18/11/2020
সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য এবং অসুস্থতা
নৃতত্ত্ব অধ্যয়নের মাষ্টার্স পর্বে চিকিৎসা নৃবিজ্ঞান (মেডিকেল এ্যানথ্রোপলজি) কোর্স পড়ার সময় মনুষ্য সমাজে অসুস্থতা, রোগ তথা স্বাস্থ্য ভবানার সাথে প্রথম পরিচিত হই। পরবর্তীতে সরকারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সাথে কর্মজীবন শুরু করি পাবলিক হেলথ এর একজন প্রশিক্ষক হিসেবে। গ্রামীণ বাংলাদেশের প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত দরিদ্র মানুষের মাঝে মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে সরকার কর্তৃক স্থাপিত কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যক্রম বাস্তবায়নে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং দেশের মানুষের স্বাস্থ্য ভবনা বিষয়ে সম্যক অবগত হওয়ার সুযোগ হয়। স্বাস্থ্য বিষয়ে আমার পেশাগত জীবনের বাস্তব জ্ঞানকে আরো সমৃদ্ধ করেছে পাবলিক হেলথ এ (ইপিডেমিওলজি) মাষ্টার্স ডিগ্রি। বিষয়গত জ্ঞান এবং বিগত এক যুগেরও বেশী সময় ধরে পাবলিক হেলথ এ কাজ করার সুযোগে যে অভিজ্ঞতা ও অর্ন্তদৃষ্টি লাভ করেছি তা জীবনের এ পর্যায়ে এসে লিখে যেতে চাই। যা হয়ত স্বাস্থ্য খাতে কর্মরত পেশাজীবি, স্বাস্থ্যকর্মী, অধ্যয়নরত ছাত্র, গবেষণারত গবেষকদের কিংবা উৎসাহী পাঠকের কাজে লাগতে পারে।
আমার পড়াশোনা যেহেতু নৃবিজ্ঞান এবং পাবলিক হেলথ তাই লেখার বিষয়বস্তু জৈব চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে আপাত বিবাদমান মনে হতে পারে। নৃবিজ্ঞান মূলত মনুষ্য সমাজ এবং সংস্কৃতি তথা মানুষের সংস্কৃতিজাত আচরণ ও ক্রিয়াকর্ম অধ্যয়ন করে। এরই প্রেক্ষিতে বলা যায় নৃবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি মানে সব ইভেন্টের সাথে সংস্কৃতি বা সাংস্কৃতিক ফ্যাক্টরগুলোর যোগসুত্র খুঁজে বের করা। জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে নৃবিজ্ঞান সব সময় হলিষ্টিক এপ্রোচ এ কাজ করে। এজন্য স্বাস্থ্য বিষয়ে আমার দৃষ্টিভঙ্গিও হবে সামগ্রিক। এখানে উল্লেখ্য যে সংস্কৃতিক উপাদানসমূহকে সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে প্রকাশ করা কঠিন এজন্য পরিসংখ্যান কিংবা জৈব পরিসংখ্যানের কাছে এ ফ্যাক্টরগুলো তেমন গুরুত্ব পায় না বললেই চলে।
স্বাস্থ্য বিষয়ে আমার ভাবনা অলোচনার শুরুতেই আমি দুটি প্রত্যয়কে সংজ্ঞায়িত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি। তা হলো, সংস্কৃতি এবং স্বাস্থ্য। এ দুটি বিষয়কে কোন একক সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করা সহজ নয়। ( আলাদা একটি অধ্যায়ে তা আলোচনার ইচ্ছে রইল)
আজকে আমি বিভিন্ন রোগের রোগতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে মানুষের সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদানের যে প্রভাব বা সম্পর্ক রয়েছে তা খুব সংক্ষেপে আলোচনা করব।
রোগের রোগতত্বে সাংস্কৃতিক ক্রিয়ানক (ফ্যাক্টরসমূহ)
যেকোন দেশ অঞ্চল বা সমাজে ঐ সংস্কৃতির ফ্যাক্টরগুলো অসুস্থ স্বাস্থ্যের কারণ, সহায়ক কিংবা প্রতিরোধের সাথে সর্ম্পকযুক্ত। আলোচনার এ অংশে আমি এইসকল সাংস্কৃতিক ফ্যাক্টরগুলো লিপিবদ্ধ করার চেষ্টা করব। এই তালিকা সামগ্রিক কিছু নয়, তবে রোগতত্ত্ববিদ এবং নৃতাত্ত্বিকগণ যে সকল ফ্যাক্টরগুলোকে সাধারণত বিচার বিশ্লেষণ করেন সেগুলোকেই নির্বাচন করা হয়েছে। পরবর্তীতে এ সকল ফ্যাক্টরগুলোর সাথে সর্ম্পকিত কিছু কেস হিস্ট্রি এ অধ্যায়ে যুক্ত করা হয়েছে।
১। অর্থনৈতিক অবস্থাঃ
এই বিষয়টি সমাজে সম্পদের সুষম বন্টনের সাথে সর্ম্পকিত,
-যেখানে সমাজের অন্যান্য অংশের চেয়ে কোন গ্রুপ দরিদ্র অথবা ধনী।
-খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও পুষ্টি নিশ্চিতকরণে আয় যথেষ্ট কিনা;
-সম্পদ, দারিদ্রতা, কর্মসংস্থান ও বেকারত্বের সাথে সম্পর্কিত সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ;
-সম্পদ অর্জন, ভোগ এবং বন্টনের ক্ষেত্রে কে মৌলিক অর্থনৈতিক একক (ব্যক্তি, পরিবার অথবা বৃহৎ যৌথ);
২। পরিবার কাঠামোঃ
পরিবারের কোন ধরণটি কর্তৃত্বশীল তার সাথে এ বিষয়টি সম্পর্কিত (যেমন: একক পরিবার, বর্ধিত পরিবার, যৌথ পরিবার অথবা এক সদস্য বিশিষ্ট পরিবার);
- পরিবারের সদস্যদের মধ্যে মিথস্ক্রিয়ার , একত্রে থাকার প্রবণতা এবং পারস্পারিক সহযোগিতার মাত্রা;
- ব্যক্তিক অর্জনের চেয়ে পরিবারিক স্বার্থকে গুরুত্ব দেয় কিনা; এবং
- পরিবারের সদস্যগণ সন্তান লালন পালন, বয়স্কদের খাবার প্রদান ও যত্ন, অসুস্থতা এবং মূত্যু শোকের মতো বিষয়কে ভাগ করে নেয় কি না।
৩। লৈঙ্গিক ভূমিকাঃ
এই বিষয়টি বিভিন্ন লিঙ্গের মধ্যে শ্রম বিভাজনের সাথে সম্পর্কিত, বিশেষতঃ কে কাজ করে, কে ঘরে থাকে, কে খাবার তৈরি করে এবং কে শিশুর যত্ন করে।
-এই দুটি (কোন ক্ষেত্রে ৩ টি)লৈঙ্গিক ভূমিকার সাথে সম্পর্কিত সামাজিক অধিকার, দায়-দায়িত্ব এবং প্রত্যাশা;
-প্রত্যেক লিঙ্গের যথাযথ আচরণের সাংস্কৃতিজাত বিশ্বাস (যেমনঃ পুরুষের ক্ষেত্রে মদ্যপান, ধূমপান এবং প্রতিযোগিতা মূলক আচরণ স্বাভাবিক মনে করা হলেও, নারীদের ক্ষেত্রে নয়);
-প্রত্যেক লিঙ্গের ডাক্তার দেখানোর শারীরিক অথবা মনো সীমা বা প্রবেশযোগ্যতা; এবং
-নারীর জীবন চক্র নিয়ে “মেডিকেলাইজেশন” এর মাত্রা।
৪। বিবাহের ধরণসমূহঃ
এ বিষয়ের অর্ন্তভুক্ত হচ্ছে সমাজে একক বিবাহ, বহু বিবাহ নাকি বহুস্বামী বিবাহ কোনটি প্রচলিত।
-মৃত স্বামীর ভাইকে বিবাহ (লেভিরেট) কিংবা মৃত স্ত্রীর বোনকে বিবাহের (সরোরেট) চর্চা আছে কিনা এবং অন্তঃগোত্র বিবাহ (যেখানে কেউ নিজ গোত্র, বংশ, সামাজিক বা ধর্মীয় দল, পরিবার, নিকট রক্তসম্পর্কের আত্মীয়ের মধ্যে বিবাহ করে) অথবা বহিঃগোত্র বিবাহ (যেখানে কাউকে অবশ্যই তার নিজ গোত্র, বংশ কিংবা নিকট আত্মীয়ের বাইরে বিবাহ করতে হয়);
-অন্তঃগোত্র বিবাহের ক্ষেত্রে প্রছন্ন বৈশিষ্ট সম্পন্ন জীন পরবর্তী প্রজম্নে ছড়িয়ে পড়ে। কিছু বংশগত রোগ যেমন, হিমোফিলিয়া, থ্যালাসেমিয়া মেজর, সিসটিক ফিব্রোসিস এবং জেনেটিক ডিসঅর্ডার (চে সাকস্) ইত্যাদির হার অনেক বেড়ে যায়।
৫। যৌন আচরণঃ
এই বিষয়ের সাথে যুক্ত আছে সমাজে অবাধ যৌনাচার, বিবাহপূর্ব কিংবা বিবাহ বর্হিভূত যৌন সর্ম্পক চর্চার প্রচলন অথবা নিষেধাজ্ঞা আছে কিনা।
- এ সমস্ত যৌন মূল্যবোধগুলো পুরুষ, নারী অথবা উভয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কিনা;
- সমাজের মধ্যে বিশেষ কিছু গ্রুপের মধ্যে (নান/যাজিকা অথবা যৌনকর্মী) বিশেষ কোন যৌন মূল্যবোধ (যৌন কর্ম হতে বিরত থাকা অথবা বাছবিচারহীন যৌনাচার) প্রযোজ্য কিনা;
- সমাজে টাকার বিনিময়ে যৌনকর্ম (পতিতাবৃত্তি) গ্রহণযোগ্য অথবা গ্রহণযোগ্য নয়;
- পুরুষ কিংবা নারীদের সমকামীতা মেনে নেওয়া হয় নাকি নিষিদ্ধ;
- নির্দিষ্ট কোন যৌন চর্চা ( যেমন: পায়ু পথে সঙ্গম) গ্রহণযোগ্য অথবা নয়;
- বাচ্চা জন্মের ছয় মাস পর পর্যন্ত, বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানো অবস্থায়, মাসিক র্্তুচক্র চলার সময় কিংবা গর্ভাবস্থায় যৌনমিলনের উপর কোন ধরণের ট্যাবু আরোপিত আছে কিনা।
৬। জন্মনিয়ন্ত্রণের ধরণসমূহঃ
কোন সমাজে জন্মনিয়ন্ত্রন এবং গর্ভপাতের প্রতি সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে এ বিষটি সম্পর্কিত।
-এই দুটি বিষয়ের উপর আরোপিত ট্যাবুসমূহ পরিবারের আকার নির্ধারণ করে এবং কখনো কখনো মাতৃস্বাস্থ্যের উপর খুবই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
-কিছু জন্মনিয়ন্ত্র পদ্ধতি অথবা গর্ভপাত মাতৃস্বাস্থ্যের জন খুবই বিপদজনক হতে পারে।
-কনডম ব্যবহারের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির কারণে যৌনবাহিত রোগ যেমন; হেপাটাইটিস বি কিংবা এইচআইভ/এইডস ছড়িয়ে পড়তে পারে।
৭। জনসংখ্যা নীতিঃ
এই বিষয়টি পরিবারের সবচেয়ে পছন্দনীয় আকার (যেমন, চীনের একসন্তান নীতি) এবং শিশুর লিঙ্গ সম্পর্কিত সাংস্কৃতিক বিশ্বাসের সাথে যুক্ত।
-ভ্রুণ/নবজাতক হত্যা এবং অবৈধ কিংবা স্বেচ্ছায় গর্ভপাত এই বিশ্বাসের সাথে সম্পর্কিত;
ব্রাজিলে টেনেটেহারা ইন্ডিয়ানরা এই বিশ্বাস করে যে, একজন নারীর তিনটির বেশী সন্তান থাকা ঠিক নয় এবং সেই সন্তানগুলো কখনই একই লিঙ্গের হবে না। যদি কোন মহিলার দুটি কন্যা সন্তান থাকে এবং পরবর্তীতে আবারও কন্যা সন্তান হয় তাহলে তাকে হত্যা করা হয়। সুদীর্ঘ সময় ধরে এই ধরণের বিশ্বাস ঐ কমিউনিটির আকার ও গঠনের উপর প্রভাব বিস্তার করছে।
৮। গর্ভকালীন এবং সন্তান জন্মদানের চর্চাসমূহঃ
এই বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত বিষয় হচ্ছে গর্ভকালীন সময়ে খাদ্য, পরিধেয় এবং আচরণগত পরিবর্তনসমূহ; সন্তান জন্মদানে ব্যবহৃত কৌশলসমূহ এবং সন্তান জন্মদানে সহযতাকারী ধাত্রীর প্রকৃতি; প্রসবকালীন সময়ে মায়ের আসন/অবস্থান; নাড়ী কাটার ব্যবস্থা/পরিচর্যা (কোন কোন সংস্কৃতিতে নাড়ী শুকানোর জন্য গোবর ব্যবহার করা হয় এজন্য নবজাতকের ধনুস্ট্রংকার এর ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়); সন্তান জন্মদানের ছয়মাস পর্যন্ত কিছু আচার প্রথা মেনে চলা যেমন নবজাতকসহ মাকে আলাদা রাখা অথবা বিশেষ কোন ট্যাবু; শিশুর জন্য মায়ের দুধ কিংবা কৃত্রিম খাবার (যেমন গুড়ো দুধ) কোনটি পছন্দ করা হয়।
৯। সন্তান লালন পালনের চর্চাসমূহঃ
এই বিষয়টি সন্তান লালন পালনের আবেগজনিত আবহের সাথে সম্পর্কিত যেখানে তা অনুমতিসূচক অথবা কর্তৃত্বপূর্ণ;
-শিশুদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক আচরণ উৎসাহিত করা হয় কি না ( যেগুলো শিশুর পরবর্তী জীবনে মানসিক অসুস্থতা, আত্মহত্যা প্রবণতা এবং ’এ’ টাইপ হৃদরোগের ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ গড়ে ওঠার জন্য দায়ী)
-সমাজ কর্তৃক শিশুর প্রতি শারীরিক ও আবেগগত অসদাচরণ স্বাভাবিক বলে গণ্য হয় কিনা;
-শিশু জন্মের পর এবং বয়ঃসন্ধিকালে কোন আচার প্রথা পালন করা হয় কিনা (যেমন, খাৎনা কিংবা অঙ্গসজ্জা)
১০। শরীরের ইমেজ পরিবর্তনঃ
এই বিষয়টি শরীরের বহুরুপীকরণ অথবা পরিবর্তনে সাংস্কৃতিক অনুমোদনের সাথে সম্পর্কিত যেমন: পুরুষ কিংবা নারীর খাৎনা, চামড়া কেটে অংকন, ট্যাটু করা, কান/নাক/ঠোঁঠ ফুটানো এবং বিভিন্ন ধরণের কসমেটিক সার্জারি (হতে পারে মুখমন্ডলের ম্যামোপ্লাস্টি অস্ত্রপোচার)। উপরন্তু, নির্দিষ্ট শারীরিক আকৃতির অনুমোদন কিংবা নিরুৎসাহিতকরণে সাংস্কৃতিক মূল্যবোধসমূহ, যেমন: মেদহীন শরীর (স্লিম), লম্বাটে অথবা স্থুলতা; বিশেষ করে মহিলাদের মাঝে।
১১। খাদ্যঃ
কিভাবে খাদ্য প্রস্তুত, মজুত এবং সংরক্ষণ করা হয় তার সাথে এই বিষয়টি সম্পর্কিত।
-খাদ্যদ্রব্য রান্না এবং মজুতের জন্য কোন ধরণের তৈজষপত্র বা বাসন ব্যবহার করা হয়;
-খাদ্যদ্রব্য নিয়মিয় দূষিত হয় কিনা (যেমন: আফলাটক্সিন বা ছত্রাকজনিত দূষণ)
- সমাজে খাদ্যদ্রব্যকে পুষ্টিমান ব্যতিরেকে প্রতীকিভাবে শ্রেণীকরণ করে কিনা (যেমন: খাদ্য এবং অখাদ্য; পরিত্র এবং অপবিত্র খাদ্য; গরম এবং ঠান্ডা খাবার ইত্যাদি)
-আমিষগ্রহণ (বিশেষ করে মাংস) অথবা নিরামিশাষী কোনটি নিয়ম;
-গর্ভাবস্থায়, মাতৃদুগ্ধ দান কালে, মাসিক চলাকালে কিংবা অসুস্থতায় বিশেষ খাবারের প্রচলন আছে কিনা;
-সমাজে খাবার নিয়ে খামখেয়ালীপনা কিংবা ফ্যাশন অতি সাধারণ কিনা; এবং
-অ-পশ্চিমা সমাজে আধুনিকায়নের নামে পশ্চিমা খাদ্যদ্রব্য (উচ্চ লবনযুক্ত, উচ্চ চর্ব্বি এবং পরিশোধিত শর্করা) প্রচলিত আছে কি না।
১২। পোষাক পরিচ্ছদঃ
এ বিষয়টির সাথে যুক্ত আছে নারী এবং পুরুষের কিংবা বিশেষ অনুষ্ঠানের জন্য কোন ধরণের পোষাক যথাপোযুক্ত সে ব্যাপারে সাংস্কৃতিক ব্যবস্থাপত্র।
- পোষাক পরিচ্ছদে ফ্যাশন বিদ্যমান আছে কিনা (যেমন: আঁট-সাটো কিংবা ঢিলেঢালা পোষাক; হাইহিল কিংবা সমতল পাটাতনের জুতা)—যেগুলো নির্দিষ্ট কোন রোগ কিংবা আঘাত-দূর্ঘটনার কারণ হতে পারে এবং শরীরের অলংকরণ যেমন: প্রসাধনী, গহনা, সুগন্ধি কিংবা চুল রং করা বিভিন্ন ধরণের চর্ম রোগের কারণ হতে পারে।
- লম্বা পোষাক যার মাধ্যমে দেহের বেশীরভাগ অংশ ঢাকা থাকে সেক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু রোগপ্রবণতা দেখা দিতে পারে; উদাহরণ সরূপ, ইয়েমেনের নারীরা একধরণের লম্বা পোষাক এবং নেকাব পরিধান করে এবং ‘হেরেম’ এর মধ্যে আবদ্ধ জীবন যাপন করে তাদের মধ্যে অস্ট্রিওম্যালাসিয়া, যক্ষা এবং রক্তশূণ্যতা ইত্যাদির হার বেশী। যুক্তরাজ্যে এশীয় নারীদের মধ্যে সূর্যালোকের স্বল্পতার সাথে নিরামিশাষী খাদ্যাভাস, গৃহে আবদ্ধতা এবং দেহের বেশীরভাগ অংশ আবৃত পোষাক ব্যবহারের কারণে অস্ট্রিওম্যালাসিয়া’র হার বেশী।
১৩। ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতাঃ
এই বিষয়ের সাথে যুক্ত আছে সমাজে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা অবহেলিত নাকি আগ্রহের
-কখন কিংবা নিয়মিত (প্রায়শই) চুল, দাড়ি ধোঁয়া বা কাঁটা হয় কিনা;
-কত বিরতিতে পোশাক পরিচ্ছদ বদল/পরিবর্তন করা হয়;
-নিয়মিত বিরতিতে বিভিন্ন ধৌতকরণ এবং বিশুদ্ধকরনের আচার পালন করা হয় কিনা;
-গোসল করার ব্যবস্থা কি ব্যক্তিগত না গণ।
১৪। বাসস্থানের ধরণঃ
বাসস্থানের নির্মাণ, বসা/শোবার ব্যবস্থা এবং ভিতরের ভাগসমূহ এই বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত।
-এই বাসস্থানে একই পরিবার/গোত্রভুক্ত সদস্যরা ব্যবহার করে কিনা;
-প্রতি কক্ষ, বাড়ী অথবা কুঁড়েতে কতজন বসবাস করে (এই বিষয়টি সংক্রামক রোগ বিস্তারকে প্রভাবিত করে; এবং
-বছরের বিভিন্ন র্্তুতে বাসস্থানকে কিভাবে গরম কিংবা ঠান্ডা রাখা হয়।
১৫। পয়ঃনিস্কাশনের ধরণঃ
মনুষ্য সৃষ্ট বর্জ্য অপসারণের প্রকরণ এই বিষয়ের সাথে যুক্ত।
-কে/কারা বর্জ্য অপসারণ করে;
-তারা কি নিয়মিত ভাবে অপসারিত বর্জ্য মাটি চাপা/প্রক্রিয়াজাত করে কিংবা করে না;
-এই বর্জ্য কি বসতবাড়ী, খাদ্য উৎপাদন স্থলের কাছে , গোসল করার জায়গায় অথবা পানির উৎসের কাছে অপসারণ করা হয় কিনা।
১৬। পেশাসমূহঃ
এই বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত আছে সমাজে নারী এবং পুরুষ সাদৃশ্যপূর্ণ পেশা অথবা বৈসাদৃশ্যপূর্ণ পেশায় যুক্ত কিনা।
-সমাজে কোন নিদষ্টি পেশাসমূহ বিশেষ কোন ব্যক্তি, পরিবার বা দলের জন্য সংরক্ষিত থাকে কিনা (যেমন ভারতে ঐতিহ্যগত বর্ণ প্রথা অথবা সাবেক দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ);
-কিছু সমাজে কোন নির্দিষ্ট পেশা উচ্চ সম্মানিত এবং উচ্চ সম্মানী বিশিষ্ট কিনা (যেমন: পশ্চিমা সমাজে ’এ’ টাইপ নির্বাহী)
-জীবিকার তাগিদে কিছু কৌশলের ব্যবহার যেমন; ঐহিত্যগত পদ্ধতিতে শিকার, মৎস আহরণ, কৃষিকাজ অথবা খনিজ আহরণ যে কাজগুলো আঘাত-দূর্ঘটনা জনিত মৃত্যু, ট্রমা অথবা সংক্রামক রোগ বিস্তারের সাথে সম্পর্কিত, অথবা
-কিছু আধুনিক শিল্প কারখানার পেশাসমূহ যেগুলো কিছু নির্দিষ্ট রোগের সাথে সম্পর্কিত (যেমন; কয়লা খনি শ্রমিকদের মধ্যে নিউমোকোনিওসিস, রং শ্রসিকদের মধ্যে ব্লাডার ক্যান্সার, ধাতু শ্রমিকদের মধ্যে সিলিকোসিস অথবা এ্যসবেসটস শ্রমিকদের মধ্যে মেসোথেলিওমাস ইত্যাদি)
১৭। ধর্মঃ
এর সাথে যুক্ত বিষয় হচ্ছে কোন একটি ধর্ম আসঞ্জনশীল, সাত্বনাদায়ক বিশ্বদৃষ্টি দ্বারা বৈশিষ্টমন্ডিত কিনা।
-এই ধর্মগুলোর ধর্মীয় চর্চা আবশ্যক কিনা যেমন ; উপবাস/রোযা, খাবারের উপর বিভিন্ন ধরণের ট্যাবু, বিসর্জন প্রথা, সম্প্রদায়ভিত্তিক ভোজ, খাৎনা, নিজেকে আঘাত/রক্তাত্ত করা, আতশবাজী, আগুনের উপর দিয়ে হাটা, অথবা গণ তীর্থযাত্রা (ধর্মীয় উদ্দেশ্যে কোথাও গমণ), প্রতিটি বিষয়ই রোগাক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকির সাথে সম্পর্কিত।
১৮। মৃহদেহ সৎকারের রীতিঃ
এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বআরোপ করে কিভাবে, কখন এবং কার দ্বারা মৃতদেহের সৎকার করা হয়।
-মৃতদেহ তাড়াতাড়ি কবর দেওয়া অথবা দাহ করা হয় নাকি মানুষকে দেখানোর জন্য কিছৃ সময় প্রদর্শন করা হয় (যেটি সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়তে সহযোগিতা করতে পারে); এবং
-মৃতদেহ প্রদর্শন, কবর দেওয়া অথবা পোড়ানোর স্থানটি কোথায় এবং এগুলো বসতবাড়ী, খাবার কিংবা পানি সরবরাহের কাছে কিনা।
১৯। সংস্কৃতিজাত বিষন্নতাঃ
কোন সংস্কৃতি‘র মূল্যবোধ, লক্ষ্য, সম্মানের উচ্চক্রম,আদর্শ, ট্যাবুসমূহ, এবং প্রত্যাশাসমূহ সংস্কৃতিজাত বিষন্নতা এবং নসিবো প্রভাব হলো উদ্ভব অথবা প্রকোপ, অথবা স্থায়ীশীল হয়
-সংস্কৃতি কোন বিষয়কে উৎসাহ দেয়, কঠোর কর্মময়তা নাকি দৈনন্দিন জীবনের প্রতি অধিক ভাবলেশহীনতা/আরামপ্রিয়তা; এবং
-একটি প্রজন্ম এবং তার পরবর্তী প্রজন্মের সাথে সামাজিক প্রত্যাশাগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব আছে কিনা।
২০। অভিবাসী অবস্থঃ
এ বিষয়ের সাথে যুক্ত আছে যে অভিবাসন কেমন করে ঘটেছিল, স্বেচ্ছায় (পুল ফ্যাক্টর) নাকি জোড়পূর্বক (পুশ ফ্যাক্টর) যেমন; শরণার্থী অবস্থা।
-অভিবাসীরা আচরণ, ভাষা, এবং পোষাক পরিচ্ছদের দিক দিয়ে নতুন সংস্কৃতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছে কিনা;
-বাস্তভিটা থেকে উচ্ছেদকৃত এসকল মানুষজন আশ্রয়গ্রহণকারী দেশ/অঞ্চলের স্থানীয়দের দ্বারা কোন হয়রানি, বর্ণবাদী আচরণ এবং শোষণ বঞ্চনার শিকার হচ্ছে কিনা;
-অভিবাসনের পর তাদের পারিবারিক কাঠামো এবং ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি অবিকৃত থাকে কিনা; এবং
-অভিবাসীদের প্রতি আশ্রয় দানকারী দেশ/অঞ্চলের স্থানীয় সংস্কৃতি ও দৃষ্টিভঙ্গি কেমন।
২১। র্্তুভিত্তিক ভ্রমণঃ
এর সাথে যুক্ত আছে নিয়মিত, মৌসুমভিত্তিক বৃহৎ অভিবাসনের ধরণসমূহ, যারা ভ্রমনকারী পর্যটক, তীর্থ/ধর্মীয় যাত্রা (যেমন; হজ্ব), যাযাবর সমাজের মানুষ অথবা প্রবাসী শ্রমিক (স্থানীয় ভাবে অভিবাসী শ্রমিকসহ);
-যেখানে যাযাবরগণ সাধারণত সম্প্রদায়ভিত্তিক অভিবাসন করে, পর্যটক কিংবা অভিবাসী শ্রমিকগণ প্রায়শই একক ভাবে অথবা ছোট সামাজিক দলে ভ্রমণ করে থাকে;
-উভয় ক্ষেত্রেই নিজের পরিবার, সমাজ অথবা বাড়ী থেকে দূরে থাকার কারণে অ্যালকোহল বা নেশাদ্রব্য গ্রহণ প্রবণতা, এবং/অথবা যৌনবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে (যেমন; এইচআইভি/এইডস অথবা হেপাটাইটিস বি)
২২। ’রাসায়নিক উপশমকারীর’ ব্যবহারঃ
এই বিষয়টিতে বিশেষভাবে যুক্ত আছে ধুমপান, মদ্যপান, চা-কফি পান, নস্যি/গুল, ব্যবস্থাপত্রে উল্লেখিত অথবা বাইরে ঔষধ এবং মস্তিকে হ্যালুশিয়েসন এবং মোহগ্রস্থতা সৃষ্টিকারী মাদকদ্রব্যের সাথে সম্পর্কযুক্ত সাংস্কৃতিক মূল্যবোধসমূহ।
-শিরায় মাদক গ্রহণের মাধ্যমে মাদক ব্যবহারকারী ব্যক্তিদের উপসংস্কৃতি (সাব-কালচার) তৈরি এবং এই দলের নেশাদ্রব্য, সুই-সিরিঞ্জ ভাগাভাগিতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে (বিশেষ করে হেপাটাইটিস বি এবং এইচআইভি/এইডস)।
২৩। অবসর যাপনঃ
এর সাথে যুক্ত আছে বিভিন্ন ধরণের খেলাধুলা, বিনোদন এবং পর্যটন।
-এই বিষয়গুলি শারীরিক ব্যায়াম এর সাথে সম্পর্কযুক্ত অথবা নয়;
-এই বিষয়গুলো কি প্রতিযোগিতামূলক অথবা নয়; এবং
- এই বিষয়গুলি আঘাত-দূর্ঘটনা অথবা কোন রোগের সাথে সম্পর্কিত কিনা।
২৪। গৃহপালিত পশু পাখিঃ
এর সাথে যুক্ত হচ্ছে গৃহপালিত পশুসম্পদ এবং পোষা প্রাণীর ধরণ ও সংখ্যা।
-এসব পশুপাখিকে বাসার মধ্যে নাকি বাইরে নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা হয়, এবং
-এসব প্রাণীর সাথে কোন ব্যক্তি সরাসরি শারীরিক সংস্পর্শে আসে কিনা;
-বিভিন্ন ভাইরাস জনিত সংক্রমণ এসব গৃহপালিত প্রাণীর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার সম্পর্ক আছে; যেমন: লিম্ফোরেটিকোলোসিস ( বিড়াল আঁচড় জ্বর) এবং সিটাকোসিস (তোতা জ্বর) এবং বিভিন্ন প্রোটোজোয়া ঘটিত রোগ যেমন; টক্সোপ্লাজমোসিস, যা বিড়ালের মলমূত্রের মাধ্যমে ছড়ায়।
২৫। স্ব চিকিৎসা কৌশল এবং লে থেরাপীসমূহ (স্বতন্ত্র অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে)