23/02/2026
“এই দুই নম্বর ওষুধটা কি গ্যাসের ওষুধ লিখলেন ডাক্তারবাবু? ১০ দিনের জন্য? ওটা লিখতে হবে না… ওটা তো আমি রোজ খাই!”
✍️আমি পেনটা থামিয়ে ওনার দিকে তাকালাম। চশমাটা ঠিক করে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “মানে? আপনি প্রতিদিন এই ওষুধ খাচ্ছেন? কোনো ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই?”
📍রমেশ বাবু হাসিমুখে উত্তর দিলেন, “এই তো বছর পাঁচেক হয়ে গেল… এখন তো এটা অভ্যেস হয়ে গেছে। সকালে একটা না খেলে দিনটা ঠিক জমে না।”
আমাদের চারপাশে এমন রমেশ বাবু বা মুখার্জি বাবু অজস্র আছেন। আমরা ভাবি ‘গ্যাসের বড়ি’ তো খুব সাধারণ একটা জিনিস। কিন্তু এই ‘নির্দোষ’ মনে হওয়া ওষুধটা যদি বছরের পর বছর খান, তবে শরীরে কী কী ঘটতে পারে জানেন?
🔬 এই ওষুধ আসলে আপনার শরীরে কী করে?
আমাদের পাকস্থলীর দেওয়ালে “Parietal Cell” নামে কিছু বিশেষ কোষ থাকে। এদের কাজ হলো খাবার হজম করার জন্য অ্যাসিড (Hydrochloric Acid বা HCl) তৈরি করা।
আপনি যখনই এই গ্যাসের ওষুধ (যাকে আমরা বিজ্ঞানের ভাষায় বলি PPI - Proton Pump Inhibitor) খান, তখন এটি গিয়ে ওই কোষগুলোর ‘অ্যাসিড তৈরির পাম্প’ বা রাস্তাটাকে একদম তালা মেরে বন্ধ করে দেয়। ফলে পেট আর আগের মতো অ্যাসিড তৈরি করতে পারে না। শুরুতে আপনার মনে হয় ‘আহ্, বুক জ্বালা কমল, শান্তি!’ কিন্তু এই তালাটা যদি ৫ বছর ধরে লাগানো থাকে, তবেই বিপদ শুরু হয়।
🛡️ অ্যাসিড আপনার শত্রু নয়, ‘বডিগার্ড’
আমাদের পাকস্থলীর অ্যাসিড কোনো রোগ নয়, বরং শরীরের জন্য খুব জরুরি। কেন?
1. হজম: বিশেষ করে মাছ-মাংস বা প্রোটিন হজম করতে এই অ্যাসিড মাস্ট। অ্যাসিড না থাকলে খাবার পেটে পচতে থাকে (Fermentation), আর তা থেকেই উল্টে আরও বেশি গ্যাস ও দুর্গন্ধযুক্ত ঢেকুর হয়।
2. জীবাণুনাশক: অ্যাসিড হলো শরীরের ন্যাচারাল ‘স্যানিটাইজার’। খাবার বা জলের সাথে যে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া আমাদের পেটে ঢোকে, অ্যাসিড তাদের সাথে যুদ্ধ করে মেরে ফেলে।
⚠️ দিনের পর দিন গ্যাসের ওষুধ খেলে যে বিপদগুলো ওত পেতে থাকে:
• হাড়ের বারোটা বেজে যাওয়া: ক্যালসিয়াম বা ম্যাগনেসিয়ামের মতো খনিজগুলো শরীরে শোষিত হওয়ার জন্য অ্যাসিডের উপস্থিতি জরুরি। ৫ বছর ধরে ওষুধ খেয়ে অ্যাসিড বন্ধ রাখলে হাড় খড়কুঠোর মতো ভঙ্গুর হয়ে যায় (Osteoporosis)।
• হাত-পা ঝিঁঝিঁ করা: ভিটামিন B12 শোষণের জন্য অ্যাসিড লাগে। নিয়মিত গ্যাসের ওষুধ খেলে শরীরে B12 কমে যায়, ফলে স্নায়ু দুর্বল হয়, হাত-পা অবশ ভাব লাগে এবং স্মৃতিশক্তিও কমতে থাকে।
• কিডনির নিরব ক্ষতি: অনেক সময় দেখা যায় কোনো লক্ষণ ছাড়াই কিডনির ছাঁকনি ব্যবস্থা নষ্ট হতে শুরু করেছে (Chronic Kidney Disease)।
• পেটের ইনফেকশন: অ্যাসিড কম থাকলে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া (যেমন C. difficile) পেটে বাসা বাঁধে, যা থেকে বারবার ডায়রিয়া বা পেটের অসুখ হতে পারে।
✅ তাহলে উপায় কী?
ওষুধটাকে নিজের ‘বস’ বানিয়ে ফেলবেন না। যদি রমেশ বাবুর মতো আপনারও এই অভ্যেস থাকে, তবে:
• হুট করে বন্ধ করবেন না: দীর্ঘদিনের অভ্যেস হঠাৎ ছাড়লে হিতে বিপরীত হতে পারে। ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ডোজ ধীরে ধীরে কমান।
• আসল রোগ সারান: আপনার গ্যাস কি লিভারের সমস্যার জন্য? নাকি খাবারে অনিয়ম? নাকি পেটে কোনো ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ? আগে সেটা জানুন।
• জীবনযাত্রা বদলান: পর্যাপ্ত জল খান, সময়মতো খাবার খান এবং প্রোবায়োটিক (যেমন টক দই) ডায়েটে রাখুন।
( আমি কিন্তু গ্যাসের ডাক্তার নয় , অসুবিধে হলে মেডিসিন বা গ্যাস্ট্রো ডাক্তারবাবুর পরামর্শ নিন 🙏)
fans