10/02/2026
অনেকের কানের ভেতর সারাক্ষণ শোঁ শোঁ, ভোঁ ভোঁ, বাঁশি বাজানোর মতো, ক্লিক ক্লিক বা গর্জনের মতো শব্দ শোনা যায়। বাইরে কোনো শব্দ না থাকলেও এই অনুভূতি থাকে—বিশেষ করে একা, নীরব বা নিরিবিলি পরিবেশে থাকলে শব্দটি আরও বেশি প্রকট মনে হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই সমস্যাকে বলা হয় টিনিটাস (Tinnitus)। এটি একটি জটিল অবস্থা; একবার শুরু হলে অনেকের ক্ষেত্রে সহজে সেরে ওঠে না এবং দীর্ঘদিন ভোগাতে পারে।
🧠 টিনিটাস কী ও কত ধরনের
টিনিটাস মূলত কানের ভেতরে অস্বাভাবিক শব্দ শোনা, যার কোনো বাহ্যিক উৎস নেই। টিনিটাস সাধারণত দুই ধরনের—
➖ সাবজেক্টিভ টিনিটাস: রোগী নিজেই কানে শব্দ শোনেন; আশপাশের কেউ তা শুনতে পান না।
➖ অবজেক্টিভ টিনিটাস: খুব বিরল; কান পাতলে অন্য ব্যক্তিও শব্দ শুনতে পারেন।
👂 কেন টিনিটাস হয়
কান তিন ভাগে বিভক্ত—বহিঃকর্ণ, মধ্যকর্ণ ও অন্তঃকর্ণ। এই অংশগুলোর যেকোনো একটিতে সমস্যা হলেই টিনিটাস হতে পারে।
🟠 বহিঃকর্ণজনিত কারণ
➖ কানে অতিরিক্ত ময়লা জমে থাকা
➖ হঠাৎ বিস্ফোরণ বা তীব্র শব্দে কানে আঘাত
➖ দীর্ঘদিন উচ্চ শব্দের পরিবেশে কাজ করা
➖ বয়সজনিত শ্রবণশক্তি হ্রাস
➖ মাথা বা ঘাড়ে আঘাত
🟡 মধ্যকর্ণজনিত কারণ
➖ অটোস্ক্লেরোসিস—মধ্যকর্ণের তিনটি হাড় (ম্যালিয়াস, ইনকাস, স্টেপিস) শক্ত হয়ে নড়াচড়া কমে গেলে টিনিটাস হতে পারে।
🔵 অন্তঃকর্ণজনিত কারণ
➖ অন্তঃকর্ণের ফ্লুইডের চাপ বেড়ে গিয়ে মেনিয়ারের ডিজিজ হওয়া
➖ চোয়ালের টেম্পোরোম্যান্ডিবুলার জয়েন্টে (TMJ) সমস্যা বা আঘাত
➖ মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন কমে যাওয়া
➖ ভেস্টিবুলোকোক্লিয়ার নার্ভের রোগ বা আশপাশে টিউমার
এ ছাড়া ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কার্ডিওভাসকুলার রোগ, তীব্র রক্তস্বল্পতা, হরমোনজনিত সমস্যা, অটোইমিউন ডিজিজ, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ ও ধূমপান—এসব অবস্থায় টিনিটাসের ঝুঁকি বাড়ে। পুরুষদের মধ্যে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
🩺 টিনিটাসের চিকিৎসা
টিনিটাসের সম্পূর্ণ নিরাময় সব ক্ষেত্রে সম্ভব নয়, তবে সঠিক ব্যবস্থাপনায় উপসর্গ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। চিকিৎসা সাধারণত তিন ধাপে দেওয়া হয়—
কারণ নির্ণয় ও চিকিৎসা
➖ কানে ইনফেকশন বা ময়লা থাকলে তা দূর করলে অনেক সময় টিনিটাস কমে যায়।
কাউন্সেলিং ও থেরাপি
➖ কারণ স্পষ্ট না হলে টিনিটাস কাউন্সেলিং ও কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি (CBT) উপকারী। এতে শব্দের প্রতি মানসিক প্রতিক্রিয়া কমে।
ওষুধ ও সহায়ক ডিভাইস
➖ মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন কম থাকলে উপযুক্ত ওষুধ দেওয়া হয় (চিকিৎসকের পরামর্শে)।
➖ যাদের টিনিটাসের সঙ্গে কানে কম শোনা আছে, তাদের শ্রবণসহায়ক যন্ত্র ও প্রয়োজনে টিনিটাস মাস্কার ব্যবহার করতে বলা হয়—এটি হালকা ব্যাকগ্রাউন্ড শব্দ তৈরি করে কানের ভেতরের শব্দকে প্রশমিত করে।
🎵 সাউন্ড থেরাপি ও দৈনন্দিন কৌশল
➖ একদম নীরব পরিবেশ এড়িয়ে চলা
➖ ঘুমের সময় টিকটিক ঘড়ি, ফ্যান বা হালকা মিউজিক চালু রাখা
➖ ধ্যান ও রিলাক্সেশন অনুশীলন
➖ প্রয়োজনে সাউন্ড-এমিটিং বিশেষ বালিশ ব্যবহার
🧠 মানসিক প্রভাব
টিনিটাস দীর্ঘদিন থাকলে ঘুমের সমস্যা, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, অবসাদ, মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার মতো মানসিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক সহায়তা ও কাউন্সেলিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
🛡️ টিনিটাস প্রতিরোধে করণীয়
➖ শব্দদূষণ এড়িয়ে চলা
➖ হেডফোনে উচ্চ শব্দে গান না শোনা
➖ উচ্চ শব্দের কর্মস্থলে ইয়ারপ্লাগ/সাউন্ড প্রটেক্টর ব্যবহার
➖ ক্যাফেইন, অ্যালকোহল ও ধূমপান পরিহার
➖ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ ঝুঁকিপূর্ণ রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা
➖ কানে কোনো সমস্যা হলে দ্রুত ENT বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া
সচেতনতা ও সময়মতো সঠিক ব্যবস্থাপনাই টিনিটাসে স্বস্তির সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি।