30/12/2025
কোমরের ব্যথা কেবল একটি শারীরিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি ক্রমবর্ধমান জনস্বাস্থ্য সংকট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর মতে, বিশ্বজুড়ে বিকলাঙ্গতা বা অক্ষমতার শীর্ষ কারণ হলো এই কোমর ব্যথা। একজন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক এবং গবেষক হিসেবে কোমর ব্যথার চিকিৎসা সম্পর্কে আমার লেখনীর মাধ্যমে কয়েক পর্বে বিশদভাবে আপনাদের কাছে তুলে ধরবো। আমি মূলত বিশ্বের বিভিন্ন নামকরা সংস্থা এবং জার্নালে প্রকাশিত আধুনিক এবং বিজ্ঞানসম্মত গাইডলাইন গুলোর সারসংক্ষেপ আপনাদের কাছে তুলে ধরবো।
এই ধারাবাহিক সিরিজের প্রথম পর্বে আমি ব্রিটেনের NICE (National Institute for Health and Care Excellence) গাইডলাইন অনুযায়ী ১৬ বছরের বেশি বয়সীদের কোমরের ব্যথা (Low Back Pain) এবং সায়াটিকা (Sciatica) ব্যবস্থাপনার প্রধান দিকগুলো আলোচনা করবো।
যদি গাইডলাইনটি বিস্তারিতভাবে পড়তে চান তাহলে নিম্নোক্ত লিংকে গিয়ে পড়তে পারবেন (https://www.nice.org.uk/guidance/ng59)
1. প্রাথমিক মূল্যায়ন ও সতর্কতা
ব্যথা শুরু হলে প্রথমেই রোগীদের জানা উচিত এটি কোনো গুরুতর রোগের লক্ষণ কি না। নিচের লক্ষণগুলো থাকলে দেরি না করে সরাসরি বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে:
• পায়ে হঠাৎ চরম দুর্বলতা বা অবশ ভাব।
• প্রস্রাব বা পায়খানার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা।
• প্রচণ্ড ব্যথার সাথে জ্বর বা ওজন কমে যাওয়া।
• আঘাত বা এক্সিডেন্টের পর তীব্র ব্যথা।
2. ঔষধ ছাড়া চিকিৎসা
আধুনিক গাইডলাইন অনুযায়ী, ওষুধের চেয়ে জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং থেরাপিউটিক এক্সারসাইজ কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
• সক্রিয় থাকা: এখনো অনেকেই মনে করি কোমর ব্যথা হলেই সকল ধরনের কার্যকলাপ বন্ধ করে দিয়ে বিছানায় শুয়ে থাকতে হবে। বিছানায় শুয়ে সম্পূর্ণ বিশ্রাম নেওয়ার দিন এখন শেষ। আধুনিক গাইডলাইন বলছে, ব্যথার মধ্যেও হালকা চলাফেরা করা দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করে।
• থেরাপিউটিক এক্সারসাইজ: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী স্ট্রেচিং, কোর শক্তিশালী করার ব্যায়াম, যোগব্যায়াম বা তাই-চি (Tai Chi) অত্যন্ত কার্যকর।
• ফিজিওথেরাপি: ম্যানুয়াল থেরাপি বা বিশেষজ্ঞের অধীনে ব্যায়াম অনেক ক্ষেত্রে ওষুধের চেয়ে ভালো কাজ করে।
• মানসিক স্বাস্থ্য: দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার ক্ষেত্রে 'কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি' (CBT) বা কাউন্সিলিং করার পরামর্শ দেওয়া হয়, কারণ দীর্ঘদিনের ব্যথা অনেক সময় বিষণ্ণতা তৈরি করে।
3. ওষুধের ব্যবহার
যদি ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে ব্যথা নিয়ন্ত্রণ না হয়, তবে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করা হয়:
• ঔষধ ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রথম পছন্দ হতে পারে ওরাল NSAIDs (ইবুপ্রোফেন বা ন্যাপ্রোক্সেন) এর মতো ঔষধগুলো তবে সতর্ক থাকতে হবে এবং যথাসম্ভব সর্বনিম্ন কার্যকর ডোজে এবং যত কম সময়ের জন্য ব্যবহার করা যায়।
• এছাড়াও, যদি NSAIDs কাজ না করে বা কারো জন্য নিষিদ্ধ থাকে, তবে কোডিন-এর মতো দুর্বল ওপিওড দেওয়া যেতে পারে। তবে খেয়াল রাখতে হবে এটি শুধুমাত্র তীব্র (Acute) ব্যথার জন্য প্রযোজ্য।
• প্যারাসিটামল: শুধুমাত্র প্যারাসিটামল কোমরের ব্যথার জন্য এককভাবে খুব একটা কার্যকর নয়।
• NICE গাইডলাইন অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদী কোমরের ব্যথার জন্য ওপিওড, বিষণ্ণতার ঔষধ, বা মৃগীরোগের ঔষধ দেওয়ার সুপারিশ করা হয় না।
সায়াটিকা বা স্নায়ুর ব্যথার ক্ষেত্রে ২০২০ সালের আপডেট অনুযায়ী ঔষধ নির্বাচনে কিছু বড় পরিবর্তন এসেছে:
• সায়াটিকার ক্ষেত্রে NSAIDs খুব বেশি কার্যকর হওয়ার প্রমাণ সীমিত, তবে ক্ষেত্রবিশেষে স্বল্প মেয়াদে দেওয়া যেতে পারে।
• এপিডিউরাল ইনজেকশন: তীব্র ও গুরুতর সায়াটিকার ক্ষেত্রে লোকাল অ্যানেস্থেটিক এবং স্টেরয়েড ইনজেকশন (Epidural) বিবেচনা করা যেতে পারে।
• সায়াটিকার চিকিৎসার জন্য গ্যাবাপেন্টিন, প্রিগাবালিন বা অন্য কোনো খিঁচুনি নিরোধক ঔষধ এবং ওরাল স্টেরয়েড ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, কারণ এগুলোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া উপকারের চেয়ে বেশি হতে পারে।
4. যা করা উচিত নয়
• অপ্রয়োজনীয় টেস্ট: ব্যথার শুরুর ৬ সপ্তাহের মধ্যে যদি কোনো গুরুতর লক্ষণ না থাকে, তবে এক্স-রে বা MRI করার প্রয়োজন নেই বলে জানানো হয়েছে।
• বেল্ট বা ব্রেস: বেল্ট (Lumbar Braces) ব্যবহার না করাই ভালো, কারণ এটি কোমরের মাংসপেশিকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে।
• ট্রাকশন (Traction): আধুনিক গবেষণায় কোমরে টান দেওয়ার (Traction) কার্যকারিতা খুব একটা পাওয়া যায়নি।
5. জীবনযাত্রায় পরিবর্তন
• বসার ভঙ্গি: দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় বসে না থেকে প্রতি ৩০-৪০ মিনিট পর পর ৫ মিনিট হাঁটুন।
• ভারী বস্তু তোলা: নিচ থেকে কিছু তোলার সময় কোমর না ঝুঁকিয়ে হাঁটু ভাঁজ করে তুলুন।
• ওজন নিয়ন্ত্রণ: শরীরের অতিরিক্ত ওজন মেরুদণ্ডের ওপর চাপ বাড়ায়, তাই ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
ডাঃ সোহেল আহমেদ, পিটি
স্পোর্টস ফিজিওথেরাপিস্ট
বিপিটি, এমপিটি ( স্পোর্টস), এমডিএমআর
স্পোর্টস ফিজিওথেরাপিস্ট, বুয়েট মেডিকেল সেন্টার
কনসালটেন্ট এন্ড ফাউন্ডার, আহমেদ ফিজিওথেরাপি এন্ড রিসার্চ সেন্টার
সিরিয়াল নিতে কল করুন: 01673-474560