25/01/2026
৮২ লাখ মানুষ মাদক ব্যবহারকারী: জাতীয় গবেষণা প্রতিবেদন
মাদক সমস্যা মোকাবিলায় সমন্বিত জনস্বাস্থ্যভিত্তিক উদ্যোগের আহ্বান
মাদক নির্মূলে পরিবার থেকেই হোক প্রতিরোধ
বাংলাদেশে মাদক অপব্যবহার একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকটে রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি (বিএমইউ) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রকাশিত জাতীয় পর্যায়ের গবেষণায় জানানো হয়েছে, দেশে বর্তমানে আনুমানিক ৮১ লাখ ৯৪ হাজার ৬৫১ জন মানুষ কোনো না কোনো ধরনের অবৈধ মাদক ব্যবহার করছে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৮৮ শতাংশ। এই গবেষণায় সিগারেট সেবনকে মাদক ব্যবহারের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
আজ ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, রবিবার, বিএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের কনফারেন্স হল (রুম ৫০৪)-এ আয়োজিত “Dissemination Meeting of Estimation of the Number and Category of Persons Abusing Drugs and Associated Factors: A Nationwide Study in Bangladesh” শীর্ষক অনুষ্ঠানে গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএমইউর মাননীয় ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মোঃ শাহিনুল আলম। বিশেষ অতিথি ছিলেন মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জনাব মোঃ হাসান মারুফ। অনুষ্ঠানে প্রধান গবেষক (Principal Investigator) হিসেবে বক্তব্য দেন বিএমইউর সম্মানিত ডীন অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী।
বক্তব্যে অতিথিবৃন্দ
ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মোঃ শাহিনুল আলম বলেন, মাদক প্রতিরোধে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও ধারাবাহিক গবেষণা অত্যন্ত জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন, “এটি ভাবার কোনো সুযোগ নেই যে মাদক সমস্যা কেবল কিছু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে আমরা সবাই, এমনকি আমাদের সন্তানরাও মাদকাসক্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। সম্মিলিত সচেতনতা ও ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগই এই ঝুঁকি মোকাবিলার একমাত্র পথ।”
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জনাব মোঃ হাসান মারুফ বলেন, মাদক সমস্যা এখন একটি সামাজিক যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। পরিবার থেকেই মাদক প্রতিরোধ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি জানান, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সরকার ঢাকা বিভাগের বাইরে আরও ৭টি বিভাগে ২০০ শয্যা বিশিষ্ট ৭টি মাদকাসক্ত নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপনের প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে।
বিএমইউর সম্মানিত কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার মাদক সরবরাহ ও চাহিদা উভয় দিক কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, শিশু ও তরুণ সমাজকে মাদক সেবনের ভয়াবহ পরিণতি থেকে রক্ষা করা এখন জাতীয় দায়িত্ব।
গবেষণার পদ্ধতি ও কাভারেজ
গবেষণাটি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (DNC)-এর তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি (BMU) ও রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্টস লিমিটেড (RMCL) যৌথভাবে পরিচালনা করে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন সময়কালে Network Scale-Up Method (NSUM) ব্যবহার করে দেশের ৮টি বিভাগের ১৩টি জেলা ও ২৬টি উপজেলায় তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
বিভাগভিত্তিক চিত্র
গবেষণায় দেখা যায়, বিভাগভেদে মাদক ব্যবহারের হারে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।
সর্বোচ্চ হার: ময়মনসিংহ (৬.০২%), রংপুর (৬.০০%), চট্টগ্রাম (৫.৫০%)
তুলনামূলক কম হার: রাজশাহী (২.৭২%), খুলনা (৪.০৮%)
সংখ্যার বিচারে সর্বাধিক মাদক ব্যবহারকারী বসবাস করছে ঢাকা বিভাগে (প্রায় ২২.৯ লাখ), এরপর চট্টগ্রাম (১৮.৮ লাখ) ও রংপুর (প্রায় ১০.৮ লাখ)।
মাদক প্রকারভেদ
গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক হলো গাঁজা (ক্যানাবিস)—প্রায় ৬০.৮ লাখ ব্যবহারকারী। এরপর রয়েছে:
মেথামফেটামিন (ইয়াবা): ২২.৯ লাখ
অ্যালকোহল: ২০.২ লাখ
কোডিনযুক্ত কফ সিরাপ, হেরোইন ও ঘুমের ওষুধ
ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারী: প্রায় ৩৯ হাজার, যারা এইচআইভি ও হেপাটাইটিসসহ সংক্রামক রোগের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে
একজন মাদক ব্যবহারকারী গড়ে মাসে প্রায় ৬ হাজার টাকা মাদকের পেছনে ব্যয় করে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।
বয়স ও ঝুঁকিপূর্ণ কারণ
গবেষণায় উঠে এসেছে, মাদক ব্যবহারকারীদের বড় একটি অংশ তরুণ।
৩৩% ব্যবহারকারী ৮–১৭ বছর বয়সে
৫৯% ব্যবহারকারী ১৮–২৫ বছর বয়সে প্রথম মাদক গ্রহণ শুরু করেছে
মাদক ব্যবহারের প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বেকারত্ব, বন্ধুমহলের প্রভাব, পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক চাপ ও আর্থিক অনিশ্চয়তা। প্রায় ৯০% ব্যবহারকারী মাদককে সহজলভ্য বলে উল্লেখ করেছে।
চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ঘাটতি
গবেষণায় দেখা যায়, মাত্র ১৩% মাদক ব্যবহারকারী কখনো চিকিৎসা বা পুনর্বাসন সেবা গ্রহণের সুযোগ পেয়েছেন। মাদক ব্যবহারকারীরা চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবা, কাউন্সেলিং এবং কর্মসংস্থান সহায়তাকে সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। একই সঙ্গে ৬৮% ব্যবহারকারী সামাজিক ও পারিবারিক অপবাদ ও বৈষম্যের শিকার হয়েছেন বলে জানান।
উপসংহার
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মাদক সমস্যা কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি একটি জটিল জনস্বাস্থ্য, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট। প্রতিরোধ, চিকিৎসা, পুনর্বাসন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক পুনঃএকত্রীকরণকে অন্তর্ভুক্ত করে সমন্বিত জনস্বাস্থ্যভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করাই সময়ের দাবি। এই গবেষণার তথ্যভিত্তিক প্রমাণ ভবিষ্যতে জাতীয় নীতি প্রণয়ন ও কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেছেন।