11/07/2021
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিচালক ড. টেড্রোস আধানম গেবরিয়াসুস শনিবার বলেন, কমপক্ষে ৯৮ দেশে ভারতে প্রথম শনাক্ত করোনাভাইরাসের ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, ভ্যারিয়েন্টটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। এটির কাঠামোগত ও চারিত্রিক রূপান্তর ঘটে চলেছে।
ডেল্টা প্লাস ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে বিশ্বে উদ্বেগ বাড়ছে। করোনার এ ধরন মোকাবিলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক কর্মকর্তা বলেছেন- ডেল্টা প্লাস ভ্যারিয়েন্টের হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে অবশ্যই টিকা নিতে হবে। কারণ, দেখা গেছে টিকা না নেওয়া মানুষের ভেতরই ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ছড়াচ্ছে বেশি।
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ মনিকা গান্ধীকে উদ্ধৃত করে ব্লুমবার্গ লিখেছে, যেসব টিকা এ পর্যন্ত অনুমোদন পেয়েছে, তার সবগুলোই ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে কার্যকারিতা দেখিয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে হয়ত দেখা গেছে টিকা দেওয়ার পরও মানুষ সংক্রমিত হয়েছে, তবে তাদের ক্ষেত্রে উপসর্গ ও অসুস্থতার মাত্রা অনেকটাই কম। যুক্তরাজ্য থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যাচ্ছে, যারা টিকা নেয়নি, তারা এই ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত হলে, তাদের মারাত্মক অসুস্থতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার হার আলফা ভ্যারিয়েন্টের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
সর্বশেষ গত ৪ জুলাই আইইডিসিআর জানায়, বাংলাদেশে গত এপ্রিলে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হওয়ার পর থেকে ভারতের ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের শনাক্তের হার বৃদ্ধি পেতে থাকে। দেশে এই ভ্যারিয়েন্ট মে মাসে ৪৫ শতাংশ ও জুন মাসে ৭৮ শতাংশ নমুনায় শনাক্ত হয়। বর্তমানে দেশে কোভিড-১৯ সংক্রমণে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের সুস্পষ্ট প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে।
আইইডিসিআর বলছে, বাংলাদেশে ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে এই বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সিকোয়েন্স করা সব নমুনায় আলফা ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া যায়। মার্চ মাসে সিকোয়েন্সকৃত মোট নমুনার ৮২ শতাংশ বিটা ভ্যারিয়েন্ট ও ১৭ শতাংশ আলফা ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া গেছে। এপ্রিল মাসেও বাংলাদেশে কোভিড-১৯ সংক্রমিতদের মধ্যে বিটা ভ্যারিয়েন্টের প্রাধান্য ছিল।
আইইডিসিআর জানায়, কোভিড-১৯ নমুনা পরীক্ষায় প্রাপ্ত ভ্যারিয়েন্ট সম্পর্কিত তথ্য জিনোম সিকোয়েন্সের বৈশ্বিক ডাটাবেজে জিআইএসএ আইডিতে জমা দেওয়া হয়ে থাকে। যে ধরনের ভ্যারিয়েন্টই হোক না কেন, তা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য সঠিকভাবে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণই করাই একমাত্র উপায়। এর সঙ্গে কোভিড-১৯ টিকা প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে ভ্যাকসিন নেওয়া প্রয়োজন।
দেশের চলমান লকডাউন বা কঠোর বিধিনিষেধ অমান্য করার ঘটনা ঘটছে। এতে রোগী সংখ্যা যদি অস্বাভাবিক বেড়ে যায় তাহলে আবারও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম বলেন, সংক্রমণের উচ্চমুখী এই প্রবণতা যদি অব্যাহত থাকে, জুলাইয়ে রোগী সংখ্যা এপ্রিল ও জুন মাসকে ছাড়িয়ে যাবে। লকডাউন বা বিধিনিষেধ অমান্য করার কারণে রোগীর সংখ্যা যদি অস্বাভাবিক বেড়ে যায়, তাহলে আমরা আবারও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যাবো।
সরকারের পাবলিক হেলথ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য ড. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ভারতে যেরকম আচরণ করেছে, এখানেও ঠিক তা-ই করছে। মানুষকে অধিক হারে সংক্রমিত করছে। আবার অনেকেই সংক্রমিত হয়ে বাড়িতেই থাকছেন। সংক্রমিত হওয়ার পর বুঝতে পারছে না, হাসপাতালে আসতেও দেরি করে ফেলছেন, যার ফলে দ্রুত মৃত্যুর দিকে চলে যাচ্ছে। এখন আমাদের দেশের সর্বত্রই ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট আছে।
🔴 ‘ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের’ বিরুদ্ধে কোন টিকা কতটা কার্যকর?
ফাইজার-বায়োএনটেকঃ
গত ১৪ জুন তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যের বরাতে গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, যারা ফাইজারের একটি ডোজ নিয়েছেন, চার সপ্তাহ পর দেখা গেছে, তাদের ৩৬ শতাংশের ক্ষেত্রে এ টিকা ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে কার্যকর সুরক্ষা দিতে পেরেছে। দুই ডোজের পর তা বেড়ে ৮৮ শতাংশ হয়েছে।
অ্যাস্ট্রাজেনেকাঃ
পাবলিক হেলথ ইংল্যান্ডের গবেষণার বরাত দিয়ে গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার এক ডোজ ‘ডেল্টা ধরনের’ বিরুদ্ধে ৩০ শতাংশ কার্যকারিতা দেখিয়েছে। আর দুই ডোজ নেওয়া ব্যক্তিদের ৬৭ শতাংশের ক্ষেত্রে এই টিকা সুরক্ষা দিতে পেরেছে।
মডার্নাঃ
মডার্নার টিকাও ফাইজার-বায়োএনটেকের টিকার মত একই পদ্ধতিতে তৈরি। যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসির এক গবেষণার বরাত দিয়ে এনবিসি বস্টনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মর্ডানার টিকার এক ডোজ ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে ৮০ শতাংশ এবং দুই ডোজ ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সুরক্ষা দিতে পারে। মডার্না বলেছে, তাদের টিকা ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরির ক্ষেত্রে বেটা ভ্যারিয়েন্টের চেয়েও ভালো ফল দেখিয়েছে।
জনসন এন্ড জনসনঃ
সাম্প্রতিক দুটি গবেষণা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জনসন অ্যান্ড জনসন বলেছে, ভাইরাসের মূল ধরনটির বিরুদ্ধে তাদের টিকা যতটা কার্যকর, তার চেয়ে ডেল্টা ধরনের বিরুদ্ধে সামান্য কম কার্যকর। তবে সাউথ আফ্রিকায় শনাক্ত হওয়া বেটা ধরনের চেয়ে ভারতে শনাক্ত ডেল্টা ধরনের বিরুদ্ধে এ টিকা বেশি কার্যকর।
ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে ৮৫ শতাংশ কার্যকারিতা দেখিয়েছিল জনসনের টিকা। তবে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা কত শতাংশ থাকে, সেই সুনির্দিষ্ট তথ্য এখন ও তারা প্রকাশ করেনি।
স্পুটনিক ভিঃ
ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে এ টিকার কার্যকারিতা নিয়ে স্বাধীন কোনো গবেষণা এখনও প্রকাশিত হয়নি। তবে গামালিয়া ইনস্টিটিউট জুনের শেষে দাবি করেছে, করোনাভাইরাসের অতি সংক্রামক ওই ধরনটির বিরুদ্ধেও তাদের টিকা ৯০ শতাংশের মত কার্যকারিতা দেখিয়েছে।
চীনের তিন টিকাঃ
করোনাভাইরাসের কোন ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে চীনের কোন টিকা কতটা কার্যকর সে বিষয়ে বড় কোনো গবেষণার বিস্তারিত তথ্য এখনও প্রকাশ করেনি দেশটি। সে কারণে বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের অস্পষ্টতা রয়েছে। তবে চীনা বিশেষজ্ঞরা দাবি করে আসছেন, ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধেও তাদের তৈরি টিকাগুলো কার্যকর এবং গুরুতর অসুস্থতা ঠেকাতে সক্ষম।
চীনা সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞা জং নানশানকে উদ্ধৃত করে রয়টার্স এক প্রতিবেদনে বলেছে, যে গবেষণার ভিত্তিতে তারা কার্যকারিতার কথা বলছেন, তা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
🔴প্রায় দুই মাস বন্ধ থাকার পর করোনা ভাইরাসের টিকার জন্য নিবন্ধন ৭ জুলাই থেকে আবার চালু করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বুধবার সকাল ১০টা থেকে সুরক্ষা ওয়েবসাইট ও অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন চালু হয়। টিকা নেওয়ার বয়সসীমা ৩৫ বছরে নামিয়ে আনা হয়েছে। অগ্রাধিকার তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী এবং প্রবাসী শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
১২টি সিটি করপোরেশন এলাকায় দেওয়া হবে মডার্নার টিকা আর জেলা-উপজেলা পর্যায়ে দেওয়া হবে চীন থেকে কেনা সিনোফার্মের টিকা।
ভ্যাকসিন ডিপ্লয়মেন্ট কমিটির সদদ্য শামসুল হক মনে করেন, ‘মডার্নার ভ্যাকিসন টেম্পারেচার সেনসিটিভ, মাইনাস ২০-তে রাখতে হয়, তাই এ টিকা দেওয়া হবে সিটি করপোরেশন এলাকায়। সিটি করপোরেশন এলাকার আওতায় থাকা সাধারণ মানুষ এই টিকার আওতায় আসবে। আর সিনোফার্মের ভ্যাকসিন রাখা যায় দুই থেকে আট ডিগ্রি সেলসিয়াসে। তাই জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে সিনোফার্মের টিকা দেওয়া হবে। এছাড়া একই জায়গায় যদি দুই ধরনের টিকাদান কর্মসূচি চলে তাহলে হয়তো কিছুটা সমস্যা তৈরি হতে পারে। সঙ্গে তাপমাত্রার একটা বিষয় তো রয়েছেই। সে কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
#টিকানিন
#ঘরেথাকুন
#মাস্কপরুন
#স্বাস্থ্যবিধিমেনেচলুন