18/03/2026
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে সংস্কারের প্রশ্নটি নতুন নয়; বরং এটি বহু দশকের এক অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির গল্প। যখন একটি দেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারায় এগিয়ে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা থাকে—স্বাস্থ্যসেবাও হবে আরও সহজলভ্য, মানসম্মত এবং সর্বজনীন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নীতিনির্ধারণের শীর্ষ স্তরে যখন দিকনির্দেশনার ঘাটতি, অগ্রাধিকার নির্ধারণে দ্বিধা, এবং সংস্কারের প্রতি সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতির অভাব দেখা যায়, তখন পুরো ব্যবস্থাই এক ধরনের স্থবিরতায় আটকে যায়।
এই স্থবিরতা সবচেয়ে বেশি আঘাত করে সেইসব মানুষদের, যারা বছরের পর বছর ধরে স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন। তারা জানেন সমস্যাগুলো কোথায়—প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতা, মানবসম্পদের অদক্ষ বণ্টন, অর্থায়নের অসামঞ্জস্য, বেসরকারি খাতের অপরিকল্পিত বিস্তার, এবং সর্বোপরি জবাবদিহিতার অভাব। কিন্তু সমস্যাগুলো চিহ্নিত থাকলেও সমাধানের পথে এগোনোর জন্য যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নীতিগত সাহস প্রয়োজন, সেটিই বারবার অনুপস্থিত থেকে যায়।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর—বিশেষ করে আগস্টের ঘটনাবলির পর—একটি নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল। অনেকেই মনে করেছিলেন, এই পরিবর্তন একটি “policy window” তৈরি করবে, যেখানে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, গত সময়ে দৃশ্যমান কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন চোখে পড়েনি। বরং উচ্চপর্যায়ের পদায়ন ও সিদ্ধান্তগুলো অনেক ক্ষেত্রে সেই পুরনো ধ্যানধারণারই প্রতিফলন, যা সংস্কারের পরিবর্তে স্থিতাবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে বেশি আগ্রহী।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হচ্ছে—বাংলাদেশ কি আদৌ একটি সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা (Universal Health Coverage) ব্যবস্থার দিকে এগোতে পারবে?
উত্তরটি সরল নয়, তবে সম্পূর্ণ নেতিবাচকও নয়। কারণ, হতাশার মাঝেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা আমাদের আশাবাদী করে:
প্রথমত, দেশের ভেতরে একটি শক্তিশালী জ্ঞানভিত্তিক ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পেশাজীবী গোষ্ঠী রয়েছে, যারা সমস্যার সমাধান জানেন এবং কাজ করার জন্য প্রস্তুত।
দ্বিতীয়ত, বেসরকারি খাতের বিপুল সক্ষমতা রয়েছে, যা সঠিক নীতিমালার মাধ্যমে কাজে লাগানো গেলে দ্রুত পরিবর্তন আনা সম্ভব।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা—যেমন থাইল্যান্ড বা মালয়েশিয়ার মডেল—আমাদের জন্য বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ হিসেবে কাজ করতে পারে।
কিন্তু এই সম্ভাবনাগুলো বাস্তব রূপ নিতে হলে যে জিনিসটি সবচেয়ে জরুরি, সেটি হলো “leadership clarity”—অর্থাৎ শীর্ষ পর্যায়ে একটি স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি এবং সেই অনুযায়ী সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
আজকের বাস্তবতা হলো, স্বাস্থ্যখাতে সংস্কার আর শুধুমাত্র একটি টেকনিক্যাল ইস্যু নয়; এটি একটি রাজনৈতিক ও নৈতিক অঙ্গীকারের প্রশ্ন। যখন নেতৃত্ব এই অঙ্গীকারে দুর্বল হয়, তখন পুরো ব্যবস্থাই দিকহীন হয়ে পড়ে। আর তখনই মাঠপর্যায়ে কাজ করা মানুষেরা হতাশ হয়ে পড়েন—যা একেবারেই স্বাভাবিক।
তবে ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—সংস্কার কখনোই একদিনে আসে না, এবং এটি শুধুমাত্র সরকারের ওপর নির্ভর করে না। নীতিনির্ধারকদের পাশাপাশি পেশাজীবী, নাগরিক সমাজ, মিডিয়া এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সম্মিলিত চাপ ও প্রচেষ্টাই শেষ পর্যন্ত পরিবর্তনের পথ তৈরি করে।
সুতরাং, বর্তমান হতাশা বাস্তব হলেও এটি চূড়ান্ত নয়। বরং এটি হতে পারে একটি “critical moment”—যেখান থেকে নতুন করে চিন্তা, সমন্বয় এবং চাপ সৃষ্টি করে স্বাস্থ্যখাতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের পথ তৈরি করা সম্ভব।
শেষ কথা হলো—আমরা যারা পরিবর্তন চাই, তারা হয়তো বারবার ব্যর্থতার মুখোমুখি হবো, হতাশ হবো, কিন্তু থামবো না। কারণ একটি মানসম্মত, ন্যায়ভিত্তিক ও সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা শুধু একটি স্বপ্ন নয়—এটি এই দেশের মানুষের ন্যায্য অধিকার। এবং কোনো না কোনো সময়ে, সেই অধিকার বাস্তবতায় রূপ নেবেই।