10/12/2019
গভীর রাত! গোটা মাদীনা জুড়ে পিনপতন নীরবতা। সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ঘুম নেই খলিফা উমার বিন খত্তাবের (রা.) চোখে। মাদীনার জনপদে অলিগলিতে ঘুরে ঘুরে প্রজাসাধারণের শান্তির ঘুম নিশ্চিত করছেন খলিফা।
প্রহরীবিহিন সম্রাট একা একা হাঁটছেন মাদীনার প্রান্তরে। হাঁটতে হাঁটতে একটা জায়গায় গিয়ে দেখলেন, খানিক দূরেই একটা তাবুতে আলো জ্বলছে! তাবুর সামনে উদ্বিগ্ন ভঙ্গিতে পায়চারি করছে এক লোক! এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে একটু পরপর! লোকটার হয়তো সাহায্য দরকার তাই আশেপাশে কাউকে পাওয়া যায় কিনা দেখছে।
এগিয়ে গেলেন আমীরুল মু'মিনীন। লোকটার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
-আপনাকে দেখে খুব পেরেশান মনে হচ্ছে। আপনার কি কোনো সাহায্য দরকার?
-" হ্যাঁ সমস্যার মধ্যে আছি, কিন্তু আপনাকে বললে কি আর সমাধান হবে?
-কী সমস্যা আমাকে বলতে পারেন, দেখি কোনো সমাধান করতে পারি কিনা!
-"আমার ব্যক্তিগত সমস্যা! আপনি কিছুই করতে পারবেন না। আপনি বরং আসতে পারেন।" কিছুটা বিরক্ত হয়ে উত্তর দিলো লোকটি।
-"আমাকে খুলে বলুন৷ আমি সাধ্যমতো সাহায্য করার চেষ্টা করবো।" আবারো অনুরোধ করলেন খলিফা উমার বিন খত্তাব (রা.)
-"এ তো দেখছি কঠিন উপদ্রব! এমনিতেই দুশ্চিন্তার মধ্যে আছি তার উপর আপনি এই মধ্যরাতে কেন বিরক্ত করছেন মশায়! যান তো, নিজের কাজে যান।" বেশ বিরক্ত হয়ে উত্তর দিলো লোকটি৷
লোকটি নিশ্চয়ই বড়ো কোনো সমস্যায় আছে বুঝতে পেরে খারাপ ব্যবহার করা সত্ত্বেও নিজের স্বভাবজাত রাগকে নিয়ন্ত্রণ করলেন উমার।
-আচ্ছা, চলে যাবো। সাহায্য করতে পারি বা না পারি একজন মুসলিম হিশেবে অপর মুসলিমের সমস্যাটা তো অন্তত জানতে পারি নাকি?
লোকটি এবার কিছুটা শান্তভাবে বলল, "এই পথ দিয়েই যাচ্ছিলাম৷ রাত হয়ে যাওয়ায় এখানেই তাবু খাটাই। আমার স্ত্রী সন্তানসম্ভবা! তাবুর মধ্যে সে প্রসব বেদনায় কাতরাচ্ছে! কিন্তু আশেপাশে কোনো বাড়ি বা কেউই নেই যে এই সময় আমাদের সাহায্য করতে পারে৷ আপনাকে বলে আর কী বা হবে?
উমার (রা.) লোকটির কথা শুনে তাকে অপেক্ষা করতে বলে দ্রুত সেখান থেকে প্রস্থান করলেন। লোকটি ভাবলো হয়তো বিপদের কথা শুনে কেটে পড়েছে আর ফিরবে না।
উমার (রা.) বাড়িতে গিয়ে তার স্ত্রীকে সঙ্গে করে নিয়ে এলেন। লোকটি একবার ভিতরে ঢুকছিলো একবার বাইরে বেরিয়ে আশেপাশে তাকাচ্ছিলো। উমার (রা.) তাকে বললেন, আপনি শান্ত হন। আমার স্ত্রীকে নিয়ে এসেছি, প্রসূতি নারীদের ব্যাপারগুলো সে ভালো বোঝে। সে ভিতরে গিয়ে আপনার স্ত্রীকে দেখুক।
লোকটি এবার কিছুটা ভরসা পেলো। খলিফার স্ত্রী বেদনার্ত মহিলাকে দেখতে ভিতরে গেলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে মহিলার সন্তান প্রসব হলো। ভিতর থেকে খলিফার স্ত্রী বললেন, "আপনার বন্ধুকে একটি ফুটফুটে সন্তানের সুসংবাদ দিন হে আমীরুল মু'মিনীন! মা ও শিশু দুজনেই সুস্থ আছে আলহামদুলিল্লাহ!
উৎকণ্ঠা নিয়ে বাইরে অপেক্ষা করতে থাকা লোকটি নিজ সন্তানের সুসংবাদ শুনে আনন্দিত হলেও, ভিতর থেকে আগন্তুক ধাত্রী মহিলার তার স্বামীকে করা সম্বোধনের কথাটা খেয়াল হতেই আশ্চর্য হলো সে। হায়! ইনি কি তবে আমীরুল মু'মিনীন উমার বিন খত্তাব! দুই মহাদেশের শাসক; সমগ্র হেজাজ, ইয়ামান, ইরাক, শাম, পারস্য, ককেশাস, মিসর, লিবিয়ার একচ্ছত্র সম্রাট! আমার তাবুতে এসেছেন আমাকেই সাহায্য করতে আর তার সম্মানিতা স্ত্রী আমার সন্তানসম্ভবা স্ত্রীর প্রসূতিকালীন সেবা করলেন! আর আমি কিনা তাকে না চিনে তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলাম!
অনুশোচনা ও ভয়ে চুপসে গেলো লোকটি। খলিফার হাতে চুমু খেয়ে বলল, আমাকে ক্ষমা করুন হে আমীরুল মু'মিনীন, আমি আপনাকে না চিনে তখন খারাপ ব্যবহার করেছি। অথচ আপনি আমার উপর কত বড়ো দয়া করলেন। উমার (রা.) লোকটির কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, দয়া তো কেবল আল্লাহই আমাদের সকলের উপর করে থাকেন। আমি যা করেছি তা দয়া নয়। এ আমার দায়িত্ব। বরং আপনি আমাকে মাফ করে দিন, কেননা খিলাফাতের কোনো নাগরিক, রাজধানী মাদীনায় বসেই বিপদে পড়ে দুশ্চিন্তায় ভুগছে আর উমার তার খবরও রাখতে পারছে না। তাহলে সারা সাম্রাজ্যের আনাচে-কানাচে বিভিন্ন শহরে না জানি কত মানুষ বিপদে আছে কিন্তু উমার তার খবরও জানে না। আল্লাহর দরবারে তাদের একটা অভিযোগ উমারের ধ্বংস হওয়ার জন্য যথেষ্ট, যদি না আল্লাহ আমার প্রতি দয়া করেন।
সিরিজ/সাগরসেচা মণিমুক্তা -০৯