18/02/2022
বাচ্চার রেজাল্টের চেয়ে সামাজিক দক্ষতা বেশি জরুরি
"ভাবী, আমার বাচ্চাটা তো ফার্স্ট হয়েছে, আপনারটা?"
"বাবু, ১০০ পর্যন্ত গুণে দেখাও তো!"
"আমার বাচ্চাটা একদম অংক পারে না!"
"তুই তো পড়া কিছুই পারিস না, বাকিদের দ্যাখ!"
আপনার ঘরে ছোট শিশু থেকে থাকলে আপনি নিশ্চিত এই কথাগুলো বলেছেন বা শুনেছেন। শুধু আমাদের দেশেই না, বিশ্বে অনেক দেশেই অভিভাবকেরা পড়াশোনাকে এত গুরুত্ব দেন যে, সামাজিক যোগাযোগ ও সম্পর্কের দক্ষতা চাপা পড়ে যায়। কিন্তু, দেখা যায় দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ধারনে সামাজিক দক্ষতার পরিমাপ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
২০১৫ সালের এক গবেষনায় দেখা যায়, সকল পরিস্থিতি একই রাখা সত্ত্বেও, কিন্ডারগার্ডেন শিশুদের সামাজিক দক্ষতা তাদের ২৫ বছর বয়সের সার্বিকভাবে ভাল থাকার সাথে সরাসরিভাবে জড়িত। অর্থাৎ, যারা কিন্ডারগার্ডেনে যত ভালভাবে মানুষের সাথে মিশতে পারে, তাদের স্কুল পেরিয়ে ভাল কলেজে ভর্তি হওয়া, ভাল চাকরি লাভের হার বেশি, এবং তাদের জেলে না যাওয়ার হারও বাকিদের চেয়ে কম!
এর মানে সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য অধিক মূল্যবান শিক্ষাগুলো আসে শৈশবকালীন খেলাধুলা, বাকিদের সাথে মেশা এবং যোগাযোগের মাধ্যমে; যা অনেকাংশেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চাপের মুখে চাপা পড়ে যায়।
৫টি চমৎকার উপায়ে আপনি আপনার সন্তানের সামাজিক দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারেন ~
১. শিশুকে মুক্তভাবে বাকিদের সাথে খেলতে দেয়াঃ
খেলাধুলা একটি শিশুর সুস্থ শৈশবের জন্য অপরিহার্য। সমবয়সীদের সাথে সময় কাটানোর মাধ্যমে তারা একদিকে যেমন নিজের সমস্যা সমাধান করতে, সমঝোতা করতে শিখে, অপরদিকে ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা অর্জন করে।
বাচ্চাকে নাচ, গান, ছবি আঁকা শেখানো অভিভাবকের ইচ্ছায় চলতে পারে; কিন্তু তাকে অবশ্যই মুক্তভাবে খেলার সুযোগ দেয়া উচিত, যেখানে তার আশেপাশে কেউ দেখাশোনা করার জন্য থাকলেও, সে নিজ ইচ্ছায় খেলবে।
২. সমস্যার সমাধানে সহায়তাঃ
মা- বাবা হিসাবে আমরা কিভাবে বাচ্চার সমস্যায় প্রতিক্রিয়া দেখাই? হয় দৌড়ে যাই সমাধান করতে, না হলে চেষ্টা করি যাতে সে সমস্যাতেই না পড়ে! কিন্তু, তাদের নিজেদেরও কিন্তু এই অভিজ্ঞতাগুলো দরকার। তাই, যেকোন সমস্যা মোকাবেলায় সন্তানকে সাথে নেয়া উচিত। এতে যে আপনার ভূমিকা কমে যাবে তা কিন্তু নয়! যেমন, সন্তানকে পরিকল্পনা করার সময় জিজ্ঞেস করতে পারেন - "এই সমস্যা থেকে আমরা কিভাবে বেরিয়ে আসতে পারি?" তাকে সমাধানের জন্য মাথা খাটাতে দিলে, তার অভিজ্ঞতার সাথে খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতাও বাড়বে। শিশুকাল থেকেই এই স্বভাব গড়ে উঠলে, বড় হয়ে ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া সহজ হয়।
৩. অনুভূতি চিনতে পারা ও পার্থক্য করাঃ
দেখা যায়, যেসব বাচ্চা নিজের অনুভূতি চিনতে পারে, তারা অন্যদের অনুভূতিগুলোও বাকিদের চেয়ে বেশি চিনতে পারে। ছোটবেলা থেকেই আপনি নিজের আচরণের মাধ্যমে এই অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন। এটি ঘরে (যেমন - তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি খুব বিরক্ত) এবং ঘরের বাইরে (যেমন - ওর চেহারা দ্যাখো, ওর হাসি দেখে বোঝা যাচ্ছে খেলাটি জিতে ও খুব খুশি) উভয় স্থানেই প্রয়োগ করা যেতে পারে।
বাচ্চাদের অনুভূতি চেনানোর জন্য একটি চমৎকার উপায় হল - গল্পের বই। এসব গল্পের বই গুলোতে ছবির সাহায্যে চেহারার অনেক অনুভূতি সহজেই বোঝা যায়। বাচ্চারা সেদিকে তাকাতে, নিজের অনুভূতির চাইতে অনেক সময় দ্রুত বুঝতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গবেষণায় দেখা গেছে যারা টিভি, ফোন, ট্যাব, যেকোন ইলেক্ট্রনিক স্ক্রিন ব্যবহার করে, সেইসব বাচ্চাদের অনুভূতি চিহ্নিতকরণের ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যায়। তাই যাতে আপনার সন্তান এসব থেকে দূরে থেকে, মানুষের সাথে বেশি করে মিশতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখা আপনার দায়িত্ব।
৪. অন্যকে সাহায্য করতে শেখানোঃ
নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে অন্যকে সাহায্য করা - সন্তানেরা পরিবার থেকেই শিখে। তাই, যখনই দেখবেন আপনার বাচ্চা অন্য কাউকে সাহায্য করছে, তাকে প্রশংসা করুন, উৎসাহিত করুন। পরিবারের ছোট ছোট কাজে তাকে সাহায্য করার সুযোগ করে দিন, যেমন পানির গ্লাসটি এগিয়ে দেওয়া, ছোট ভাই-বোনকে খাবার খাওয়াতে সাহায্য করা ইত্যাদি। তাদের ছোট কাজের জন্য তাদেরকে বড় প্রশংসা করুন।
আমাদের আশেপাশে যারা আমাদের কাজে সাহায্য করে, বাচ্চাদের সামনে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা দেখান। আপনি বিভিন্ন গল্পের মাধ্যমেও তাকে বলতে পারেন। দেখবেন, হয়তোবা আপনার সন্তান এক সময় মনে করবে সুপারহিরোরা আমাদের আশেপাশেই বসবাস করে এবং আমাদের দৈনন্দিন কাজে সাহায্য করে!
৫. নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করাঃ
আমাদের মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণের স্থানটি বয়সন্ধিকালের আগ পর্যন্ত সম্পূর্ণ ভাবে গড়ে ওঠে না। কিন্তু যত ছোট বয়স থেকে আবেগ নিয়ন্ত্রণ অভ্যাস করা যায়, সন্তানের জন্য ব্যাপারটা তত সহজ হয়। গবেষণায় দেখা যায়, যেসব খেলায় বাচ্চারা ধৈর্য ধরে রাখার অভ্যাস করে, (যেমন বরফ পানি, ফুলটোক্কা অথবা নির্দিষ্ট আলো জ্বললে ডানে-বামে যাওয়া) সেসকল খেলার ফলে ছোটবেলা থেকেই তারা ধৈর্যশীল হয়, ভবিষ্যতে তাদের জন্য এটি উপকারী হয়।
আরেকটি জনপ্রিয় এবং মজার খেলার নাম হলো 'প্রিটেন্ড প্লে'। এই খেলাতে একজন অন্যজনের চরিত্রে অভিনয় করে এবং তার দিক থেকে ঘটনাটিকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। এমন খেলার মাধ্যমে বাচ্চারা ছোটবেলা থেকে অন্যের দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে সহমর্মী হয়ে ওঠে।
বাচ্চাদের একাডেমিক ক্যারিয়ার এবং পড়াশোনা অবশ্যই জরুরি, কিন্তু পাশাপাশি তাদের এই অভ্যাসগুলো ছোটবেলা থেকেই গড়ে তোলার প্রতি অভিভাবকদের মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। ভবিষ্যতে এই প্রতিটি জিনিসই তাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং জীবনের মূল সম্পদ হয়ে দাঁড়াবে!
------------
◼️ লাইফস্প্রিং এর অভিজ্ঞ সাইকিয়াট্রিস্ট ও সাইকোলজিস্ট এর অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে কল করুনঃ
09638 505505 | 01763 438148 | ২৪ ঘন্টা যে কোনো সময়
------------
• WhatsApp: 01763 438148
• Instagram: short.gy/S20l33
• Like | Comment | Share