03/01/2023
#সন্তানের_বয়ঃসন্ধিতে_বাবা_মায়ের_করনীয়
আমরা জানি, বয়ঃসন্ধি জীবনের এমন একটা সময়, যে সময়টা ছেলেবেলাকে বড় বেলার সাথে সংযুক্ত করে। এই সময় শারীরিক এবং মানসিক আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়। ছোট থেকে হঠাৎ বড় হয়ে যাওয়া নিয়ে এই বয়সী বাচ্চাগুলোর মধ্যে একটা দিশেহারা ভাব চোখে পড়ে বেশি। মূলত হরমোনের তারতম্যের জন্য এগুলো হয়ে থাকে।
মনে হয়, এই সেদিনের বাচ্চা, ধাঁই ধাঁই করে বড় হয়ে যাচ্ছে! মেয়েটার আচমকা পিরিয়ড শুরু হয়। বুকে নারীত্বের বৈশিষ্ট্য প্রচ্ছন্ন থেক প্রকট হতে থাকে। অবয়ব জুড়ে লাবণ্য, পেলবতার ছড়াছড়ি। ছেলেটারও ফিনফিনে গলার স্বর কেমন মেঘ গর্জনের মতো গমগমে। দাড়িগোঁফের সাথে পাল্লা দিতে হিমসিম। ওদিকে এক্সিলারী এবং পিউবিক হেয়ারও জানান দেয়, তুমি বড় হয়ে গেছো গো।
কৈশোরের কোমলতা খুশিমনে পরাজিত হয় তারুণ্যের টগবগে স্রোতের কাছে। মুখে ব্রন, কন্ঠে অন্যের স্বর আর শরীরে অন্যের শরীর (পড়ুন, বড়র শরীর) নিয়ে দিশেহারা এই বয়সী বাচ্চার। তার উপর আছে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আগ্রহ। ওই ছেলেটা যেনো কেমন করে তাকায়! বুক ধড়ফড় করে! তারপরও না তাকালে যেনো রাজ্যের অভিমান লাগে! আরেহ, এই মেয়েটা তো অদ্ভূত! এর মনোযোগ পেতে ওর বাসার সামনে দিনে দুইবেলা চক্কর দেয়া এমন কোন ব্যাপার! এদিকে পাড়াপ্রতিবেশি ছে ছে করে, হায় হায় গেলো গেলো। পোলাপান এমন ক্যান! বাপু আমরা বড় হয়নি?
হয়েছেন জনাব/জনাবা, কিন্তু ভুলে গেছেন যে, আপনারও এই দিন গেছে। আমারও গেছে, সবারই যায়। দিনমান পড়াশোনা করা ছেলেটা অথবা মেয়েটা যে পৃথিবীর তাবৎ আজাইরা কাজ থেকে মুক্ত, সেও দেখি একদিন ফুল হাতে নিয়ে ঢুলুঢুলু মনে অনুভব করে অন্যআলো, অন্যঘ্রাণ! বড় কাউকে দেখলে চট করে বইয়ের ভাঁজে লুকিয়ে ফেলে! কারো নীল খামে কুলকুল করে ঘামে আবার কী এক অজানা অচেনা ভালোলাগায় ফেলে দিতে মন চায় না, ভুল বানানে লেখা তারই মতো হরমোনের তোরে কাঁপতে থাকা অচেনা বালকের চিঠি! কলকাঠি নাড়ছে হরমোন আর দোষ দিচ্ছেন ওদের! ওদের আর কী দোষ বলুন? বেচারা ওরা! বড়দের মতো আচরণ করলে বলেন ইঁচড়ে পাকা, ছোটোদের মতো করলে ন্যাকা! ভারী জ্বালা তো!
এই সময় মেয়েটাকে শারীরিক পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়াতে পারে ঢিলেঢালা পোশাক। পিরিয়ডে একটু মনোযোগ। ওর সাহায্য লাগবে কিনা, জানতে চান। নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করুন, দেখুন মেয়ে কেমন নির্ভার বোধ করে।
কন্যাশিশুকে পিরিয়ড হওয়ার আগেই এর সম্বন্ধে ধারণা দিতে হবে। ব্যপারটা সম্পর্কে ক্লিয়ার ধারণা থাকলে তার প্রথম এবং পরবর্তী পিরিয়ড ম্যানেজ করা সহজ হবে। দশ এগারো বছর থেকে বাচ্চার স্কুল ব্যাগে আলাদা করে একটা কর্নার রাখা উচিত যেখানে প্যাড, পেন্টি ইত্যাদি থাকবে এবং বুঝিয়ে বলতে হবে, যেকোনো সময় পিরিয়ড হয়ে যেতে পারে। হলে সে যেনো ঘারড়ে না যায়। ওয়াশরুমে যেয়ে যেনো প্যাড পরে নেয়। এ ব্যাপারে আগেই ডেমো দিয়ে রাখতে হবে। কিভাবে পরে, কিভাবে ডিস্কার্ড করে, কিভাবে হাইজিন মলনটেইন করে ইত্যাদি সম্বন্ধে ও বলতে পারেন। প্রয়োজনে বন্ধুদের সহায়তা নিতে পারে। আবার বন্ধুর প্রয়োজনে নিজেও এগিয়ে যেতে পারে।
বয়ঃসন্ধিতে থাকা ছেলেটাকে বলুন, বেটা আমি তোর বাবা। আমারো এই দিন গেছে রে বাপ। আহা, কী যে সইসব দিন! প্রথম শেইভের কথা এখনো মনে আছে। কেটেকুটে একেবারে রক্তারক্তি কান্ড। আবেগ আর আতংক। এখনো মনে পড়লে কেমন যে লাগে! আপনার অভিজ্ঞতা শুনতে শুনতে ছেলে ভাববে, আরেহ আমি তো একা নই। আমার বাবাও এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে। তবে আমার আর ভয় কি?
ছেলের মা বাবারাও ও তার ওই বয়সী পুত্র সন্তানকে তার শারীরিক পরিবর্তন সম্পর্কে ধারনা দিতে পারেন। একদিন সকালে বয়ঃসন্ধিতে থাকা আমার বড় পুত্র তার বাবাকে আকুল স্বরে বলছে, বাবা আমিতো পিসু করে দেইনি। এসব কি আমার ট্রাইজারে। তার বাবা খুব সহজ কন্ঠে যেনো কিছুই হয়নি এমন ভাবে বললেন, পেনাইল ডিসচার্জ মানে স্বপ্নদোষ হয়েছে তোমার। এগুলো এ বয়সে হতে পারে। পারসোনাল হাইজিন মেইনটেইন করো কেমন! আর হ্যাঁ এটা স্বাভাবিক ব্যপার। এসব নিয়ে বেশি ভেবো না। ছেলের মায়েরা পিরিয়ড সম্বন্ধে ও একটু ধারণা দিয়ে রাখতে পারেন। যাতে সে পরিবার বা স্কুলে এমন কিছু দেখলে ব্যপারটা সহজভাবে নেয়।
শরীরবৃত্তীয় ব্যপারগুলোকে খাওয়া, ঘুমানো, ওয়াশরুমে যাওয়ার মতো সহজ, স্বাভাবিক নিত্য ধরে নিলে ভালো। অযথা বেশি সিক্রেট মনে করে আলাদা করার দরকার নেই। গোপন মনে করলে বরং কৌতুহল জাগে। নিষিদ্ধ জিনিসে ফিসফিসানি বাড়ে। কী দরকার ভাই? বৃষ্টি পড়লে ফিসফাস করেন? কিংবা আকাশে মেঘ করলে? না তো! বরং আনন্দিত হন ঋতু পরিবর্তনে। মানব শরীরও আকাশের চেয়ে কম নয়। সেখানেও মেঘ করে, বৃষ্টি হয়, বিজলি চমকায়, ঋতু পরিবর্তন হয়। জাস্ট টেইক ইট ইজি এন্ড গো ইজি। শুভকামনা।
©
ডা. ছাবিকুন নাহার
এমবিবিএস (ঢাকা), বিসিএস (স্বাস্থ্য)
এফসিপিএস (অবস.& গাইনী)
স্পেশাল ট্রেইনড ইন ইনফার্টিলিটি,
গর্ভবতী, প্রসূতি, স্ত্রী ও গাইনীরোগ বিশেষজ্ঞ এবং সার্জন,
ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ঢাকা।