28/03/2022
লিটম্যানের স্টেথোস্কোপ
নির্মাল্য ব্যানার্জ্জ
**********************
সকাল থেকে নিজের চেম্বারে একটা অদ্ভুত অস্বস্তি নিয়ে ডাক্তার রণেন সিনহা বসেছিলেন । মাথায় হাজার চিন্তা । কলকাতার নামী হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের মধ্যে তাঁর নাম এখন একেবারে প্রথম সারিতে । দিনের এই ব্যস্ত সময়ে এই ভাবে চুপ করে বসে থাকা তাঁর পক্ষে ভারী অস্বাভাবিক । সারা দিনে রাতে তিনি অজস্র রোগী দেখেন । তার ওপর এই কর্পোরেট হাসপাতালের কাজ ! শরীর - মন সব যেন একেবারে নিংড়ে নেয় । তার মধ্যে এইভাবে চুপচাপ বসে থাকার সময় কোথায় ?
কিন্তু আজকের দিনটা ভীষণ রকমের আলাদা । আজ একটু পরেই তাঁর সঙ্গে দেখা হবে ডাক্তার সমীরণ সান্যালের । সমীরণ স্যার মেডিক্যাল কলেজে ওঁর শিক্ষক ছিলেন । গুরু বললেই বোধ হয় ঠিক হয় । তার সাথে পুরো ব্যাপারটা বড়ই জটিল অবস্থায় । উনি তাই এসেই বলে দিয়েছেন, স্যার চলে না যাওয়া অবধি উনি কোন পেশেন্ট দেখবেন না । পেশেন্টদের হয়তো দু’চার ঘন্টা বেশি অপেক্ষা করতে হবে । তাতে কী এসে যায় ? ডাক্তার রণেন সিনহাকে দেখাতে হলে আট দশ ঘন্টা - অপেক্ষা করতে হয়, এটা হয়তো কার্ডিওলজিস্ট হিসেবে ওঁর খ্যাতি আরো বাড়িয়েই দেবে ।
সত্যি বলতে কী ডাঃ সিনহা কার্ডিওলজির যতটুকু শিখেছেন তার বারো আনাই ওই স্যারের কাছে । এমডি পড়ার সময় সমীরণ স্যার ছিলেন ওঁদের কাছে এক বিস্ময় । অদ্ভুত ছিল ওঁর ডায়াগনোসিস । আর টেস্ট করাতেন বড় কম । অনেক বেশি জোর দিতেন স্টেথোস্কোপ আর অন্যান্য ক্লিনিক্যাল টেস্টের ওপর । কোন পেশেন্টকে হয়তো ওঁর কাছে রেফার করা হয়েছে - হার্টের বড় সড় সমস্যা - মাঝে মাঝেই হার্ট বিট ড্রপ হচ্ছে । পরিভাষায় যার নাম অ্যারিথিমিয়া । স্যার স্টেথো লাগিয়ে খুব মন দিয়ে শুনলেন । তারপর ঘোষণা করলেন - ধ্যাৎ, এর কিস্যু হয়নি । এর এটাই নর্ম্যাল । কারো ক্ষেত্রে আবার হয়তো স্টেথো লাগিয়েই বললেন, ইমিজিয়েট বাইপাস অপারেশান দরকার । রণেনরা তখন সবে শিখেছেন - এস ওয়ান, এস-ট্যু সাউন্ড । শুনতে চেষ্টা করছেন অতি ক্ষীণ অ্যাবনরমাল হার্ট সাউন্ড । চিনতে শিখছেন এস-থ্রি, এস-ফোর গ্যালপ সাউন্ড, মারমার, ক্লিক, রাবিং সাউন্ড । দু’চার বার ওঁরা ধোঁকাও খেয়েছেন ।
একবার এক মহিলা এসেছেন - গাইনি থেকে রেফার্ড হয়ে । বয়েস বছর তেইশ । সাতাশ সপ্তাহের প্রেগন্যান্ট । সাজ পোশাক দেখেই বোঝা যাচ্ছে - অতি নিম্নবিত্ত পরিবারের । তাঁর নাকি বুকের বাঁদিকে মাঝে মাঝেই ব্যথা হয় । স্যার স্টেথো লাগিয়ে শুনলেন । তারপর ঘরের একেবারে অন্য প্রান্তে বসে ডাঃ সিনহাদের দিকে ইশারা করলেন । ওঁরা সবাই এক এক করে স্টেথো লাগিয়ে শুনলেন । শব্দ শুনে টুনে ডাঃ সিনহা এবং তাঁর সহপাঠিরা স্যারকে একবাক্যে জানালেন, হ্যাঁ, মারমার সাউন্ড পাওয়া যাচ্ছে । বেশ লাউড ।
স্যার মিচকে মিচকে হাসছেন । বললেন, সিস্টোলিক না ডায়াস্টোলিক ? কোন লেভেলের রে ? একেবারে সিক্সথ্ নাকি ?
রণেনরা সবাই সমস্বরে জানালেন সিস্টোলিক । তবে লেভেলের ব্যাপারে কেউই নিশ্চিৎ নয় । কেউ বলছে ওয়ান, কেউ থ্রি । একজন তো সিক্সথ্ লেভেলই বলে বসলো ।
স্যার তার দিকে তাকিয়ে বললেন, বলিস কী ? একেবারে সিক্সথ ? একবার স্টেথো বাদ দিয়ে কান লাগিয়ে শুনবি নাকি ?
ইঙ্গিতটা খুব স্পষ্ট । রণেন এবং তাঁর বন্ধুরা লজ্জ্বা পেয়েছিলেন । স্যার এবার হেসে উঠে বললেন, যত্তো সব ছাগলগুলো এসেছিস কার্ডিওলজি পড়তে ! ওরে প্রেগন্যান্ট মেয়েদের সিস্টোলিক মারমার খুব স্বাভাবিক ব্যাপার । তবে সেটা লেভেল ওয়ান বা ট্যু-এর বেশি হয় না । এটা খুব হাই লেভেল সাউন্ড নয় । এই ব্যথাটা গ্যাস আর ইনডাইজেশন থেকে হচ্ছে । দেখবি ? প্রমাণ করে দেব ?
বলেই স্যার উঠে পেশেন্টের কাছে গেলেন । বললেন, হ্যাঁরে, মেয়ে, কী করিস তুই ?
মেয়েটা জানালো, ঘর মোছা - বাসন মাজার কাজ করে ।
- বর আছে তো, রে ? নাকি বর ছাড়াই মা হতে চলেছিস ?
মেয়েটা সলজ্জ্বে জানায়, না না, বর আছে ।
- সে কী করে ?
- আজ্ঞে, রিক্সা চালায় ।
- বাঃ তাহলে তো সোনায় সোহাগা ! রাতে কী খাস ? ভাত না রুটি ?
- রুটি ।
- কটা রুটি খাস ?
মেয়েটির মাথাটা যেন আরো নুয়ে পড়ে । বলে, দুটো কী তিনটে !
- আর সকালে কী খেয়ে কাজে যাস ? বাসি রুটি ?
- হ্যাঁ ।
- তার মানে যেদিন তোর বরের বেশি ক্ষিধে পায়, সেদিন রাতে কম করে খাস, আর নাহলে সকালে আর কিছু খাস না । তাই তো ?
মেয়েটা বলে, কী করবো, গা গুলোয় যে !
স্যার গলায় একটা অদ্ভুত আওয়াজ করেন, হুঁহ্ ! গা গুলোয় ! গা গুলোলেই আচার খাস, তাই না ?
মেয়েটা ফিক করে হেসে ফেলে । তারপর মাথা নাড়ে, হ্যাঁ ।
- থাকিস কোথায় ?
মেয়েটি যে জায়গাটা জানায় সেটা শুনেই স্যার বলেন, আরে ও তো আমার বাড়ির কাছেই রে ! তা তোর বর কোথায় ? এসেছে ?
- হ্যাঁ, বাইরে বসে আছে ।
- যা ডেকে আন ।
মেয়েটি গিয়ে একটি লোককে সঙ্গে নিয়ে আবার ঢোকে । স্যার তাকে বলেন, এই, শোন, তুই থাকিস তো আমার বাড়ির কাছেই । রোজ সন্ধ্যেবেলা আমার বাড়ি চলে আসবি । সন্ধ্যেবেলা আমার চেম্বারে যারা আসে তাদের যেখানে যেখানে বলবো - পৌঁছে দিবি । ভাড়া আমি যা বলে দেবো তাই নিবি । আর তারপর রাতে আমার বাড়ি থেকে রাতের আর পরদিন সকালের জন্যে যা রুটি লাগবে, নিয়ে বাড়ি চলে যাবি । এ ক’দিন আর বৌটাকে খাটাসনি । আর একটা বড়ি দিচ্ছি - আগামী পনেরোদিন রোজ সকালে খালি পেটে খাওয়াবি । আর ও রোজ রাতে চারটে আর সকালে তিনটে রুটি খাবে । সকালে বড়িটা খাইয়ে বিছানা ছাড়ার আগে একটা রুটি খাইয়ে দিবি । আর একঘন্টা অন্তর ঠিক এক মুঠো করে মুড়ি খাবে । আর তাহলেই আর বুকের ব্যথা হবে না । বুঝলি ?
লোকটা সম্মতি সূচক মাথা নাড়ে । স্যার মেয়েটাকে বলেন, একদম আচার খাবি না, বুঝলি ? যা পাবি, পেট ভরে খাবি । ভাতের ফ্যান ফেলে দিবি না, নুন মিশিয়ে চায়ের মতো করে খেয়ে নিবি । এই তো লিকলিকে চেহারা । ভালো করে খাওয়া দাওয়া না করলে মা হওয়ার ধকল নিবি কী করে ?
মেয়েটি সলজ্জ্বে হাসে । স্যার এবার যে ওষুধটা লিখে দেন সেটা অতি সাধারণ, - প্যান্টোপ্রাজোল আর ডোমপেরিডোনের একটা কম্বিনেশন । মজার ব্যাপার, মেয়েটি আর তার বর স্যারের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে । স্যার হাসেন । তারপর ওদের বিদায় করে রণেনদের দিকে তাকিয়ে বলেন, শোন, ডাক্তারি করতে হলে শুধু বই পড়লেই হয় না, চোখ কান খোলা রেখে চিকিৎসা করবি । আরে, মেয়েটা বরকে খাইয়ে নিজে খালি পেটে থাকে । উইন্ড ফর্ম করে বুকে ব্যথা হয় । সকালে মর্নিং সিকনেস হয় - আর তার ওপর খুব কষে আচার খায় । সেসব না বুঝে তোরা ডাক্তারী বই কপচাতে লাগলি ! তাও যদি ভালো করে বইগুলো পড়তিস ।
পুরো ব্যাপারটা ভাবতে গিয়ে ডাঃ সিনহার হাসি পায় । স্যার কী অক্লেশে পেশেন্টকে তুই তোকারি করতেন ! মাঝে সাঝে বেদম ধমক ধামক দিতেন । এই কর্পোরেট হাসপাতালের কড়া নির্দেশে ডাঃ সিনহা প্রতিটা রোগীকে স্যার বা ম্যাডাম বলে ডাকেন । যতটা সম্ভব মিষ্টি করে কথা বলেন । তাঁদের পোশাক, টাই ইত্যাদি বিষয়ের দিকেও ম্যানেজমেন্টের তিক্ষ্ণ নজর থাকে । অবশ্য ওইরকম গরীব ঘরের পেশেন্ট কস্মিনকালেও এই সব হাসপাতালে আসবে না । তাহলেও - ওইরকম হৃদয় ঢেলে চিকিৎসা করার কথা ডাঃ সিনহা ভাবতেও পারেন না । আবার কোন পেশেন্ট পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করছে, সেটাও ভাবতে পারেন না । স্যারের ক্ষেত্রে এটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল । বিশেষত ওঁর বাড়ির চেম্বারে । সেকেন্ড ইয়ারে পড়তে ডাঃ সিনহা স্যারের বাড়ির চেম্বারে ওঁর অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে যোগ দেন । তবে সেটার পেছনে একটা ঘটনা পরম্পরা ছিল ।
তখন রণেন সেকেন্ড ইয়ার পার করে ফেলেছেন । কিছুটা শিখেও ফেলেছেন । অনেক ক্ষেত্রেই সঠিক ডায়াগনোসিস করতে পারেন । এই রকম সময়ে এক পেশেন্ট এলো । বয়েস বছর ষাটেক । বেশ মোটাসোটা । পেটটা ফোলা ফোলা । পা ফোলা । সমস্যা - ঘন ঘন চেস্ট পেন । বেশ কয়েকবার ব্ল্যাক আউট হয়েছে । ভীষণ হাঁফ ধরে । স্যার নিজে রোগীকে পরীক্ষা করলেন । বিশেষ কিছু বোধ হয় বোঝা গেলো না । রণেনদের ইঙ্গিত করলেন । কেউই হার্টে কোন অ্যাবনরম্যাল সাউন্ড পেলো না । রণেনের কী মনে হলো দ্বিতীয়বার খুব মন দিয়ে স্টেথো লাগালেন । একটু শুনতেই ওঁর বুকটা ধ্বক করে উঠলো । খুব সূক্ষ একটা মারমার সাউন্ড পেলেন । চোখ বন্ধ করে শুনতে লাগলেন । নিশ্চিত হলেন লাব আর ডুপের সাথে সূক্ষ মারমার সাউন্ড রয়েছে । রিগারজিটেশন হচ্ছে । অর্থাৎ মিট্রাল ভালভ ঠিকমত বন্ধ হচ্ছে না । রক্ত চোরা পথে ফিরে যাচ্ছে হার্টে । রণেন স্যারকে একটু ভয়ে ভয়েই কথাটা জানালেন । স্যার শুনে লাফিয়ে উঠে স্টেথো কানে লাগালেন । চোখ বন্ধ করে শুনলেন । তারপর উঠে রণেনের পিঠটা চাপড়ে দিলেন ।
তার দিন কয়েক পরে স্যার হাসপাতালে এসেই রণেনকে ডাকলেন । রণেন এগিয়ে এলেন । তাঁর ব্যাগের ভেতর থেকে একটা বাক্স বার করে রণেনের দিকে এগিয়ে দিলেন । রণেন হাতে নিয়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন । বিশ্ববিখ্যাত লিটম্যান কোম্পানির স্টেথোস্কোপ । তখন রণেন অত দামী স্টেথোর কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারেন না । সাধারণ ডাক্তাররাও সচরাচর লিটম্যান স্টেথো ব্যবহার করে না । স্যার বললেন, সেদিনের গুরুমারা ডায়াগনোসিসের প্রাইজ ।
রণেন বাক্স থেকে স্টেথোটা বার করলেন । তাঁর নাম এনগ্রেভ করা - ডাঃ আর সিনহা । রণেন স্যারের পায়ের সামনে ভেঙ্গে পড়লেন । প্রণাম করে উঠতেই স্যার ওঁর মাথার চুলগুলো একটু এলোমেলো করে দিয়ে বললেন, যত্ন করে রাখবি ।
কথাগুলো মনে পড়তে ডাঃ সিনহার আবারও হাসি পেলো । ইদানিং উনি স্টেথো বিশেষ ব্যবহারই করেন না । রোগী এলে ওঁর জনা দুই তিন অ্যাসিস্ট্যান্ট আগেই ইসিজি, ইকো, ডপলার, চেস্ট এক্স-রে, ব্লাডের হাজার গন্ডা পরীক্ষা সব করিয়ে ফেলে । অনেক সময় অনেক অপ্রয়োজনীয় টেস্টও করানো হয় । উপায় কী ? এই কর্পোরেট হাসপাতালের দেওয়া টার্গেট পূরণ না করলে হাসপাতাল ওঁকে রাখবেই বা কেন ? আর ওঁকে হাসপাতাল যা টাকা দেয় সেটা সমীরণ স্যার কল্পনাতেও আনতে পারবেন না । স্যার বলতেন, ভালো ডাক্তার, ভালো ইঞ্জিনিয়ার, ভালো উকিল, যাই হোস, তার আগে ভালো মানুষ হতে হয় । তার জন্যে রোজগার নাহয় দুটো পয়সা কমই হলো !
আসলে স্যার বুঝবেন না, যে, বুনো রামনাথের দিন আজ আর নেই । ডাঃ সিনহা এবং তাঁর পরিবারও এই বিরাট রোজগারে অভ্যস্ত হয়ে গেছে । স্যার চড়তেন একটা অ্যামবাসাডার । আর ডাঃ সিনহার এখন একটা মার্সিডিজ, একটা বিএমডব্লু, দুটো এ’দেশি নাম করা গাড়ি । তাঁর ফ্ল্যাটটা আড়াই হাজার স্কোয়্যার ফিটের । অ্যাপার্টমেন্টে স্কাই ওয়াক, স্যুইমিং পুল - সব আছে । রাতে উনি স্কটল্যান্ডের যে হুইস্কিগুলো খান তার এক একটা বোতলের দাম দশ, বিশ, তিরিশ হাজার টাকা ।
ডাঃ সিনহার মনে পড়ে সেই দিনটার কথা । স্যারের কাছে লিটম্যানের স্টেথো পাওয়ার ঘটনায় হোস্টেলের বন্ধুরা ধরে বসে - মদ খাওয়াতে হবে । তখন আর রণেনের কতটুকুই বা ক্ষমতা ! উনি দু’বোতল রাম এর টাকা দিয়েছিলেন । সেই টাকাটা রোজগার করতে বাড়তি এক রাত প্রাইভেট নার্সিংহোমে ডিউটি করতে হয়েছিল ।
এটা অবশ্য বাড়তি রোজগারের জন্যে ওঁদের মধ্যে অনেকেই প্রায়ই করতেন । রণেনদের পরিবার নিম্ন-মধ্যবিত্ত বললেই ঠিক হয় । বাবার সামান্য চাকরি । ভাই বোন দুজনেই পড়াশুনো করছে । ফলে থাকা খাওয়া বাদ দিয়ে স্টাইপেন্ডের টাকাটা প্রায় গোটাটাই বাড়িতে পাঠিয়ে দিতেন । তারপর হাতখরচা, বই কেনা - এসবের জন্যে ওটা করতেই হতো । তখন হ্যারিসনের “প্রিন্সিপ্যালস অব ইনটারনাল মেডিসিন” কেনার টাকা জোগাড় করাই ওঁর কাছে দুঃসাধ্য ছিল । লেটেস্ট এডিশন না কিনে কোন লাভ নেই । ডাঃ সিনহা ভাবেন - এখন নতুন এডিশন বেরোনো মাত্র ওঁর কাছে পৌঁছে যায় । কিন্তু বহুকাল উনি ওটা খুলেও দেখেন না ।
আর ওই প্রাইভেট নার্সিংহোমে নাইট ডিউটি করতে গিয়েই রণেন একবার পড়লেন বিপদে । হাসপাতালে দিনের ডিউটি, নাইট ডিউটি করে পরের রাতে আবার প্রাইভেট নার্সিংহোমে নাইট ডিউটি করেছিলেন । পরদিন আউটডোর, রাউন্ড সব শেষ করে ইভনিং ডিউটি করতে বসেছিলেন । আইসিসিইউতে একটি ছোট ছেলে ভর্তি ছিল । কনজেনিটাল ভাল্ভ ডিজিজ । জন্ম থেকেই তার হার্টের একটি ভাল্ভ খারাপ । সেই অবস্থায় একদিন ইস্কুলে ফুটবল খেলতে খেলতে ছেলেটা অজ্ঞান হয়ে যায় । রণেন তার সামনে চেয়ারে বসেছিলেন মনিটরের দিকে চোখ লাগিয়ে । তখন রাত সাড়ে ন’টা । বসে থাকতে থাকতে ভীষণ ঘুম পাচ্ছিল । ঢুলে পড়েছিলেন প্রায় । সম্বিত ফিরল পিঠে মৃদু করাঘাতে । চোখ তাকিয়ে দেখেন ডাঃ সান্যাল । এত রাতে সিনিয়ার ডাক্তারদের রাউন্ডে আসাটা খুব অবাক কান্ড । ডাঃ সান্যাল কিন্তু কিচ্ছু বললেন না । বেডের পাশে লাগিয়ে রাখা টিকিটটা মন দিয়ে দেখলেন । একটা ইঞ্জেকশন দিতে বললেন ।
পরের দিন হাসপাতালে এসেই রণেনকে ডেকে পাঠালেন । আর তারপর প্রচন্ড বকাবকি । আইসিসিইউ - এর এসিটা কি ডাক্তারবাবু ঘুমোবেন বলে লাগানো থাকে ? এত যদি ঘুমের দরকার তাহলে ডাক্তারী না করে কেরাণী হলেই তো হতো । বেশ দশটা পাঁচটা ডিউটি, ঘুম, সব কিছু নিয়ম মেনে হোত । রণেন নিঃশব্দে বকুনি খেলেন । খানিকক্ষণ পরে স্যার বললেন, এত ঘুম কেন ? রাতে কি লেখাপড়া করছিলি ?
রণেন একবার ভাবলেন - হ্যাঁ বলেন । কিন্তু কেন কে জানে মিথ্যে কথা বলতে ইচ্ছে করলো না । সত্যিটা বলেই দিলেন । স্যার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব জানলেন । বাড়ির অবস্থা, বাবা কী করেন - সব । গম্ভীর হয়ে গেলেন ।
দু’দিন পরে একদিন রাউন্ড শেষ করে স্যার আবার ওঁকে ডেকে পাঠালেন । বললেন, শোন, কাল থেকে রোজ সন্ধ্যেবেলা আমার বাড়ির চেম্বারে চলে যাবি । আমাকে অ্যাসিস্ট করবি । শুধু ইভনিং ডিউটি আর নাইট থাকলে সেদিন যেতে হবে না । আর একদম ওইসব প্রাইভেট নার্সিংহোমের ধার মাড়াবি না । আরে বাবা, শরীরটা ঠিক না রাখলে ডাক্তারি করবি কী করে ? তাই বলে ভাবিস না মাগনা খাটতে বলছি । মাসে মাসে মাইনে পাবি ।
তারপর যে যে মাস মাইনের অঙ্কটা বলেছিলেন সেটা রোজ নার্সিংহোমে ডিউটি করেও রোজগার করা যেতো না । রণেনের মনে হচ্ছিল স্যারকে আবার একবার প্রণাম করেন । পরের দিন থেকে শুরু হলো স্যারের প্রাইভেট চেম্বারে যাওয়া । আর রণেনের সামনে যেন একটা অদ্ভুত জগত খুলে গেলো । আউটডোরে অজস্র পেশেন্টের ভিড়ের মাঝে শেখার সুযোগ আর কতটুকু । এখানে সেটা অনেক বেশি । তার ওপর এখানে উনি একাই শিখছেন ।
স্যারের চেম্বারে দু ধরণের রোগী আসতো । রাত সাড়ে আটটা-ন’টা অবধি হার্টের রোগীরা । তাদের জন্যে ফিজ দুশো টাকা । আর তারপর শুরু হতো নিকটবর্তী অনেক বস্তির এবং পাড়ার লোকজনের জন্যে জেনারেল প্র্যাকটিস । রণেন অবাক হতেন । অতো বড়ো একজন কার্ডিওলজিস্ট কী অক্লেশে সর্দিজ্বর আর পেটের সমস্যার রোগী দেখছেন । স্যার বলতেন, জানিস, আমাদের দেশেই লোকে জেনারেল প্র্যাকটিশনারদের হতচ্ছেদ্দা করে । বিদেশে লোকে সবচেয়ে সম্মান করে জিপি-কে ।
এই রোগীদের ফিজ ঠিক করা ছিলো পঞ্চাশ টাকা । হাতে দেওয়া নয় । একটা বাক্সে ঢুকিয়ে দিতে হতো । কেউ দিতো, কেউ পারতো না । স্যারকে প্রণাম করে পায়ের ধুলো নিয়ে বিদায় নিতো । কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে আবার স্যারকেই উল্টে ওই বাক্স থেকে ওষুধ কেনার টাকা দিতে হতো । ফলে দিনের শেষ ওই বাক্সে সামান্যই পড়ে থাকতো ।
কিন্তু স্যারের লাভ ছিলো অন্য জায়গায় । সেটা হলো সম্মান । সেটা রণেন টের পেলেন কয়েকদিন পরেই । কোন কোন দিন রণেন স্যারের সঙ্গেই ওঁর গাড়ি করে চলে আসতেন । আবার এক এক দিন একটু পরে আসতেন । সেদিন আসার সময় ক্ষিধে পাওয়ায় স্যারের পাড়ার একটা দোকানে মুড়ি, চপ আর চা খেলেন । পয়সা দিতে যেতেই কেলেঙ্কারী । দোকানদার বললো, আপনি ছোট ডাক্তারবাবু না ? ডাক্তারবাবুর হেল্পার ! আপনাকে মুড়ি চপ খাইয়ে পয়সা নোবো ? কেন, আমার কি নরকের ভয় নেই ? আপনি যে দেব্তার সঙ্গে কাজ করেন তাঁর লোকের কাছে পয়সা নিলে আমার নরকেও ঠাঁই হবে না !
একদিন রণেন স্যারের সঙ্গে তাঁর গাড়ি করেই আসছিলেন । পাড়ার কাছাকাছি উল্টোদিক থেকে আসা অন্য একটা গাড়ির সঙ্গে তার একটা ছোটখাটো কলিশন হলো । উল্টোদিকের গাড়িটা ছিল স্থানীয় এক নেতার ছেলের । সে এই কলিশনের ফলশ্রুতিতে একটু মস্তানি দেখাতে গেল । পাঁচ মিনিটের মধ্যে কয়েকশো লোক জড়ো হয়ে গেল । আর তখন স্যার নিজে নেমে এসে সামাল না দিলে সেদিন ওই নেতার ছেলে গণপ্রহারে মারা যেতো । আধ ঘন্টার মধ্যে সেই নেতা এবং তাঁর ছেলে দু’জনেই এসে স্যারের কাছে ক্ষমা চেয়ে গেল ।
স্যার অনেক সময় বলতেন, আরে ডাক্তারিটা নেহাৎই একটা পেশা নয় রে ! এটা একটা ধর্ম । যেমন অক্সিজেনের ধর্ম - দহনে সাহায্য করা, তেমনি ডাক্তারের ধর্ম রোগীকে বাঁচতে সাহায্য করা । যদি ব্যবসা হিসেবে ধরিস তাহলে ডাক্তারি না করে আলু, পটল, লোহা কিংবা ধান-চাল কেনা বেচা কর । অনেক বেশি টাকা রোজগার হবে । ডাক্তারের সবচেয়ে বড়ো রোজগার যখন রোগীর বাড়ির লোক তোকে ফিজ এর টাকাটা দিয়েও বলবে, ডাক্তারবাবু, আপনি ওর প্রাণ বাঁচিয়ে দিলেন, আপনি ভগবান !
এমডি করার পরেও রণেন স্যারের সাথেই ছিলেন । একসময় দিল্লীর এইমস-এ সুযোগ পেলেন । সেটা শুনে স্যার হাসি মুখেই রণেনকে বিদায় জানিয়েছিলেন । দিল্লীর পর কয়েক বছরের জন্যে গেলেন বিদেশে । তারপর দেশে ফিরে ডাঃ সিনহা কিছুকাল প্রাইভেট প্র্যাকটিস করার পর একটা কর্পোরেট হাসপাতালে যোগ দিলেন । আরও দু’তিনটে হাসপাতাল বদল করে তিনি এখন এই জায়গায় । কিন্তু আজকের ব্যাপারটা ডাঃ সিনহাকে বেশ একটু অস্বস্তিতে ফেলে দিচ্ছে । ঘটনাটা দিন সাতেক আগের । প্রথমে ডাঃ সিনহা জানতেনই না যে পেশেন্ট সমীরণ স্যারের শ্বশুর মশাই । স্ট্রোক হয়ে ভর্তি হওয়ার পাঁচ মিনিটের মধ্যে ডাঃ সিনহা বুঝে গিয়েছিলেন পেশেন্ট বাঁচবে না । বিরানব্বই বছর বয়েস । ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকের পরে তাকে আর চিকিৎসা করে কী হবে ?
কিন্তু প্রথমেই আইসিসিইউ আর তার ঘন্টা দুয়েক পরেই ডাঃ সিনহা পেশেন্টকে ভেন্টিলেশনে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন । তার সবচেয়ে বড়ো কারণ, এ মাসে ডাঃ সিনহার টার্গেট পূর্ণ হয়নি । ডাঃ সিনহা কিন্তু তখনই জানতেন, পেশেন্ট মারা গেছে । তাহলেও নিয়মিত ওষুধ, ইঞ্জেকশন, ব্লাড টেস্ট সব কিছু চলেছে । কাল পেশেন্টের ছেলে জানালো, রোগীর পরিচয় । সেটা শুনে ডাঃ সিনহা কাল রাতেই রোগীর মৃত্যু ঘোষণা করেছিলেন । আর আজ সকালে স্যার ফোন করে জানালেন তিনি বডি নিতে আসছেন ।
ডাঃ সিনহা ভেবে রেখেছেন, স্যার আসা মাত্র তিনি স্যারকে শুনিয়ে অ্যাকাউন্টসকে নির্দেশ দেবেন, বিলের ওপর টোয়েন্টি ফাইভ পার্সেন্ট ডিসকাউন্ট দিতে । সেই মর্মে হাসপাতালের সিইও গোয়েঙ্কা সাহেবের অনুমতিও নিয়ে রেখেছেন । ডাঃ সিনহা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, স্যার এসে রোগীকে দেখলে হয়তো তক্ষুণি বুঝে ফেলবেন যে ওঁরা একটা মৃতদেহের ওপর সাতদিন ধরে চিকিৎসা চালিয়েছেন । আর স্যারের ছাত্ররা স্বাস্থ্যবিভাগের সর্বোচ্চ জায়গাতেও ছড়িয়ে আছে । এদিক সেদিক হলে হয়তো হাসপাতালের লাইসেন্স বাঁচানোই মুশকিল হবে ।
গোয়েঙ্কা সাহেব সব শুনে বলেছিলেন, আরে সেরকম বুঝলে পুরা বিল ফ্রি করিয়ে দিবেন । হামার কী আছে, হামার দো দশ খোখা নুকসান হোবে । বাদমে হামি দুসরা হসপিটাল বানিয়ে লিবে । লেকিন হাপনার তো রেজিস্ট্রিশান হি ক্যানসেল হইয়ে যাবে । তোখোন তো হাপনি ভিখ মাংবার ওবোস্থাতে ভি থাকবেন না ! যা হোক করে ম্যাটারটা সালটে লিন । চাইকি উনাকে এক দো খোখা ওফার ভি কোরবেন । জানেন তো, সোবাই বিকাও আছে । সিরিফ সহি প্রাইস ক্যোট কোরতে হোবে ।
সকাল থেকে তাই একটা অদ্ভুত অস্বস্তি নিয়ে ডাঃ সিনহা বসেছিলেন । অবশ্য আশার কথা একটাই । সন্দেহ করা আর প্রমাণ করার মধ্যে অনেক ফারাক । যদি পোস্ট মর্টেমও হয়, এসব কেস প্রমাণ করা বড়ো শক্ত । শেষ অবধি যখন খবর পেলেন, স্যার এসেছেন, ডাঃ সিনহা যেন স্বস্তি পেলেন । চেয়ার ছেড়ে উঠে তাড়াতাড়ি ঘরের বাইরে গেলেন ।
সেই চিরকালিন গটমট করে হাঁটার ভঙ্গিতে স্যার ঢুকলেন । বয়েস হলেও হাবভাব সেই আগের মতই । যদিও মুখে বেশ একটু বয়েসের ছাপ পড়েছে । দাড়ি কামাননি । গাল ভর্তি খোঁচা খোঁচা পাকা দাড়ি । ডাঃ সিনহা এগিয়ে গেলেন । প্রণাম করতে গেলেন । স্যার বাধা দিলেন । বললেন, আরে, থাক থাক, করিস কী ! এতো বড়ো হাসপাতালের কার্ডিওলজির হেড আমার মতো একটা খুচরো ডাক্তারকে প্রণাম করছে দেখলে লোকে কী বলবে ?
ডাঃ সিনহা স্যারকে ঘরে এনে বসালেন । চা কফি অফার করলেন । স্যার সম্মতি দিলেন না । বললেন, না রে, বডি নিয়ে তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে । আবার বিকেলের চেম্বারও তো বন্ধ করা যাবে না । সবার তো আর তোদের এই হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর মতো ক্ষমতা নেই ! তাদের এই হাতুড়েই ভরসা । আর বলিস না, আমার শ্বশুরমশাই মারা গেছেন শুনে পাঁচটা বস্তির লোক একেবারে ঝেঁটিয়ে এসেছে ।
কথাটা শুনে ডাঃ সিনহার হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার জোগাড় হয় । বস্তির লোকেদের ওপর স্যারের প্রভাব তো উনি বিলক্ষণ জানেন । তারা যদি একযোগে হামলা করে, তাহলে হাসপাতালের পোষা গুন্ডা, পুলিশ, কেউ কিছু করতে পারবে না । ডাঃ সিনহা ভাবেন, এবার ডিসকাউন্টের কথাটা পাড়বেন ।
স্যার বলতে থাকেন, তা সে যাকগে, আমার শালাবাবুকে বলেছি, পেমেন্ট করে দিয়ে বডি নিয়ে নিতে । তা হ্যাঁরে, এ কদিনে কী চিকিৎসা করলি একবার ফাইলটা দেখাবি ? না কি, সেটা তোদের কোম্পানির আইন বিরুদ্ধ ?
ডাঃ সিনহা একটু কাষ্ঠ হাসি হাসেন - কী যে বলেন স্যার ! আমি আগে জানলে তো আপনাকে কনসাল্ট করে সব কিছু করতাম । আপনার আত্মীয়রা একবারও বলেননি যে উনি আপনার শ্বশুর মশাই ।
ডাঃ সিনহা ফাইলটা এগিয়ে দেন । স্যার কয়েক মিনিট ধরে সব কিছু দেখেন । বললেন, নাঃ, বুড়োটার দম ছিলো বটে ! হ্যাঁ রে, রাইলস টিউব দিয়ে এক এক দিনে যা খাবার দিয়েছিস, সে তো সুস্থ লোক খেতে পারবে না রে ! দিনে তিনটে পাউচ বুড়োটা হজম করে ফেলেছে ?
ডাঃ সিনহার জিভটা শুকিয়ে যায় । বলেন, না না, স্যার, একটাই হয় তো, ভুল করে তিনবার লেখা হয়ে গেছে ।
স্যার বলেন, যাক, একটা জিনিস ভালো, লিপিড প্রোফাইল, লিভার ফাংশান টেস্ট, ক্রিয়াটিনিন এগুলো প্রত্যেকদিন করিয়েছিস । হার্ট ফেল হলেও, লিভার, কিডনি, কোলেস্টেরল এগুলো ঠিক থাকা দরকার, কী বলিস ?
ডাঃ সিনহার মুখে কথা সরে না । স্যার বলেন, আরে অতো ভাবনার কিছু নেই । বেশ করেছিস । আরে আমার শালাবাবুর অনেক পয়সা । আমি সেদিনই বলেছিলাম, বুড়ো মানুষটাকে আর টানা হেঁচড়া কোরো না । ম্যাসিভ হার্ট আ্যাটাক । দু’-এক ঘন্টার মামলা । সে ওরা শুনলো না । ওই জন্যেই আমি সাড়া শব্দ করিনি । তবে কাল এসে চুপিচুপি দেখে গেছি । দেখেই আমি বললাম, তোকে আমার কথা বলতে ।
ডাঃ সিনহা ক্রমশ নিজের দামি রিভলভিং চেয়ারের সঙ্গে যেন মিশে যেতে থাকেন । এসি ঘরে বসেও যেন ঘাম বেরোচ্ছে । খানিকটা মরিয়া হয়েই বললেন, স্যার, আমি অ্যাকাউন্টসকে বলে দিচ্ছি, ম্যাক্সিমাম ডিসকাউন্ট করে দিতে ।
স্যার হেসে বলেন, আরে না না, আমি বলে এসেছি । অলরেডি বিল পেমেন্টও হয়ে গেছে । আর চিন্তা কিসের, ইন্সিওরেন্স কোম্পানি সব টাকা রি-ইমবার্স করে দেবে ।
বলতে বলতেই ফোন বাজে । অ্যাকাউন্টস অফিসার শর্মা বলে, আরে, স্যার, পেশেন্টপার্টি তো ফুল পেমেন্ট করে দিয়েছে, এক পয়সাভি ডিসকাউন্ট চায় নি ।
ডাঃ সিনহা কোন কথা না বলে ফোন নামিয়ে রাখেন । স্যার বলেন, তুই বরং আমার একটা কাজ করে দে ।
ডাঃ সিনহা বলেন, হ্যাঁ স্যার, কী কাজ বলুন না ।
স্যার বললেন, আরে গত কাল থেকে দাড়ি কামানো হয়নি । তোদের ওই আইসিসিইউতে যে লোকটা রোজ পেশেন্টদের দাড়ি কামিয়ে দিয়ে যায়, তাকে একটু ডেকে বল না, আমার দাড়িটা কামিয়ে দিতে !
ডাঃ সিনহার ভেতর অবধি সব কিছু কেঁপে ওঠে । স্যারের হাতে অকাট্য প্রমাণ । স্যার বলে চলেন, কাল এসে দেখেই বুঝেছিলাম । কী রে, তোর কি শরীর খারাপ করছে নাকি ? যাকগে, বাদ দে, তোকে আর টেনশান দেবো না । আমি বরং নিজের একটা লাভ করে নিই ।
ডাঃ সিনহা অন্ধকার গুহার প্রান্তে হঠাৎ আলো দেখতে পান । যাক, স্যার যদি লাইনে আসেন, তবে এক কী দু’ খোখা, মানে দু’ এক কোটি টাকা দিতে কোন আপত্তি নেই । দরকার হলে গোয়েঙ্কাকে বলে আরও বাড়াবেন ।
স্যার বলেন, তোর মনে আছে, তোকে একবার একটা লিটম্যানের স্টেথোস্কোপ দিয়েছিলাম, গুরুমারা বিদ্যের প্রাইজ ?
ডাঃ সিনহা নিঃশব্দে মাথা নাড়েন । স্যার বলেন, তোর কাছ থেকে ওটা ফেরৎ নিয়ে যাবো । ওটা হয় তো আর নেই, তাহলেও একটা লিটম্যানের স্টেথো দে দিকিনি, আমি ধরে নেবো ওটা ওই স্টেথোটাই । একটা ছেলে এখন আমাকে অ্যাসিস্ট করে, ভালো স্টেথো কেনার পয়সা নেই । ওকে দেবো । তোর তো এখন নিশ্চই আর স্টেথোর দরকার পড়ে না !
ডাঃ সিনহা যন্ত্রচালিতের মতো টেবিলের পাশে রাখা স্টেথোটা নিয়ে স্যারের দিকে এগিয়ে দেন । এটাও লিটম্যানের । সবচেয়ে দামী ইলেকট্রনিক স্টেথোস্কোপ । কিন্তু ওটায় ওঁর নাম নয়, হাসপাতালের নাম এনগ্রেভ করা । স্যার হাসি মুখে সেটাকে হাতে নেন । তারপর চেয়ার ছেড়ে গটমট করে দরজার দিকে চলে যান । ডাঃ সিনহা তাড়াতাড়ি উঠতে যান । কিন্তু উঠতে পারেন না । সারা শরীরে ঘাম বেরোচ্ছে । বুকে কেমন একটা যন্ত্রণা ! ওঁর কি হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে ? ওঁর অ্যাসিস্ট্যান্টকে ডাকতে যান । কিন্তু গলা দিয়ে কোন শব্দ বেরোচ্ছে না । হাত তুলে কলিং বেলটা বাজাতে পারছেন না । ডাঃ সিনহা অসহায়ের মতো অনুভব করেন ওঁর স্যার, ওঁর গুরু, ডাঃ সমীরণ সান্যাল, ওঁর সারা জীবনের শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, কার্ডিওলজি বিষয়ে ওঁর জ্ঞান, এককথায়, ওঁর সব কিছু কেড়ে নিয়ে চলে গেলেন ।
©️নির্মাল্য ব্যানার্জ্জী ।