16/11/2025
স্বাস্হ্যসেবায় জটিলতার গল্পঃ
কালিপদ বাবুর (মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট)
বিচার চাই। ।
---------------- ------------------------------------
কালিপদ দাস।
আমার সাবেক সহকর্মী। তখন পদবী ছিল মেডিক্যাল এসিসট্যান্ট। যেটি এখন সাব এসিস্ট্যান্ট কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার।
১৯৯৬ সালের ঘটনা।
আমার প্রথম কর্মস্হল জকিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কাজ করি। সিলেট বেল্টের সীমান্তবর্তী একটি রিমোট অঞ্চল ছিল তখন। চিকিৎসক সংখ্যা আমি সহ চারজন। একজন ইউএইচএফপিও, আমি ও আমার বন্ধু, চতুর্থজন বেশ সিনিয়র, এমও এমসিএইচ এন্ড এফপি। খুব বিপদে পড়লে তাকে দায়িত্ব দিতাম।
কাজের চাপ অসহনীয়। শুরুতে একজন সিনিয়র ভাই ছিলেন, ডাঃ শাহাবুদ্দিন ভাই, চলে গেলেন ইংলযান্ডে। দুই বন্ধু মিলে সারা সপ্তাহ জরুরীবিভাগ, ইনডোর, আউটডোর চালানো খুব কস্টকর কাজ ছিল। এর মাঝে প্রায়ই বড় স্যারের দায়িত্বে থাকতে হতো, স্যার বিভিন্ন মিটিং এবং প্রোগ্রামে বিজি থাকার কারণে।
এমন দুঃসহ কস্টের মাঝে দুইজন মেডিকেল এসিসটেন্ট ও একজন পুরুষ এসএসএন আমাদের বহির্বিভাগের বিভিন্ন কর্ণারে ও জরুরীবিভাগে দুহাত বাড়িয়ে সহযোগিতা করেছেন। এদেরই একজন গল্পের কালিপদ দাস।
কালিপদ বাবু।
হ্যা, আমরা তাকে এই নামেই ডাকতাম। গ্রামের মানুষ তাকে ডাকতো কালি ডাক্তর,কালিপদ ডাক্তর, ডাক্তরবাবু।
ভিষণ ব্যাস্ত মানুষ ছিল সে। আমি তো প্রথম দিন থেকেই অবাক হয়েছি। ক্যাম্পাসে ঢুকার মুখেই একটি কোয়ার্টারে থাকতো সে। প্রথমদিন ঢুকার সময় তার বাসার চারপাশে রাস্তায় মানুষ ভিড় করে আছে দেখে অফিসে জিগ্যেস করে জেনেছি, ওটা কালিপদ বাবুর বাসা। দিনরাত চব্বিশ ঘন্টা দূরদূরান্তের রোগীরা এসে অপেক্ষা করে কালিপদ বাবুর চিকিৎসার আশায়।
বিষয়টি সকল প্র্যাক্টিশনারদের জন্য বিব্রতকর হলেও আমি বেশ এনজয় করতাম। সারাজীবনই আমি উদাসীন মানুষ, সবকিছুতেই। প্র্যাক্টিসেও। নিয়ম মেনে যেটুকু প্র্যাক্টিস হতো নির্দ্দিষ্ট ঘোষিত সময়ে, না হলে নাই। গ্রামের মানুষ। সময় বুঝেনা।নির্দ্দিষ্ট সময়ের বাইরে আমাকে রোগী দেখাতে খুঁজে না পেয়ে বলতো, পাগলা ডাক্তর। উপজেলার অন্যান্য অফিসাররা হাসতো।
তো, সেই কালিপদ বাবু, সর্বদা হাসিখুশি মানুষ। মাথাভর্তি কোকড়ানো চুল আর গালভর্তি পান। আমি তাকে কখনো হাসিছাড়া দেখেনি। কখনো কোন কাজে না বলতে শুনিনি। কেমন করে দিনরাত এতো লোককে সামাল দেয় জানতে চাওয়ায় বলেছিল, স্যার প্রথম প্রথম পয়সার প্রয়োজনে করতাম। পয়সা যে খুব আহামরি, তাও না। এখন নেশা হয়ে গেছে। রোগীদের দারিদ্র আর ভালোবাসাই তার স্পৃহা।
একবার আমি একা হাসপাতালে। আমার বন্ধু এবং বড় স্যার, দুজনেই ঢাকায়। ইউএচএফিওর চার্জে আমি। চব্বিশঘন্টা ক্যাম্পাসে আটকা। একদিন দুপুর বারোটায় সবাইকে সতর্ক করে আমি বাজারে গিয়েছি ব্যাংকের কাজে। সব মিলে মিনিট বিশেক।
একই রিক্সায় ফেরার পথে হাসপাতাল থেকে কোয়ার্টার কিলো দূরে থাকতেই একটা মিছিলের শ্লোগানের আওয়াজের মতন শুনতে পেলাম পরিচিত নামে। প্রথমে ভুল মনে করলেও পরে আওয়াজ বৃদ্ধির সাথে শুনতে পেলাম, কালিপদের শাস্তুি চাই, কালিপদের দুই গালে......ইত্যাদি।
আমি দ্রুত হাসপাতালে গিয়ে কালিপদ বাবুকে হাসপাতাল থেকে অন্যত্র সরিয়ে দিয়ে ইউএইচএইফপিও এর কক্ষে ঢুকে বসলাম। শ্লোগানের শব্দ বাড়তে বাড়তে রুমের দরজার বাইরে এসে চলতে থাকলো।
অফিসের সব লোকজন আমার রুমের ভিতরে।
সবাই ভীত। জানতে চাইলাম কি বিষয়। কালিপদবাবু ডায়রিয়ার ওআরটি কর্ণারে ডিউটি করার সময় কোন নতুন মাকে তার শিশুকে কিভাবে দুধ খাওয়াতে হবে বলতে গিয়ে নাকি অসদাচরণ করেছে। তারই প্রতিবাদে স্হানীয় কলেজের ছেলেরা মিছিল নিয়ে এসেছে কালিপদের শাস্তি চাইতে।
মনে মনে কিছুক্ষণ হাসলাম সেই বিপদের মধ্যেই। আমি মাত্র একবছর হলো কর্মকর্তা হয়েছি। হাসপাতাল সংক্রান্ত আমার বহু ধারণা এরই মাঝে ওলটপালট হয়ে গেছে। যাই হোক, গম্ভীর হয়ে হেড এসিস্ট্যান্ট ফরিদ সাহেবকে বললাম, ওদের মধ্যে দশজন নেতৃস্থানীয়কে ভিতরে আসতে বলুন। আমি সবার সাথে কথা বলবোনা। পাগলা ডাক্তর হিসেবে অনেকেই ইতিমধ্যে আমাকে চিনতো এবং মানতো।
তারা দশজনই এলো। বসতে বললাম সবাইকে। পরিচয় বিনিময় করে স্হির করতে চেষ্টা করলাম। জানতে চাইলাম কি অভিযোগের কারণে তারা কস্ট করে এসেছে।
বিস্তর অভিযোগ তাদের হাসপাতাল নিয়ে। তবে, প্রধান অভিযোগ কালিপদ নাকি কোন মহিলাকে অপমান করেছে বাজে কথা বলে। সেই মহিলাকে আনতে বললাম। দরজার বাইরেই ছিল সে। জানতে চাইলাম কালিপদ কি কথা বলেছে তাকে। সে জবাব না দিয়ে মাথা নিচু করে রইলো।
আমি বললাম, কালিপদ কি বলেছে, যে আপনার বাচ্চাকে বুকের দুধই খাওয়াতে ছয়মাস। দুধ খাওয়ানোর আগে আপনার বুকের পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা ঠিক রাখতে হবে। বাচ্চার মুখে স্তনের শুধু বোটা দিলে হবেনা। তাহলে দুধ পাবেনা। স্তনের কালো অংশের বেশীরভাগ বাচ্চার মুখে ঢুকিয়ে দিতে ইত্যাদি ইত্যাদি।
সবাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। ওদিকে মহিলা মাথা নাড়াচ্ছে হাঁ সূচক। আমি বললাম, এই দুধ খাওয়ানোর এবং স্যালাইন খাওয়ানো ছাড়া আর কোন কথা কি বলেছে কি কালিপদ। মহিলা এবার মুখে শব্দ করে বললো, না।
ছাত্রদের দিকে ফিরলাম আমি। দম নিয়ে বললাম, দেখুন দেখি কি অবস্হা। কালিপদ যা বলেছে, সেই একই কথা হয়তো একটু ভিন্ন শব্দে আমিও বলেছি। এটাকে আপনারা অশালীন ব্যাবহার বলবেন ? সবাই চুপ।
আমি থামলামনা। বললাম, মাত্র দুই বছর আগে আমি আপনাদের মতন ছাত্র ছিলাম। তখন ভেবেছি, চাকুরীতে গেলে সমস্ত অনিয়ম, দুর্নীতি একেবারে ঠিক করে ফেলবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
এই যে আপনারা ভাবেন চিকিৎসা ঠিকমতন দেয়না চিকিৎসক। আপনারাই বলুন, আজ তিনদিন আমি একজন মাত্র চিকিৎসক এই হাসপাতালে। রোগীর যে সংখ্যা, ঠিকভাবে সেবা দেয়া কি সম্ভব?
এই যে বললেন হাসপাতালের ওষুধ নাই, এই নাই, সেই নাই। সারাবছরের এমএসআর এবং মেইনটেইনেন্স এর বরাদ্দ তিনলক্ষ টাকা। জনপ্রতি হিসাব করুন। রোগীপ্রতি কতটাকা খরচ করা সম্ভব?
ডাক্তার পদায়ন নেই। যারা আসেন, কিছু দিন পর চলে যান। এই দুরবস্হার মধ্যে যে মানুষটা দিনরাত ২৪ ঘন্টা বিশ্রাম না নিয়ে হাসিমুখে আপনাদেরকে তার দ্বারা যতটুকু সম্ভব সেবা দেয়, তাকেই আপনারা একমুহূর্তে ভুল বুঝে তার বিরুদ্ধে শহর জুড়ে শ্লোগান দিয়ে জুতা মারতে চাইলেন, বিচার করতে চাইলেন। এখনো হয়তো আপনাদেরই কোন স্বজন তার বাসার সামনে বসে আছে চিকিৎসার আশায়। বেশীরভাগই বিনে পয়সায়। অথচ, সে যে কথাগুলোর জন্য অপমানিত হলো, সেটি ছিল তার দায়িত্ব।
বলে থামলাম আমি। কয়েক সেকেন্ড নিরবতা। তারপর একজন বললো, আমাদেরকে তো কেউ আপনার মতো এমন করে বুঝিয়ে বলেনি কখনো। যখনই সমস্যা নিয়ে আসি, একজন অন্যজনের বদনাম করে। দোষ দেয়। আমরাও তাই ভেবে চলে যাই।
আমরা দুঃখিত। আপনি যতদিন এখানে থাকবেন, আমরা কোন সমস্যা হলে আগে আপনার কাছে শুনবো, তারপর আপনি যেভাবে বলেন, সেটাই করবো।
বললাম, তাহলে কালিপদ বাবুকে এখানে থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য সিভিলসার্জন স্যারকে জানাই। সবাই সমস্বরে বলে উঠলো। স্যার, আপনি একাজ করবেননা। এটা আমাদের অনুরোধ। আমরা কালিপদ বাবুর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিবো।
আরও দুচারটে কথাবার্তার পরে সবাই চলে গেল। ততোক্ষণে নিজের প্রতি নিজেই আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠা আমি দরজার পর্দার দিকে তাকিয়ে ভাবছি, সেবা, চাকুরী, কর্মকর্তা, সাধারণ মানুষ, রোগী, সব মিলিয়ে এক জটিল জীবনের কথা।
কালিপদ বাবু আজ কোথায় কেমন আছে জানিনা। জকিগঞ্জ চলে আসার পরে আর দেকা হয়নি কখনো। এই ঘটনা তার স্মরণে আছে কিনা, তাইবা কে জানে?
আমি কিন্তু সারাজীবন মনে রেখেছি। মনে রেখেছি এজন্যে যে, জটিল পরিস্হিতি এড়িয়ে যাওয়াটা মাথায় রাখতে হবে এবং পরিস্হিতির উদ্ভব হলে কিভাবে সেটি ম্যানেজ করতে হবে।
বেঁচে থাকলে ভালো থাকবেন কালিপদ বাবু।
দেশের চেনা অচেনা সকল কালিপদ বাবু ভালো থাকুক।
মহান স্রষ্টা সকলের কল্যাণ করুন।
ডা.এসএএ শাফী স্যার এর ওয়াল থেকে