14/03/2025
সারা বিশ্বেই ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতা এক ভয়াবহ ব্যাধি বলে স্বীকৃত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পৃথিবীতে বর্তমানে প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন লোক বিষণ্নতা ব্যাধিতে ভুগছে, যা তাদেরকে অক্ষমতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বাংলাদেশেও দিন দিন বিষণ্নতায় ভোগা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। দুঃখজনক হলো, বিষণ্নতা যে একটি রোগ সেটা অনেকে বোঝে না বা বুঝলেও তা স্বীকার করতে চায় না।
ডিপ্রেশন যে কি ভয়াবহ মানসিক ব্যাধি, যারা এ রোগে ভুগছেন তারাই বোঝেন তারা কোনো কাজ করতে পারেন না, কোনো কিছুতে উৎসাহ পান না, ঠিকমতো কারও সঙ্গে কথা বলেন না, সারা দিন কান্নাকাটি করেন। ভয়াবহ অবস্থা! প্রথমে কেউ বুঝতে পারেন না। দিন দিন অবস্থা আরও খারাপের দিকে নিয়ে যায়। শুধু বিষণ্নতা রোগের কারণে তার নিজের তো বটেই, তার সন্তানদের জীবন পর্যন্ত বিপর্যস্ত হয়।
ডিপ্রেশন খুবই কমন কিন্তু মারাত্মক এক ধরনের মানসিক ব্যাধি, যা আপনার অনুভূতি, চিন্তাচেতনা ও কাজকর্মের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আমরা অনেক সময় দুঃখবোধ (Sadness) ও বিষণ্নতাকে (Depression) এক বলে মনে করি। এ দুটি কিন্তু এক নয়। দুঃখবোধ হলো সাময়িক মন খারাপ; যা অল্প কিছু সময় পরই ঠিক হয়ে যায়। এর জন্য কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। অন্যদিকে, ডিপ্রেশন দীর্ঘকালীন সমস্যা। যা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য উপযুক্ত চিকিৎসার ও পরামর্শের প্রয়োজন হয়।
* ডিপ্রেশন কেন হয়
ডিপ্রেশন একটি জটিল রোগ। কেন এ রোগ হয় নির্দিষ্ট করে কারও পক্ষেই বলা সম্ভব নয়। তবে অনেকের ক্ষেত্রেই কিছু কমন কারণ থাকে, যার জন্য এ রোগের উৎপত্তি হতে পারে।
▶ অপমানবোধ
মানসিক বা শারীরিকভাবে অবমাননার স্বীকার হলে অনেকে ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতায় আক্রান্ত হয়।
▶ নিরাপত্তাহীনতা বা একাকিত্ব
সামাজিক ও পারিবারিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেকে বিষণ্নতার স্বীকার হয়। তা ছাড়া, বাবা-মা, বন্ধুবান্ধব বা অন্য কাছের মানুষদের সঙ্গে সম্পর্কহীনতা বা মতবিরোধ থেকেও অনেকে বিষণ্নতায় ভুগে থাকেন।
▶ মৃত্যুশোক
কাছের মানুষের মৃত্যু অনেকের ক্ষেত্রে বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়ায়।
▶ বংশগত প্রভাব
পরিবারে কারও ডিপ্রেশন থাকলে তা অন্যদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
▶ জীবন পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন
জীবনে বড় কোনো পরিবর্তন ঘটলে তা থেকে অনেকে বিষণ্নতায় ভোগে। চাকরি হারালে, অবসরে গেলে, আয় কমে গেলে, জায়গা পরিবর্তন করলে, বিবাহবিচ্ছেদ ঘটলে, এমনকি নতুন বিয়ে করলেও অনেকে ডিপ্রেশনের স্বীকার হয়।
▶ বড় কোনো রোগের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
বড় ধরনের কোনো রোগ থাকলে রোগী ডিপ্রেশনের স্বীকার হতে পারে।
▶ ওষুধের প্রভাব
নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ সেবনের ফলেও কেউ কেউ বিষণ্নতায় আক্রান্ত হয়। যেমন, ব্রণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত আইসোট্রেটিনিয়ন বা অ্যান্টিভাইরাল ‘ইন্টারফেরন-আলফা’ জাতীয় ওষুধ সেবনেও অনেকে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হয়।
এ ছাড়াও আরও বিভিন্ন কারণে মানুষ বিষণ্নতায় ভুগে থাকে। ব্যক্তিভেদে বিষণ্নতার কারণে পার্থক্য দেখা যায়।
* কীভাবে বুঝবেন আপনি বিষণ্নতায় ভুগছেন
▶ কাজের প্রতি অনীহা
শখের কাজগুলোতে আপনি ধীরে ধীরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে শুরু করেছেন। কোনো কাজেই উৎসাহ পাচ্ছেন না। সারা দিন শুয়ে-বসে থাকাকেই মনে হবে সবচেয়ে সহজ কাজ এবং এর বাইরে সব কাজকেই বোঝা মনে হবে। একসময় যে কাজে খুব আনন্দ পেতেন ডিপ্রেশড হয়ে যাওয়ার পর সে কাজে কোনো আগ্রহই খুঁজে পাবেন না।
▶ খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন
ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হলে রেগুলার খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন দেখা দেবে। হয় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি খাবেন আর নয়তো খাবারে অরুচি দেখা দেবে। ফলে আপনার ওজন দ্রুত বাড়বে বা কমতে থাকবে, যা শরীরে বিভিন্ন জটিলতার সৃষ্টি করবে।
▶ দীর্ঘকালীন অনিদ্রা
দীর্ঘসময় ধরে অনিদ্রা বিষণ্নতার একটি লক্ষণ। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে যারা বিষণ্নতায় ভুগছেন তাদের আশি ভাগেরই অনিদ্রার সমস্যা রয়েছে। যেসব রোগীর দীর্ঘকালীন অনিদ্রাজনিত সমস্যা রয়েছে তাদের বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার আশংকা, যাদের এ সমস্যা নেই তাদের চেয়ে তিন গুণ বেশি। অনেক চিকিৎসকরা বিশ্বাস করেন, অনিদ্রা রোগের যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে বিষণ্নতা রোগের তীব্রতা প্রশমন করা সম্ভব। যদি কারও দীর্ঘকালীন অনিদ্রজনিত সমস্যা থেকে থাকে, তবে হয়তোবা তিনি বিষণ্নতা রোগে ভুগছেন।
▶ অবসাদ
বিষণ্নতায় আক্রান্ত হলে অবসাদ আপনাকে গ্রাস করবে। তাই যখন দেখবেন আপনি অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন, কোনো কিছুতেই উৎসাহ পাচ্ছেন না, তখন বুঝবেন আপনি একজন ডিপ্রেশনের রোগী।
▶ নিজের মধ্যে গুটিয়ে যাওয়া
বিষণ্নতার কারণে আপনি নিজেকে নিজের মধ্যে গুটিয়ে ফেলতে থাকবেন। পরিবার ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গ ভালো লাগবে না। সামাজিকতা অনেক সময় অসহনীয় হয়ে দেখা দেবে। একাকিত্ব ঘিরে ফেলবে আপনাকে, যা আপনার অসুস্থতা আরও বাড়িয়ে তুলবে।
▶ সবকিছুতেই মনোযোগের অভাব
বিষণ্নতার ফলে আপনি একটা ঘোরের মধ্যে ঢুকে যেতে থাকবেন। কোনো কিছুতেই ঠিকভাবে মনোনিবেশ করতে পারবেন না। অন্যদের কথা মন দিয়ে শুনতে পারবেন না বা কোনো আলেচনায় অংশ নিতে পারবেন না।
▶ সব বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব
দুঃখবোধ, আশাহীনতা ও হতাশা আপনাকে ঘিরে ফেলবে। সবকিছুতেই নেতিবাচক মনোভাব দেখা দিতে থাকবে।