27/01/2026
মৃত্যু ক্যাফেটেরিয়ায় -
হাসান মাসুম
আজ দুপুরে ক্যান্সার হাসপাতালে আমার অফিস কক্ষে কন্সাল্টেশন এ আসলেন এক কমবয়সী যুগল, স্ত্রী ৩৪ বছর বয়সী, স্বামী ৩৮, এদের সাথে আমার চেনা-জানা গত ২০২৫ এর গোড়া থেকে। রোগিনী চঞ্চলা, কথাবার্তায় চটপটে, স্বামী ভদ্রলোক স্থূলদেহী শান্ত স্বভাবের। ওদের সাথে পরিচয়ের প্রথম দিন থেকে লক্ষ্য করেছিলাম স্ত্রী ভদ্রমহিলা তার স্বামীর নামে নানা অভিযোগ তুলে ধরেন আমার কাছে, এর মধ্যে অন্যতম হলো তিনি যখন সুস্থ ছিলেন তখন কোন সমস্যা ছিল না, কিন্তু রক্তের ক্যান্সার নির্ণয় হওয়ার পর থেকে ভদ্রলোক নানা অজুহাতে স্ত্রী কে যথেষ্ট সময় দেন না, এড়িয়ে চলেন, যে কবার রোগিনী আমার কন্সালটেশনে এসেছেন ততবারই স্বামীর উপস্থিতিতেই আমার কাছে স্বামীর নামে অভিযোগ করেছেন, আজকের অভিযোগ ছিল গতকাল স্বামী মহাশয় সারাদিন গাড়ি চালিয়েছেন তাই আজ ক্যান্সার হাসপাতালে আসার সময় স্ত্রীকে বলেছেন গাড়ি চালাতে কারণ তিনি নাকি ক্লান্ত। স্বামী অভিযোগ শুনেও চুপচাপ, আমি আশ্চর্য হই স্বামী ভদ্রলোকের ধৈর্য দেখে, একবারো উত্তেজিত হতে দেখিনি তাকে গত বছর থেকে আজ অব্দি।
রোগিনী আমাকে আজ জানালেন যে রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ তাকে পরীক্ষা করে এবং নানান রিপোর্ট দেখে জানিয়েছেন যে তার রক্তের ক্যান্সার উপশমের পর্যায়ে, ঔষধ ভাল কাজ করেছে গত একবছর যাবত, নিকট ভবিষ্যতে যদি সবকিছু ঠিক থাকে তাহলে তার অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন করা হবে, এই সংবাদে রোগিনী অত্যন্ত খুশি, কিন্তু এখনো স্বামী তার সাথে আসামীর মত আচরণ করছে! সে একটা রেস্টুরেন্টে তার প্রিয় খাবার খেতে চাইলে স্বামী বলেছে আজ নয় আর দুসপ্তাহ পরে ভ্যালেন্টাইন্স ডে আসছে, সেদিন তাকে খাওয়াবে ঐ রেস্টুরেন্টে!
আমি শুনলাম এতক্ষণ যা রোগিনী আমাকে বললেন, তারপর তার স্বামী কে জিজ্ঞাসা করলাম " আজ কেন নয়?" উত্তরে স্বামী আমাকে জানালেন " ডাক্তার, তুমি যদি বল তাহলে আজ সন্ধ্যায়ই আমি ওকে খাওয়াতে নিয়ে যাব ওর ইপ্সিত রেস্টুরেন্টে ", স্বামীর এই উত্তর শুনে রোগিনীর আকর্ণ বিস্তৃত হাসি।
আমি এরপরে রোগিনী কে মনে করিয়ে দিলাম ২০২৫ এ সে যখন প্রচন্ড পীড়িত অবস্থায় আইসিইউ তে ভর্তি হয়েছিল তখন কেউ একজন বলেছিল "ডাক্তার, তুমি আমার স্ত্রীকে বাঁচানোর জন্য আরো একটু চেষ্টা করবে কি" - এই লোক আর কেউ নয়, আপনার স্বামী। শুনে রোগিনী একটুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন " ডাক্তার তোমার কি মনে হয় আমি এখন আগের চাইতে অনেক সুস্থ না?" আমি বললাম " Definitely you are much better than last year"._ তারপর রোগিনী কে জিজ্ঞাসা করলাম- " আচ্ছা বলত, সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা আর চিকিৎসকদলের প্রচেষ্টায় তুমি যে আগের চাইতে অনেকটা সুস্থ হয়েছ এজন্য কাকে প্রথমে ক্রেডিট দিতে চাও?" রোগিনী আমাকে অবাক করে দিয়ে তার পাশে বসা স্বামীর দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখালেন, তার দু'চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া জলের ফোঁটা বলে দেয় স্বামীর প্রতি তার অব্যাক্ত কৃতজ্ঞতা, নিরাময় অযোগ্য রোগে আক্রান্ত হলেও স্বামী তার পাশে থেকেছেন, নিয়ত সাহস যুগিয়েছেন মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে, এরপর সজোরে আঁকড়ে ধরলেন পাশে বসে থাকা স্বামীর হাতটি, আমি ঐ অমুল্য মুহুর্তটি ক্যামেরাবন্দী না করে পারলাম না, স্থান: আমার কনসালটেশন কক্ষটি যার নাম রেখেছিলাম - "মৃত্যু ক্যাফেটেরিয়া"!