21/09/2025
ধারণাপত্র ( Concept Note):
বাংলাদেশে মেডিকেল লাইসেন্সিং পরীক্ষা (MLE) চালু করার প্রস্তাব
রোগীর সুরক্ষা ও চিকিৎসক কর্মশক্তির মান নিশ্চিতকরণে একটি জাতীয় পদক্ষেপ::
১. সমস্যা চিত্র
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় চিকিৎসক তৈরির ক্ষেত্রে বড় একটি চ্যালেঞ্জ হলো—ডাক্তারদের মানের বৈচিত্র্য ( Quality of medical graduates remains highly variable.)।
• বিশেষ করে বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে অনেক সময় পর্যাপ্ত শিক্ষক, দক্ষ অনুষদ, ক্লিনিক্যাল সুবিধা ও রোগীর সঠিক এক্সপোজার নেই।
• একটি শক্তিশালী এক্রেডিটেশন (স্বীকৃতি) ব্যবস্থা অনুপস্থিত, ফলে মেডিকেল শিক্ষার ন্যূনতম মান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
• প্রতিবছর হাজারো গ্র্যাজুয়েট চিকিৎসক কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছে, কিন্তু তাদের ন্যূনতম যোগ্যতা বা দক্ষতার কোনো জাতীয় মানদণ্ড যাচাই হচ্ছে না।
• এর ফলে নিম্নমানের ডাক্তার রোগী সুরক্ষার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে এবং জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।
২. ডব্লিউএইচও-র (WHO) নির্দেশনা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) Health Practitioner Regulation: Design, Reform and Implementation Guidance (সেপ্টেম্বর ২০২৪) এ বলা হয়েছে—
• স্বাস্থ্যসেবায় রোগীর ক্ষতি রোধ করার জন্য ন্যূনতম যোগ্যতা ও দক্ষতার মান নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
• লাইসেন্সিং পরীক্ষা বা এন্ট্রি-টু-প্র্যাকটিস পরীক্ষা হলো একটি মূল নিয়ন্ত্রক কার্যক্রম।
• অনেক দেশে নীতিমালা ও বাস্তবায়নের মধ্যে ফাঁক রয়েছে; লাইসেন্সিং পরীক্ষা এই ফাঁক পূরণ করতে পারে।
• নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা হতে হবে ঝুঁকিভিত্তিক, স্বচ্ছ, ন্যায়সংগত এবং নিয়মিত মূল্যায়নযোগ্য।
• রোগী সুরক্ষা, মানসম্পন্ন কর্মশক্তি ও জনগণের আস্থা বজায় রাখতে এ ধরনের জাতীয় পরীক্ষা অত্যন্ত কার্যকর।
WHO-র ভাষায়:
“স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ হলো রোগী সুরক্ষার জন্য একটি অপরিহার্য কৌশল, যা নিশ্চিত করে যে শুধুমাত্র ন্যূনতম মানদণ্ড পূরণকারী চিকিৎসকরাই জনগণের কাছে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করবেন।” (WHO, ২০২৪)
৩. বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
• বেসরকারি খাতের দ্রুত সম্প্রসারণ: বর্তমানে ৭০টিরও বেশি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক ডাক্তার তৈরি হচ্ছে। মান ভিন্ন ভিন্ন।
• একাডেমিক দুর্বলতা: অনেক প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক, ল্যাব, রোগীর ক্লিনিক্যাল এক্সপোজার নেই।
• একটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের স্বীকৃত এক্রেডিটেশন নেই: WFME স্বীকৃত কোনো জাতীয় এক্রেডিটেশন বডি নেই।
• রোগী সুরক্ষার ঝুঁকি: নিম্নমানের ডাক্তার তৈরি হচ্ছে, যা স্বাস্থ্যসেবায় সরাসরি হুমকি।
৪. প্রস্তাব: মেডিকেল লাইসেন্সিং পরীক্ষা (MLE)
উদ্দেশ্য:
সব মেডিকেল গ্র্যাজুয়েটদের ন্যূনতম জ্ঞান, দক্ষতা ও পেশাগত আচরণ যাচাই করে শুধুমাত্র যোগ্যদের পূর্ণ রেজিস্ট্রেশন দেওয়া।
পরীক্ষার কাঠামো
1. প্রথম ধাপ (CBT – কম্পিউটারভিত্তিক পরীক্ষা):
o মূল বিষয়সমূহ: মেডিসিন, সার্জারি, শিশু, স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি, মনোরোগ, কমিউনিটি মেডিসিন, জরুরি চিকিৎসা, চিকিৎসা-নৈতিকতা ও আইন।
2. দ্বিতীয় ধাপ (OSCE – ক্লিনিক্যাল দক্ষতা পরীক্ষা):
o যোগাযোগ, রোগী সেবা, প্রেসক্রাইবিং, জরুরি সেবা, শারীরিক পরীক্ষা, নৈতিকতা ও পেশাদারিত্ব যাচাই।
পরিচালনা
• বাংলাদেশ লাইসেন্সিং এক্সামিনেশন বোর্ড (BLEB) গঠন করা হবে, যা বিএমডিসি-এর অধীনে থেকে স্বাধীনভাবে পরীক্ষা পরিচালনা করবে।
• বছরে দুটি সেশন (ফেব্রুয়ারি ও আগস্ট)।
• ফলাফল ও মান নির্ধারণ প্রক্রিয়া হবে স্বচ্ছ ও প্রকাশ্য।
ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন
• প্রথম বছর: নীতি অনুমোদন, ব্লুপ্রিন্ট তৈরি, প্রশ্নব্যাংক উন্নয়ন, পরীক্ষক প্রশিক্ষণ। 2026
• দ্বিতীয় বছর: স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষার্থীদের নিয়ে পাইলট পরীক্ষা। 2027
• তৃতীয় বছর: পূর্ণাঙ্গভাবে জাতীয় লাইসেন্সিং পরীক্ষা চালু। From 2028 ---------------
৫. প্রত্যাশিত সুফল( Expected Outcome)
1. রোগী সুরক্ষা: শুধুমাত্র যোগ্য ডাক্তাররা জনগণের চিকিৎসা করবেন।
2. শিক্ষার মানোন্নয়ন: দুর্বল কলেজগুলো উন্নতি করতে বাধ্য হবে।
3. আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: WFME মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্য তৈরি হবে।
4. ন্যায়সংগত প্রতিযোগিতা: সরকারি ও বেসরকারি উভয় প্রতিষ্ঠানের গ্র্যাজুয়েটদের জন্য সমান মানদণ্ড।
5. জনআস্থা: জনগণের আস্থা বাড়বে এবং চিকিৎসা সেবার মান উন্নত হবে।
৬. চ্যালেঞ্জ ও সমাধান
চ্যালেঞ্জ সমাধান
অবকাঠামোগত বৈষম্য ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন, ব্রিজ কোর্স, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ
প্রতিরোধ (কলেজ/শিক্ষার্থী) স্টেকহোল্ডার আলোচনায় অন্তর্ভুক্তি, স্বচ্ছ নীতি
পরীক্ষা পরিচালনার জটিলতা আঞ্চলিক পরীক্ষা কেন্দ্র ও OSCE হাব স্থাপন
অর্থনৈতিক বৈষম্য কম খরচ, ভর্তুকি, পরীক্ষার বিস্তৃত কেন্দ্র
রাজনৈতিক চাপ স্বাধীন বোর্ড, আইনগত সুরক্ষা, প্রকাশ্য ফলাফল
৭. উপসংহার
বাংলাদেশে নিম্নমানের চিকিৎসক উৎপাদন, বিশেষ করে বেসরকারি কলেজ থেকে, একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি। WHO-র নির্দেশনার সাথে সামঞ্জস্য রেখে একটি জাতীয় মেডিকেল লাইসেন্সিং পরীক্ষা চালু করা এখন জরুরি।
এটি শুধু একটি পরীক্ষা নয়—এটি হবে রোগী সুরক্ষা ( Patient Safety) ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের ( Quality Health care) জন্য জাতীয় অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপ।