20/01/2026
রমজান মাসে রোজা: কিডনি রোগীদের জন্য খাদ্যাভ্যাস, পানি গ্রহণ, ওষুধ-সমন্বয়
এবং কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট রোগীদের ইমিউনোসাপ্রেসিভ ওষুধ ব্যবস্থাপনা
রমজান মাস মুসলমানদের জন্য সংযম, আত্মশুদ্ধি ও ইবাদতের সময়। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রোজা মানে হলো দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা, পানি গ্রহণ সীমিত হওয়া এবং খাবার ও ওষুধের সময়সূচিতে বড় পরিবর্তন। সুস্থ মানুষের শরীর সাধারণত এই পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নিতে পারলেও, যাদের কিডনি রোগ রয়েছে—যেমন ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (CKD), ডায়াবেটিসজনিত কিডনি রোগ, উচ্চ রক্তচাপজনিত কিডনি সমস্যা, ডায়ালাইসিসে না থাকা কিডনি রোগী কিংবা কিডনি ট্রান্সপ্লান্টপ্রাপ্ত রোগী—তাদের জন্য রোজা রাখা একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ব্যক্তিভিত্তিক সিদ্ধান্ত।
ভুল খাদ্যাভ্যাস, পানিশূন্যতা অথবা ওষুধের সামান্য অনিয়মও এই রোগীদের ক্ষেত্রে কিডনির কার্যকারিতা হঠাৎ খারাপ করে দিতে পারে। বিশেষ করে কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট রোগীদের ক্ষেত্রে ইমিউনোসাপ্রেসিভ ওষুধের একটি ডোজও বাদ পড়া মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
রোজার সময় কিডনি রোগীদের শরীরে কী পরিবর্তন ঘটে
রোজার সময় দীর্ঘক্ষণ পানি না খেলে শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হতে পারে। এতে রক্ত ঘন হয়ে যায়, কিডনিতে রক্তপ্রবাহ কমে যেতে পারে এবং ক্রিয়াটিনিন বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। একই সঙ্গে সোডিয়াম, পটাশিয়াম ও অন্যান্য ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে, যা দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, রক্তচাপের অস্বাভাবিক ওঠানামা কিংবা হৃদস্পন্দনের সমস্যার কারণ হতে পারে।
রমজানে অনেক সময় ইফতারে অতিরিক্ত লবণ, তেল ও মিষ্টি খাবার গ্রহণ করা হয়, যা কিডনি রোগীদের জন্য বিশেষভাবে ক্ষতিকর।
রমজানে খাদ্যাভ্যাস: কিডনি রোগীদের জন্য বিস্তারিত নির্দেশনা
সেহরি
সেহরি কিডনি রোগীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কখনোই বাদ দেওয়া উচিত নয়। সেহরি বাদ দিলে পানিশূন্যতা, দুর্বলতা ও রক্তচাপের সমস্যা দ্রুত দেখা দিতে পারে।
সেহরিতে এমন খাবার থাকা উচিত যা ধীরে হজম হয় এবং দীর্ঘ সময় শক্তি জোগায়। আটা রুটি, লাল চালের ভাত বা ওটসের মতো জটিল কার্বোহাইড্রেট উপযোগী। মাঝারি পরিমাণ প্রোটিন যেমন ডিম, মাছ, মুরগি বা ডাল প্রয়োজন, তবে অতিরিক্ত প্রোটিন কিডনির ওপর চাপ ফেলতে পারে। সবজি ও শাক ফাইবার সরবরাহ করে এবং হজমে সহায়তা করে।
অতিরিক্ত লবণ, আচার, ঝাল ও ভাজাপোড়া খাবার এড়ানো জরুরি, কারণ এগুলো তৃষ্ণা বাড়ায়। চা ও কফি প্রস্রাব বাড়াতে পারে, তাই সেহরিতে এগুলো সীমিত রাখা ভালো।
ইফতার
দীর্ঘ সময় রোজার পর হঠাৎ অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ কিডনি রোগীদের জন্য ক্ষতিকর। ইফতারে প্রথমে পানি ও এক থেকে দুইটি খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙা ভালো। এরপর কিছুক্ষণ বিরতি নিয়ে হালকা খাবার এবং পরে পরিমিত রাতের খাবার গ্রহণ করা উচিত।
ভাজাপোড়া, অতিরিক্ত মিষ্টি, শরবত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার সীমিত রাখা প্রয়োজন, কারণ এগুলো রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও শরীরের ওজন বাড়িয়ে কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
পানি গ্রহণ: কিডনি রোগীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
ডায়ালাইসিসে না থাকা অধিকাংশ কিডনি রোগীর জন্য ইফতার থেকে সেহরির মধ্যে পর্যাপ্ত পানি পান করা অত্যন্ত জরুরি। তবে পানি একবারে অনেক না খেয়ে অল্প অল্প করে বারবার পান করা ভালো।
যাদের শরীরে পানি জমার প্রবণতা, ফোলা, হার্ট ফেইলিউর বা অগ্রসর কিডনি রোগ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে পানি গ্রহণের পরিমাণ অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে।
রমজানে ওষুধ-সমন্বয়ের সাধারণ নীতিমালা (সব কিডনি রোগীর জন্য)
রমজানে ওষুধ কখনোই নিজ ইচ্ছায় বন্ধ করা যাবে না। প্রয়োজনে কেবল সময় পরিবর্তন করা যায়, ডোজ বাদ দেওয়া যাবে না।
সাধারণভাবে
দিনে একবার খাওয়ার ওষুধ ইফতারে নেওয়া যায়।
দিনে দুইবার খাওয়ার ওষুধ ইফতার ও সেহরিতে ভাগ করে নেওয়া যায়।
দিনে তিনবার বা তার বেশি ডোজের ওষুধ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া রোজা রাখা ঝুঁকিপূর্ণ।
কিডনি রোগীদের সাধারণ ওষুধ এবং রমজান
উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ
অধিকাংশ রক্তচাপের ওষুধ ইফতারে নেওয়া যায়। প্রস্রাব বাড়ায় এমন ওষুধ (ডাইইউরেটিক) সেহরিতে নিলে পানিশূন্যতা ও মাথা ঘোরা হতে পারে, তাই অনেক সময় এগুলোর সময় পরিবর্তন প্রয়োজন হয়।
ডায়াবেটিসের ওষুধ
ডায়াবেটিসজনিত কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে রোজা রাখার ঝুঁকি বেশি। মেটফরমিন অনেক রোগীর ক্ষেত্রে নিরাপদ হলেও কিডনির কার্যকারিতা কমে গেলে ডোজ সমন্বয় দরকার। ইনসুলিন ও সালফোনাইলইউরিয়া ব্যবহারে হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি থাকে, তাই রক্তে শর্করা নিয়মিত পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।
ব্যথানাশক ও অন্যান্য ওষুধ
নিজ ইচ্ছায় ব্যথানাশক, বিশেষ করে NSAIDs, কিডনি রোগীদের জন্য ক্ষতিকর এবং রমজানে এই ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট রোগীদের জন্য বিশেষ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ: ইমিউনোসাপ্রেসিভ ওষুধ
কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট রোগীরাও কিডনি রোগীদের একটি বিশেষ ও সংবেদনশীল শ্রেণি। প্রতিস্থাপিত কিডনিকে শরীর স্বাভাবিকভাবে “বিদেশি অঙ্গ” হিসেবে চিহ্নিত করে আক্রমণ করতে চায়। ইমিউনোসাপ্রেসিভ ওষুধ এই আক্রমণ দমন করে কিডনিকে বাঁচিয়ে রাখে।
এই ওষুধগুলোর একটি ডোজও বাদ পড়লে হতে পারে
একিউট রিজেকশন,
ক্রিয়াটিনিন হঠাৎ বেড়ে যাওয়া,
এবং দীর্ঘমেয়াদে গ্রাফট নষ্ট হয়ে যাওয়া।
Tacrolimus বা Cyclosporine
এই ওষুধগুলো সাধারণত দিনে দুইবার নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে খেতে হয়। রমজানে একটি ডোজ ইফতারে এবং অন্যটি সেহরিতে নেওয়া যায়। ডোজের মধ্যবর্তী সময় যতটা সম্ভব সমান রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পানিশূন্যতা হলে এসব ওষুধের রক্তমাত্রা বেড়ে টক্সিসিটি হতে পারে।
Mycophenolate mofetil বা Mycophenolic acid
এই ওষুধ সাধারণত দিনে দুইবার নেওয়া হয় এবং ইফতার ও সেহরিতে খাওয়া যায়। খাবারের সাথে নিলে পেটের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিছুটা কম হতে পারে। কোনো ডোজ বাদ দেওয়া হলে রিজেকশনের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
Prednisolone
স্টেরয়েড সাধারণত দিনে একবার নেওয়া হয় এবং ইফতারের পরে গ্রহণ করা যায়। হঠাৎ বন্ধ করা বা নিজ ইচ্ছায় ডোজ কমানো বিপজ্জনক এবং জীবননাশের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
রমজানে কিডনি রোগীদের প্রধান ঝুঁকি
রমজানে কিডনি রোগীদের প্রধান ঝুঁকিগুলো হলো পানিশূন্যতা, রক্তচাপের অস্বাভাবিক ওঠানামা, ইলেকট্রোলাইটের সমস্যা, সংক্রমণ এবং কিডনির কার্যকারিতা হঠাৎ খারাপ হয়ে যাওয়া। জ্বর, ডায়রিয়া, বমি, প্রস্রাব কমে যাওয়া বা অতিরিক্ত দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত রোজা ভেঙে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কখন কিডনি রোগীদের রোজা না রাখাই উত্তম
অগ্রসর কিডনি রোগ (CKD stage 4–5), সদ্য কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট (প্রথম ৬–১২ মাস), অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ, ঘন ঘন পানিশূন্যতা, গুরুতর সংক্রমণ বা ডায়ালাইসিস প্রয়োজন হলে রোজা রাখা চিকিৎসাগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। ইসলামে অসুস্থ ব্যক্তির জন্য রোজা না রেখে পরে কাজা বা ফিদিয়া দেওয়ার সুস্পষ্ট অনুমতি রয়েছে।
উপসংহার
রমজানে রোজা রাখা একটি মহান ইবাদত, কিন্তু কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে এটি অবশ্যই চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকে নেওয়া সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়ন্ত্রিত পানি গ্রহণ এবং ওষুধের একটি ডোজও বাদ না দেওয়া—বিশেষ করে ট্রান্সপ্লান্ট রোগীদের ক্ষেত্রে ইমিউনোসাপ্রেসিভ ওষুধ—এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করা গেলে অনেক কিডনি রোগী নিরাপদে রোজা রাখতে পারেন। তবে রোজা শুরুর আগে অবশ্যই নিজের নেফ্রোলজিস্ট বা ট্রান্সপ্লান্ট চিকিৎসকের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করা অপরিহার্য।
Consult with a leading nephrologist and kidney transplant specialist in Dhaka. Advanced kidney disease diagnosis, dialysis support, and long-term renal care.