17/12/2025
কানাডার গ্রোসারি স্টোরে ঢুকলে আমার সবসময় একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়। শেলফে শেলফে সাজানো জিনিসপত্র, সবকিছুরই পরিচ্ছন্ন মুখ, কিন্তু কোথাও একটা ঘাটতি। সেই ঘাটতির নাম সরিষার তেল।
একদিন হঠাৎ দেখি—আছে তো! বোতলটা ধরতেই বুকের ভেতর ঘরে ফেরা মানুষের মতো অনুভূতি। লেবেল পড়তে গিয়ে সেই উষ্ণতা মুহূর্তেই হাওয়া। বড় করে লেখা—For External Use Only.
আমি একটু অবাক হই। মনে পড়ে ছোটবেলায় মা গোসল করানোর আগে গায়ে সরিষার তেল মালিশ করে দিত। এটা কি তাহলে খাওয়া যাবে না?! ইলিশের পাশে? লাউয়ের চচ্চড়িতে? লেবেলটা আবার পড়ি। ভুল দেখছি কি না। না, ঠিকই লেখা। যেন বোতলটা নিজেই সাবধান করে দিচ্ছে—খেয়ো না, আমাকে খেয়ো না।
এই দেশে তেলেরও অভিবাসন সংকট আছে।
বন্ধু আনিসকে ফোন দিলাম। আনিস অনেকদিন আছে এ দেশে। সে শুনে হো হো করে হাসল। বলল, আরে ধুর মিয়া, ওটা শুধু নিয়মের জন্য লেখা। আমরা তো খাই-ই।
আমি বললাম, লেখা কেন তাহলে?
আনিস বিজ্ঞের মতো গলার স্বর নিচু করে বলল, এর পেছনে একটা বৈজ্ঞানিক পলিটিক্স আছে। এই তেলের ভেতর নাকি এরুসিক অ্যাসিড থাকে। এদের ল্যাবরেটরিতে ইঁদুর-টিঁদুর দিয়ে পরীক্ষা করে দেখেছে ওটা হার্টের জন্য ভালো না। ব্যস, অমনি হুকুম জারি। খাবার তালিকা থেকে বাদ। আমাদের তো ভাই জন্মই হয়েছে সরিষার তেল দিয়ে। আমাদের হার্ট কি অত কাঁচা?
আমি চুপ করে রইলাম। আনিস বলতে লাগল, এই কানাডা কিন্তু নিজেরাই এক ধরনের তেল বানিয়েছে—ক্যানোলা। নামটা খেয়াল করেছ? Canada আর Oil মিলে ক্যানোলা। এই তেলে এরুসিক অ্যাসিড নেই। একদম ভদ্র তেল। কারও হার্টে ধাক্কা দেয় না। তাই ওরা চায় সবাই ওটাই খাক।
আনিসের কথায় খুব একটা আশ্বস্ত হই না। কারণ নিয়মের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বরাবরই জটিল। দেশে নিয়ম ছিল—ভাঙার জন্য। এখানে নিয়ম আছে—মানার জন্য।
আমাদের দেশে সরিষার তেলের কোনো পরিচয়পত্র লাগে না। সে নিজেই নিজের পরিচয়। রান্নাঘরে ঢুকলেই সে বলে দেয়—আমি এসেছি। মাছ জানে, ভাত জানে, এমনকি পেঁয়াজও জানে। কিন্তু কানাডায় এসে সে যেন একটু লজ্জিত। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে দোকানের কোণে। খাবারের নয়, গায়ে মালিশ করার জন্য।
সাহস করে বোতলটা কিনে ফেলি। ক্যাশিয়্যার মেয়েটা হাসিমুখে স্ক্যান করে দেয়। ঘরে ফিরে বোতলটা কেবিনেটে রাখি। প্রথম দিন ব্যবহার করি না। যেন একটা নতুন দেশের নতুন নাগরিক, প্রথম প্রথম একটু লজ্জায় থাকে।
দ্বিতীয় দিন কড়াইতে ঢালি। খুব অল্প। যেন বেশি হলেই কেউ দেখে ফেলবে। কড়াইতে তেল গরম হতেই যে গন্ধটা ওঠে—সে গন্ধের কোনো ভিসা লাগে না। সে জানালা পেরিয়ে, দেয়াল পেরিয়ে, সময় পেরিয়ে চলে আসে।
খেতে বসে মনে হয়, আহা! সেই স্বাদ! গুষ্টি মারি সতকর্তা লেবেলের।