25/11/2025
বাউল আর বাউল শিল্পী যে এক নয়—এই সাধারণ জ্ঞান যাদের নেই, তারা পীর আর আলেম কিভাবে হয়? অথচ এই বিষয়টি অত্যন্ত সহজ। তাছাড়া পালাগান বা বিচার গানে দুই শিল্পী দুই চরিত্রে স্ক্রিপ্ট ছাড়াই উপস্থিত বুদ্ধিতে অভিনয় করেন—এই বিষয়েও যাদের ধারণা নেই, তারা না বুঝেই ফতোয়াবাজি করে। এরা তো জাত মূর্খ বা জাহেল। হালাল, হারাম, শিরক, বিদআত—এসব তো পরের বিষয়; আগে “বিষয়টা কী?”—তা তো ফতোয়া দেওয়ার আগেই জানা লাগবে।
পালা গানের আরেক নাম ‘বিচার গান’—অর্থাৎ দু’পক্ষের আলোচনা শুনে শ্রোতারা বিচার করেন। কিন্তু এইসব পালা নিয়েও মানুষ ভুল বোঝে, কারণ পালাগান যে অভিনয়ের মঞ্চ—দুই শিল্পীর চরিত্রাভিনয়ের জায়গা—এটাই অনেকে জানে না। অথচ প্রতিনিয়ত তারা তুর্কি সিরিজ দেখে, সাহাবীদের নিয়ে বানানো নাটক-সিনেমা দেখে। ইউসুফ (আ.)–এর চরিত্রে অভিনয় করা ব্যক্তি যেমন নবী নন, আবার ‘আর্তুরুল গাজী’ সিরিজের কাফের পাদ্রীরা কেউই অমুসলিম নন; তারা মুসলিম, শুধুই চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এই বিষয়টা সবাই বুঝলেও পালাগানের বিষয়টা তারা বোঝে না।
জীব–পরমের পালা বা আল্লাহ–বান্দার পালায় ‘বান্দা’ অধিকাংশ ক্ষেত্রে নাস্তিকের ভূমিকায় থাকে, আবার ভালো আস্তিকের ভূমিকাও নিতে পারে। জীব–পরম পালার মূল বৈশিষ্ট্যই হলো—ঈশ্বরের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেই অভিযোগের সঠিক জবাব, এবং আল্লাহর দয়া ও মহত্ত্বকে উপলব্ধি করানো। পরমের ভূমিকায় গান গাওয়া সহজ; কিন্তু জীবের ভূমিকায় গান গাওয়া কঠিন। সেই কারণে দু’জনের মধ্যে অধিক জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ শিল্পীকে জীবের পালা দেওয়া হয় যেন সে স্রষ্টার প্রতি মানুষের অভিযোগ–সন্দেহগুলো ভালোভাবে তুলতে পারে। সহজভাবে বললে—বান্দার মনে স্রষ্টার প্রতি যে অভিযোগ-সন্দেহ থাকে সেগুলো তুলে ধরা এবং তার জবাব দিয়ে বোঝানো যে আল্লাহ মহান ও দয়ালু—এটাই এই পালার উদ্দেশ্য।
ফকির–মুন্সী ও শরীয়ত–মারেফত পালা হয়—যেখানে একজন শরীয়তের আলেম এবং অপরজন মারেফতের ফকির হিসেবে অভিনয় করেন। এতে এক পক্ষ অপর পক্ষের ত্রুটি তুলে ধরে এবং উভয়েই নিজেদের যুক্তি উপস্থাপন করেন। মূলত শরীয়তের প্রয়োজনীয়তা ও মারেফতের গভীরতা বোঝাতেই এই পালা।
হিন্দু–মুসলিম পালা হয়, আস্তিক–নাস্তিক পালা হয়। সেখানেও অনেক কথাবার্তা হয়। দেখা যায়—মুসলিম শিল্পীকে হিন্দুর পালা এবং হিন্দু শিল্পীকে মুসলিমের পালা দেওয়া হয়। হিন্দু হয়ে হিন্দুদের দোষ ধরেন শিল্পী; মুসলিম হয়ে ইসলামের দোষ ধরেন। কারণ এটা অভিনয়ের মঞ্চ।
বাউল মতবাদ বা বাউল দর্শন মূলত তত্ত্ব ও সাধনা–কেন্দ্রিক একটি মরমী দর্শন। তাদের সেই মতবাদ নিয়ে বিতর্ক আছে—কিন্তু সেটা আলাদা বিষয়। তার সাথে বাউল গান বা বাউল শিল্পীদের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। বাউল দর্শনের অনুসারীরা গান নাও গাইতে পারেন—কিন্তু দর্শন পালন করে বাউল হতে পারেন। আর সুফীবাদী, তরিকাপন্থি, আস্তিক, নাস্তিক, মাদ্রাসা-পড়ুয়া, স্কুল-পড়ুয়া—যে কেউ গান গাওয়ার মাধ্যমে বাউল শিল্পী হতে পারেন। একটার সম্পর্ক গান–গাওয়া (পেশাগত বিষয়) আরেকটার সম্পর্ক দর্শন–বিশ্বাস–ধর্ম–কর্মের সাথে।
যেমন আবুল সরকার একজন বাউল শিল্পী, কিন্তু তিনি তরিকাপন্থি। তার গানের উস্তাদ ও মুর্শিদ আলাদা ব্যক্তি—গানের গুরু বাউল রশিদ সরকার, কিন্তু তিনি বায়আত নিয়েছেন বৈরাবর দরবার শরীফে। অন্যান্য বাউল শিল্পীদের ক্ষেত্রেও একই। তারা পেশায় বাউল শিল্পী, কিন্তু বিশ্বাসে তরিকাপন্থি বা সুফীবাদী। তারা বাউল নন—বরং বাউল শিল্পী।
এসব না জেনে–না বুঝেই প্রায়ই বাউলদের বিরুদ্ধে মামলা হয়, তাদের উপর আক্রমণ হয়। কোনো আলেম কি নাস্তিকের ভূমিকায় অভিনয় করা মুসলিম ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ফতোয়া দিয়েছেন বা আক্রমণ করেছেন? না। কারণ তারা এ বিষয়ে জানেন। তাহলে পালাগান সম্পর্কে না জানতেই এত ফতোয়াবাজি? কেন আক্রমণ? কেন মামলা?
একটি দেশের আলেমদের সেই দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি, সামাজিক রীতি–নীতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানা উচিত। এদিক দিয়ে আমাদের দেশের আলেমরা জ্ঞানহীন। তারা চাইলে এখন ঘরে বসে এসব জানতে পারেন—পালাগান শুনতে যাওয়ারও দরকার নেই। কিন্তু জানার আগ্রহ নেই। কারণ তারা আলেম—নিজেদের অলরেডি মহাজ্ঞানী ভাবে। তাই না জেনেই ফতোয়া দেয়। অবশ্য আমাদের দেশের প্রায় প্রতিটি মুসলিমই যেন একেকজন মুফতি—ফতোয়া দিতে খুবই পটু। অথচ ফিকহের ‘ফ’-এরও জ্ঞান নেই। ফলে হালালকে হারাম, হারামকে হালাল, সুন্নতকে বিদআত, বিদআতকে সুন্নত বানিয়ে ফেলে।
যা-ই হোক—মামলা হতেই পারে। কিন্তু পুলিশ তো পালাগান সম্পর্কে জানে—তাহলে কেন মামলার এজাহারে তারা উল্লেখ করে না যে এটা অভিনয়, সাধারণ বিষয়—যেন আদালত সহজে বুঝে মামলা খারিজ করে দিতে পারেন? বিসিএস দিয়ে মেজিস্ট্রেট বা জজ হওয়া ব্যক্তিরাও কেন দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ সংস্কৃতি সম্পর্কে অজ্ঞ? এসব মামলা রেজিস্ট্রেশন হবে কেন? আদালতে উঠার সাথে সাথে তো জজ বাতিল করে দেবেন ভিত্তিহীন উল্লেখ করে। কিন্তু দুঃখের বিষয়—একজন বিসিএস ক্যাডার ও অভিজ্ঞ বিচারকেরও এই বিষয়ে জ্ঞান নেই।
আমরা আলেমদের দোষ দিই—তাদের তো আগেই বাউলদের অপছন্দ। কিন্তু একজন মেজিস্ট্রেট এমন কেন হবেন? তার কীসের ক্ষোভ বাউলদের উপর? পুলিশের কীসের ক্ষোভ? তারা কি সত্যটা জানে না? না জানলে এই পেশায় কেন? আর জানলে কেন বিনা দোষে বাউলরা জেল খাটছেন?
আসলে কাকে দোষ দেবো? অনেক পীরই মনে করেন—বাউল শিল্পীরা তরিকাপন্থি নন। তারাও বুঝেন না বাউল শিল্পী আর বাউলের পার্থক্য। তাছাড়া বাউল শিল্পীরা শরীয়ত বা মুন্সীর ভূমিকায় মারেফত বা ফকিরদের বিরুদ্ধে গান গাইলেও এদেশের তথাকথিত পীর–ফকির ও তাদের মুরিদদের মাথা নষ্ট হয়ে যায়। তারাও বাউল শিল্পীদের উপর চড়াও হন, মাফ চাইতে বাধ্য করেন। অর্থাৎ যাদের বোঝার কথা—তারাও বোঝেন না।
লেখা: DM Rahat