দেখাবি ? না কি, সেটা তোদের কোম্পানির আইন বিরুদ্ধ ?

ডাঃ সিনহা একটু কাষ্ঠ হাসি হাসেন - কী যে বলেন স্যার ! আমি আগে জানলে তো আপনাকে কনসাল্ট করে সব কিছু করতাম । আপনার আত্মীয়রা একবারও বলেননি যে উনি আপনার শ্বশুর মশাই ।

ডাঃ সিনহা ফাইলটা এগিয়ে দেন । স্যার কয়েক মিনিট ধরে সব কিছু দেখেন । বললেন, নাঃ, বুড়োটার দম ছিলো বটে ! হ্যাঁ রে, রাইলস টিউব দিয়ে এক এক দিনে যা খাবার দিয়েছিস, সে তো সুস্থ লোক খেতে পারবে না রে ! দিনে তিনটে পাউচ বুড়োটা হজম করে ফেলেছে ?

ডাঃ সিনহার জিভটা শুকিয়ে যায় । বলেন, না না, স্যার, একটাই হয় তো, ভুল করে তিনবার লেখা হয়ে গেছে ।

স্যার বলেন, যাক, একটা জিনিস ভালো, লিপিড প্রোফাইল, লিভার ফাংশান টেস্ট, ক্রিয়াটিনিন এগুলো প্রত্যেকদিন করিয়েছিস । হার্ট ফেল হলেও, লিভার, কিডনি, কোলেস্টেরল এগুলো ঠিক থাকা দরকার, কী বলিস ?

ডাঃ সিনহার মুখে কথা সরে না । স্যার বলেন, আরে অতো ভাবনার কিছু নেই । বেশ করেছিস । আরে আমার শালাবাবুর অনেক পয়সা । আমি সেদিনই বলেছিলাম, বুড়ো মানুষটাকে আর টানা হেঁচড়া কোরো না । ম্যাসিভ হার্ট আ্যাটাক । দু’-এক ঘন্টার মামলা । সে ওরা শুনলো না । ওই জন্যেই আমি সাড়া শব্দ করিনি । তবে কাল এসে চুপিচুপি দেখে গেছি । দেখেই আমি বললাম, তোকে আমার কথা বলতে ।

ডাঃ সিনহা ক্রমশ নিজের দামি রিভলভিং চেয়ারের সঙ্গে যেন মিশে যেতে থাকেন । এসি ঘরে বসেও যেন ঘাম বেরোচ্ছে । খানিকটা মরিয়া হয়েই বললেন, স্যার, আমি অ্যাকাউন্টসকে বলে দিচ্ছি, ম্যাক্সিমাম ডিসকাউন্ট করে দিতে ।

স্যার হেসে বলেন, আরে না না, আমি বলে এসেছি । অলরেডি বিল পেমেন্টও হয়ে গেছে । আর চিন্তা কিসের, ইন্সিওরেন্স কোম্পানি সব টাকা রি-ইমবার্স করে দেবে ।

বলতে বলতেই ফোন বাজে । অ্যাকাউন্টস অফিসার শর্মা বলে, আরে, স্যার, পেশেন্টপার্টি তো ফুল পেমেন্ট করে দিয়েছে, এক পয়সাভি ডিসকাউন্ট চায় নি ।

ডাঃ সিনহা কোন কথা না বলে ফোন নামিয়ে রাখেন । স্যার বলেন, তুই বরং আমার একটা কাজ করে দে ।

ডাঃ সিনহা বলেন, হ্যাঁ স্যার, কী কাজ বলুন না ।

স্যার বললেন, আরে গত কাল থেকে দাড়ি কামানো হয়নি । তোদের ওই আইসিসিইউতে যে লোকটা রোজ পেশেন্টদের দাড়ি কামিয়ে দিয়ে যায়, তাকে একটু ডেকে বল না, আমার দাড়িটা কামিয়ে দিতে !

ডাঃ সিনহার ভেতর অবধি সব কিছু কেঁপে ওঠে । স্যারের হাতে অকাট্য প্রমাণ । স্যার বলে চলেন, কাল এসে দেখেই বুঝেছিলাম । কী রে, তোর কি শরীর খারাপ করছে নাকি ? যাকগে, বাদ দে, তোকে আর টেনশান দেবো না । আমি বরং নিজের একটা লাভ করে নিই ।

ডাঃ সিনহা অন্ধকার গুহার প্রান্তে হঠাৎ আলো দেখতে পান । যাক, স্যার যদি লাইনে আসেন, তবে এক কী দু’ খোখা, মানে দু’ এক কোটি টাকা দিতে কোন আপত্তি নেই । দরকার হলে গোয়েঙ্কাকে বলে আরও বাড়াবেন ।

স্যার বলেন, তোর মনে আছে, তোকে একবার একটা লিটম্যানের স্টেথোস্কোপ দিয়েছিলাম, গুরুমারা বিদ্যের প্রাইজ ?

ডাঃ সিনহা নিঃশব্দে মাথা নাড়েন । স্যার বলেন, তোর কাছ থেকে ওটা ফেরৎ নিয়ে যাবো । ওটা হয় তো আর নেই, তাহলেও একটা লিটম্যানের স্টেথো দে দিকিনি, আমি ধরে নেবো ওটা ওই স্টেথোটাই । একটা ছেলে এখন আমাকে অ্যাসিস্ট করে, ভালো স্টেথো কেনার পয়সা নেই । ওকে দেবো । তোর তো এখন নিশ্চই আর স্টেথোর দরকার পড়ে না !

ডাঃ সিনহা যন্ত্রচালিতের মতো টেবিলের পাশে রাখা স্টেথোটা নিয়ে স্যারের দিকে এগিয়ে দেন । এটাও লিটম্যানের । সবচেয়ে দামী ইলেকট্রনিক স্টেথোস্কোপ । কিন্তু ওটায় ওঁর নাম নয়, হাসপাতালের নাম এনগ্রেভ করা । স্যার হাসি মুখে সেটাকে হাতে নেন । তারপর চেয়ার ছেড়ে গটমট করে দরজার দিকে চলে যান । ডাঃ সিনহা তাড়াতাড়ি উঠতে যান । কিন্তু উঠতে পারেন না । সারা শরীরে ঘাম বেরোচ্ছে । বুকে কেমন একটা যন্ত্রণা ! ওঁর কি হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে ? ওঁর অ্যাসিস্ট্যান্টকে ডাকতে যান । কিন্তু গলা দিয়ে কোন শব্দ বেরোচ্ছে না । হাত তুলে কলিং বেলটা বাজাতে পারছেন না । ডাঃ সিনহা অসহায়ের মতো অনুভব করেন ওঁর স্যার, ওঁর গুরু, ডাঃ সমীরণ সান্যাল, ওঁর সারা জীবনের শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, কার্ডিওলজি বিষয়ে ওঁর জ্ঞান, এককথায়, ওঁর সব কিছু কেড়ে নিয়ে চলে গেলেন ।

©️নির্মাল্য ব্যানার্জ্জী ।

18/03/2022
Our activities..
20/02/2022

Our activities..

Address

South 24 Pgs, Majumder Home, Ghazipur, Bakhrahat Road
Kolkata
700104

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when P. C. Sen Charitable Trust posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Share

Share on Facebook Share on Twitter Share on LinkedIn
Share on Pinterest Share on Reddit Share via Email
Share on WhatsApp Share on Instagram Share on Telegram