06/08/2021
বাংলা সাহিত্যের সহস্রাব্দের শ্রেষ্ঠ প্রতিভা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর সৃ্ষ্টির বৈচিত্র্য, বৈভব ও বিপুলতা বিমুগ্ধ বিস্ময়ে অবলোকনীয়। উনিশ শতকে রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের চিন্তা-চেতনা, মেধা-মনন, ভাঙন -সৃজন
সংস্কার-নির্মাণ, কর্ম-কৃতি দ্বারা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালির যে মানস জাগরণ সাধিত
হয়েছিল তার সহগামী ,অনন্যঋদ্ধ একটি পরিবার হল জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার। এই পরিবারে ১৮৬১ সালে২৫শে বৈশাখ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিলেন কর্মযোগী, পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন ধ্যানযোগীওমহর্ষি আর দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর সাহিত্য সংস্কৃতির রস-সংবেদী ছিলেন। এই পারিবারিক পরিমণ্ডলেই রবীন্দ্রনাথের চিত্তলোক, ভাবনালোক ,কল্পলোক পরিপুষ্টও পরিবর্ধিত হয়। তবে প্রকৃতিই তাঁর প্রকৃত প্রতিপালক, অভিভাবক, নিয়তিনিবন্ধক, কাব্যদেবতা,জীবন দেবতা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মূলত কবি,সর্বার্থে কবি। তিনি রোমান্টিক কবি, গীতি কবি,স্বপ্নচারী কবি
সত্য ও সুন্দরের কবি। তাঁর প্রবল আগ্রহ প্রেমে ওবিরহে। তাঁর আরাধ্য ছিল প্রকৃতি প্রেম, দেশ প্রেম, মানব প্রেম ,নবোপলব্ধ ঈশ্বর প্রেম।বাংলার প্রকৃতি ওপ্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে নতুন চেতনাও মাত্রায় আবিষ্কার ও উপস্থাপন করেছেন রবীন্দ্রনাথ। বৈশাখে আমের মঞ্জরির ঘনঘ্রাণ, বর্ষার মেঘসমাগমে আঁধারাচ্ছন্ন দিন, বাদলদিনের অবিরলবর্ষণ, বিরহ বেদনা-ব্যাকুলতা; শরতের ভরা নদি, নির্মল নীলাকাশ, হেমন্তের সুবর্ণ ধান, মাঠের বাঁশি;শীতে আমলকির বনের ঝরা পাতার শিশিরাশ্রু, হিমেল আঁচলে রাতের আকাশ;বসন্ত-জ্যোৎস্নার উচ্ছল হাসি।
রবীন্দ্রনাথের কবিতায় আছে ক্ষুদ্রের মধ্যে বৃহতের প্রতিবিম্বায়ন,তুচ্ছের মধ্যে অসামান্যের মহিমায়ন,খণ্ডের মধ্যে অখণ্ডের ,বিন্দুর মধ্যে বিরাট বিশ্বের রহস্য উন্মোচন। বলাকার পাখার
ছন্দে পৃথিবীর বিরামহীন গতিও চলিষ্ণুতার ছন্দময়তার চিত্রায়ন আছে তাঁর কবিতায়; আছে ছেদহীন জীবনচক্রের কথা,আছে মানবতার কথা ,মানব রহস্যের কথা, বিশ্ব মানবতার কথা।
তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলো হল-মানসী,সোনার তরী,ক্ষণিকা, নৈবেদ্য,বলাকা,পূর্ব্ব,চিত্রা
পত্রপূট,শ্যামলী,জন্মদিনে,রোগ শয্যায় ,শেষ লেখা ইত্যাদি।
বাংলা ছোট গল্পের জনক রবীন্দ্রনাথ ।তাঁর গল্পে আছে সরল বুননে ছোট ছোট দুঃখ কথা,গভীর ব্যাথা যা কাব্যময়তায়, নাটকীয়তায়, জীবন-ব্যঞ্জনায় অতুলনীয়। ছুটি, হৈমন্তী, সমাপ্তি, মেঘ ও রৌদ্র, এক রাত্রি, ক্ষুধিত পাষাণ, শাস্তি, নষ্ট নীড় , স্ত্রীর পত্র,-এ সকল গল্প গুলো আজো সমভাবে আবেদন সৃষ্টিতে সক্ষম।
রবীন্দ্রনাথ উপন্যাস, নাটক,প্রবন্ধ,ভ্রমণ কাহিনি ও লিখেছেন।তাঁর উপন্যাসে সমকাল -সমাজ-রাজনীতি,বৌদ্ধিকতা,মানবসম্পর্কের জটিলতা,চিত্তবৈকল্য বিধৃতও বিশ্লেষিত
হয়েছে।চোখের বালি ,ঘরে-বাইরে ,গোরা তাঁর বহুল আলোচিত উপন্যাস; শেষের কবিতা
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রোমান্টিক উপন্যাস।রীতি-প্রথা ও হৃদয়াবেগ, নীতি-বাসনা
প্রাপ্তি- অপ্রাপ্তি ,মুক্তি-শৃঙ্খল এসব দ্বান্দ্বিকতায় রচিত নাটক ডাকঘর, বিসর্জন,মুক্তধারা,
অচলায়তন,রক্তকরবী ভাবনায়ওপ্রকরণে বাংলা নাটকের আধুনিকতার শৈল্পিক উচ্চতা দান করেছে।
তিনি চিঠিপত্র লিখেছেন তাও রূপ লাভ করেছে পত্র সাহিত্যের।রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন অজস্র গান,সুরারোপ করেছেন স্বয়ং,গেয়েছেন স্বকণ্ঠে।তাঁর গান মানবিক অনুভূতির এক
অখণ্ড আধার—যে গান আনন্দ দেয়,শান্তি দেয়,অভয় দেয়,বিশ্বাস দেয়,শক্তি দেয়,আলো দেয়, আশা দেয়,স্বপ্ন দেখায়,-সে গান প্রার্থনার মতন।
বাংলা ভাষার প্রাণ স্পন্দন যথার্থরূপে অনুধাবন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ তাই তাঁর হাতে সমৃদ্ধ হয়েছে বাংলা ভাষা সাহিত্য ,নন্দনকলা।রবীন্দ্র সাহিত্যওসংগীত বাঙালিকে বিকশিত
,পরিশীলিত ,রুচিবান করেছে-উজ্জীবিত করেছে নতুন মানবতাবোধে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের
জীবনওসাহিত্যে রয়েছে পরিপূর্ণ বাঙালি হওয়ারএবং সম্পন্ন,সুন্দর মানুষ হওয়ার সূত্র
রবীন্দ্র সাহিত্য তাই আমাদের অবশ্য পাঠ্য ,নিত্য পাঠ্য।
- ড.আয়েশা
আজ ২২ শে শ্রাবণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর প্রয়াণ দিবস। তাঁর সম্পর্কে এই চমৎকার প্রবন্ধটি লিখেছেন ঢাকা কলেজ এর সাবেক অধ্যক্ষ ডঃ আয়েশা বেগম।