04/02/2026
আমার ছেলে অস্ট্রেলিয়ায় থাকে
অর্কপ্রভ সিনহা
চিকিৎসা শাস্ত্রে পদার্পণ করার দিনটা এক যুগ পার করলেও মূলত কর্কটশাস্ত্রে হাতে খড়ি আমার, নিতান্তই হালের। এই তো বছর চারেক আগে, যখন স্নাতকোত্তর রেডিয়েশন অনকোলজি পড়ার সুযোগ এসেছিল প্রথম, সেই তখন থেকেই এই ভাবনাটা কেমন যেন জুড়ে গিয়েছিল মনের ভিতর। ক্যান্সার হওয়া মানেই, মানুষটা এক ভিনগ্রহের প্রাণীতে রূপান্তরিত হয়। তার বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনদের চোখে তার প্রথম পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়, সে ক্যান্সার পেসেন্ট। এ কথা হার্ট ডিজিস, লাং ডিজিস, কিডনি বা লিভারের সমস্যার ক্ষেত্রে খাটে না। তাই রোগীদের সাথে মিশতে মিশতে কবে কিভাবে কেজানে, এই কর্কট রোগাক্রান্ত মানুষদের আমিও একটু অন্য চোখে দেখা শুরু করি। দে নিড স্পেশাল কেয়ার, স্পেশাল আ্যটেনশন, লাইফটাইম রিহ্যাবিলিটেশন.. এসব শুনতে শুনতে কিকরে কিজানি ওঁরা একজন মানুষের চেয়ে বেশি পেসেন্ট হিসেবেই আমার কাছে বেশি ধরা পড়তে থাকেন। কিন্তু ওই যে বলে, জীবন বা বিধাতা বা অদৃষ্ট আগে ঘটনার সম্মুখীন করে। তারপর শিক্ষা দেয়। আমার ক্ষেত্রেও হলো ঠিক তাই।
টাটা মেডিকাল সেন্টারের মেডিকাল অনকোলজির প্রাইভেট ওয়ার্ডে এক আটান্ন বছরের মহিলা ভর্তি হলেন। চতুর্থ স্টেজের ব্রেস্ট ক্যান্সারের রোগী। আগের কেমো তে কাজ হয়নি। রোগ ব্রেনে ছড়িয়েছে। তা থেকেই খিচুনি আর বমি। সেই কমপ্লেন নিয়েই ভর্তি। ঝাঁ চকচকে বিলাস বহুল প্রাইভেট কেবিনে এই অলমোস্ট পঙ্গু রোগিনীর অবস্থান বড্ড বেমানান। সঙ্গে একজন মাইনে প্রাপ্ত এটেন্ডেন্ট। বাড়ির লোক একজনও নেই। ভদ্রমহিলার সেন্স একটু ধুসর হলেও হিস্ট্রি কিন্তু তিনিই দিলেন। ব্রেন মেটাস্টেসিস। তবু স্মৃতিভ্রম হয়নি। খোঁজ নিয়ে জানলাম, বাড়ির লোক একটু বেশিই ভালোভাবে কাউন্সেল্ড। তারা জানেন, রোগিনীর আয়ু বেশিদিন না। নিউটাউনেই বাড়ি, তবু উপস্থিত নাই থাকুন হসপিটালে। বিত্তবান পরিবার, টাটা মেডিকালের প্রাইভেট ওয়ার্ডে অনির্দিষ্ট কালের জন্য রুম বুক করে দিয়েছেন, সঙ্গে চব্বিশ ঘণ্টার এটেন্ডেন্ট রেখেছেন। আর কী চাই।
তো দিন গেলো, জানা গেলো পেটসিটিতে। ব্রেন না শুধু। বোন লিভার লাং, প্রায় সব অংশেই ছড়িয়েছে ক্যান্সার। আমি অনকোলজিস্ট। এই কেস শুনে যা অনেকের কাছে “গন্ কেস” হয়ে দাঁড়ায়, সেখানেই শুরু হয় আমাদের ভূমিকা। তাই, থার্ড লাইন কেমোর প্ল্যান করে ফেলি আমরা। কিন্তু সেখানেও নতুন এক বিপত্তি। কনসেন্ট দেওয়ার মতো কোনো ফ্যামিলি মেম্বার নেই। তাদের অনুপস্থিতিতে বা কনসেন্টের অভাবে কেমো দেওয়া যে মেডিকো লিগাল অপরাধ। বিরক্ত হলাম খুব, দিন যায় একের পর এক। জিজ্ঞেস করলাম, ছেলে কোথায় আপনার? তাকে আসতে বলুন। ভদ্রমহিলা হাসি মুখ করে বললেন, “আমার ছেলে অস্ট্রেলিয়ায় থাকে”। সেই হাসিতে দুঃখ যেন কিঞ্চিৎ কম, আত্মশ্লাঘা কিছু অংশে বেশি। ব্রেনে ক্যান্সার ছড়ালে কি হবে, ছেলে অস্ট্রেলিয়ায় থাকে, এই গর্ব যেন মারণরোগকেও হার মানায়। প্রতিদিন আমি চেষ্টা করি ওঁর বাড়ির লোককে কন্ট্যাক্ট করতে, আর রোজ শুনি আমার ছেলে অস্ট্রেলিয়া তে থাকে। একদিন জিজ্ঞেস করলাম, অস্ট্রেলিয়াতে কোথায় বলুন তো? ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন মহিলা। সেন্স একটু একটু করে লোপ পাচ্ছে বলে, নাকি অস্ট্রেলিয়ায় ছেলের থাকাটাই ওনার কাছে যথেষ্ট বলে জানিনা, এই প্রশ্নের জবাবে নিরুত্তর চেয়ে থাকেন। জানতে চাই, ফোনে বা ভিডিও কলে আমার সাথে কথা বলিয়ে দিতে পারবেন? এবার বিরক্ত হয়ে বলেন তিনি, ও খুব ব্যস্ত, ফোন করার সময় পায়না।
ওই যে বললাম, জীবন আগে পরিস্থিতির সম্মুখীন করে, পরে শিক্ষা দেয়। ঠিক এই কথা যে আমি দুদিন আগেই শুনেছি। রাগ করেছিলেন একজন, আমি সারাদিন ফোন করিনা বলে। আমার টাটাতে মেডিকাল অনকোলজি পড়বার কথা তো তিনিও ঠিক ওইরকমই হাসি মুখে গর্ব করে বলেন। তার বয়সও তো আমার রোগিনীর মতোই।
কোন যাদুবলে জানিনা, সেই রোগিনীর মধ্যে আমিও সেই মানুষটাকে পেলাম, নাকি তিনি আমার মধ্যে কোনো এক অস্ট্রেলিয়বাসী কে খুঁজে পেলেন কি জানি, আমার রোগিনীর সাথে গড়ে উঠলো এক নতুন সখ্য। কেমন করে যেন টাকমাথা, বিছানার সাথে প্রায় মিশে যাওয়া মানুষটা সামনে এলেন, ক্যান্সার পেসেন্টকে পিছনে ফেলে। ডাক্তার আর রোগী? নাকি দুটো মানুষ একাকার হয়ে যেতে লাগলো রোজ। রাউন্ডের মাঝে মাঝেই চলতে লাগলো বাড়ির কত গল্প, কত কথা। কেনো এই বিভেদ, কেনো তারা আসেন না, বাংলাদেশের কোথায় তাদের আদি বাড়ি, টাটা মেডিক্যালে আমি কি পড়ি ইত্যাদি ইত্যাদি।
আমি শুনেছি, আমার এই লেখা গুলো পড়ে অনেকে দুঃখ পান। একজন অনকলোজিস্টের জীবন যেন খালি মৃত্যু আর হতাশা পরিবেষ্টিত। কিন্তু বিশ্বাস করুন আমার অভিজ্ঞতার এই রোজনামচার গল্প, মেলোড্রমাটিক, ট্র্যাজিক স্টোরি না, খালি নিজের বিবেকের মুখোমুখি নিজেকে আর পাঠককে দাঁড় করানোর এক প্রচেষ্টা। সত্যি ভেবে বলুন তো? আপনিও কি সত্যি চান, নিজের শেষ সময়ে নিজের প্রিয়জনের থেকে এই আকাশ পাতাল দূরত্ব। পেসেন্ট সত্ত্বার চেয়ে অনেক অনেক আগে যে মানব সত্ত্বা স্থান পায়, তার হদিশ পাওয়াই কি একজন চিকিৎসকের একম অদ্বিতীয়ম লক্ষ্য হওয়া উচিৎ নয়? কী জানি.. জীবন ফকির শেখানো যে কখনোই বন্ধ করেননা।
ওহ হো, ভুলেই গেছি বলতে। আজ সকালে গিয়ে দেখি, প্রাইভেট ওয়ার্ডের রুম নাম্বার থারটি নাইন ফাঁকা। ওনার ছেলে অস্ট্রেলিয়াতেই আছেন। আসতে পারেননি। কিন্তু উনি চলে গেছেন আরো অনেক দূর দেশে। সব জমাটবাঁধা গল্প আর কষ্ট সঙ্গে নিয়ে। রুম থারটি নাইনের বেডশিট চেঞ্জ করা হচ্ছে। রুম ক্লিনিং চলছে পুরোদমে। নতুন পেসেন্ট এডমিট হবেন যে….
অর্কপ্রভ সিনহা