30/12/2025
দুজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী একবার প্রতিজ্ঞা নিলেন যে তাঁরা কোনো নারীকে স্পর্শ করবেননা, প্রেম বা বিয়ে তো দূরের কথা। প্রতিজ্ঞা শেষে তাঁরা দুজনে মঠে গিয়ে উঠলেন, সেখানে কাটিয়ে দিলেন বহুবছর। মঠে নারী প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিলো, সন্ন্যাসীরা নিজেও লোকালয়ে যেতেননা, পাছে কোনো নারীর স্পর্শ লেগে যায়। এভাবেই চলছিলো জীবন।
একদিন দুজনে মঠের ধারে একটা নদীর পাড় ধরে হাঁটছিলেন। নদী অগভীর, তবে স্রোত বেশি। হঠাৎ তাঁরা লক্ষ্য করলেন, এক নারী নদী পার হওয়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু খরস্রোতা জলে নামতে ভয় পাচ্ছেন।
যে সন্ন্যাসী বয়সে একটু সিনিয়র, তিনি এগিয়ে এলেন। “আপনার কোনো আপত্তি না থাকলে আমি আপনাকে অপর পাড়ে পৌঁছে দিচ্ছি।” উক্ত ভদ্রমহিলা সায় দিলে সন্ন্যাসী তাঁকে কোলে তুলে নদীর অপর পাড়ে পৌঁছে দিলেন। নামানোর পর ভদ্রমহিলা ধন্যবাদ জানিয়ে চলে গেলেন। দুই সন্ন্যাসীও নিজের পথ ধরলেন। সিনিয়র সন্ন্যাসী চুপচাপ হাঁটতে থাকলেও, যিনি বয়সে কম তিনি কোনোভাবেই শান্তি পাচ্ছিলেন না যে, এত প্রতিজ্ঞার পরও কিভাবে সিনিয়র সন্ন্যাসী স্বেচ্ছায় এক মহিলাকে স্পর্শ করতে পারলেন! How strange!
হাঁটতে হাঁটতে তাঁরা বহুদূর পাড়ি দিলেন। এবার ফেরার পালা। ঠিক তখনই জুনিয়র সন্ন্যাসী আর থাকতে না পেরে রাগ আর বিরক্তি প্রকাশ করেই ফেললেন - “আপনি কিভাবে এক স্ত্রীলোককে স্পর্শ করতে পারলেন, তাও আবার কোলে তুলে নদী পাড় করানো? কিভাবে পারলেন? কোথায় গেলো আপনার প্রতিজ্ঞা?”
সিনিয়র সন্ন্যাসী থামলেন। জুনিয়রের দিকে তাকিয়ে বললেন - “হায় রে! আমি তো সেই নারীকে কত আগেই কোল থেকে নামিয়ে দিয়েছি। অথচ তুমি এখনো তাঁকে মনে মনে বহন করে চলছো!”
সেই নারী সন্ন্যাসীর কোল থেকে কয়েক মিনিটের মাথায় নেমে গেলেও অপরজন তাঁকে মনে মনে বহন করে এসেছেন এতোটা পথ!
জুনিয়র সন্ন্যাসী বুঝতে পারলেন - “সবচেয়ে ভারী বোঝা আমরা দুই হাতে নয় বরং বহন করি আমাদের মাথায়, মনে। The heaviest burdens aren't in our hands, but they live in our head.”
এই বার্ডেনটাই হলো চিন্তা।
যক্ষ যুধিষ্ঠিরকে প্রশ্ন করেছিলো “কোন জিনিসের সংখ্যা ঘাসের চেয়েও বেশি?”
উত্তরে যুধিষ্ঠির বলেছিলেন - “চিন্তা।”
চিন্তা ঘাসের চেয়েও অগুণতি। একজন মানুষ সারাদিনে যে পরিমাণ চিন্তা করে তা দুনিয়ার সব ঘাসের চেয়েও সংখ্যায় বেশি।
আর এই চিন্তা হলো ধুঁকে ধুঁকে চলা আগুনের মত। বাইরে থেকে দেখা যায়না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে মানুষকে খেয়ে ফেলে।
আপনি বাইরে থেকে সুস্থ, স্বাভাবিক, হাসিখুশি। কিন্তু আপনার ভিতরে দুনিয়ার চিন্তা। রাজনৈতিক পারিবারিক সামাজিক আর্থিক চিন্তা, কর্মক্ষেত্রের চিন্তা, প্রমোশন পোস্টিংয়ের চিন্তা, নিরাপত্তার চিন্তা।
এই চিন্তা আপনাকে শান্তিতে থাকতে দিবেনা। ধীরে ধীরে আপনাকে মেরে ফেলবে।
হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হরমোনাল ইমব্যালেন্স, ঘুমের অভাব, হজমশক্তি ধ্বংস - কত খারাপ জিনিসই না নিয়ে আসে এই চিন্তা!
এই চিন্তা মানে সুস্থ স্বাভাবিক চিন্তা নয়, দুশ্চিন্তা। Thoughts নয়, Stress, anxiety, tension....
আমাদের thoughts গুলো যেমুহুর্তে stress আর anxiety তে রূপান্তর হওয়া শুরু হয় - ঐ সময়ই আমাদের পতন শুরু হয়। আমরা ভাবতেই থাকি, ভাবতেই থাকি। বনের বাঘের আগে মনের বাঘ আমাদের খেয়ে ফেলে। কী হবে কেমনে হবে কখন হবে - এতশত মানসিক স্ট্রেস আমাদের পাগল বানিয়ে দেয়। আয়ুহারা শ্রীহারা হয়ে আমরা ধুঁকতে থাকি।
দুঃখের ব্যাপার হলো, বর্তমান দুনিয়ায় আপনি চিন্তা না করেও পারবেননা। আশপাশের সেটাপটাই এমন - যে কেউই সম্পূর্ণ সুখী হতে পারবেনা। একটা না একটা ল্যাকিংস থাকবে, অভাব থাকবে। আর সেই না পাওয়ার বেদনা থেকে আসবে চিন্তা। আর এই চিন্তা আপনার আর কিছু পাওয়ার পথও বন্ধ করে দিবে।
বর্তমান পৃথিবী একটা স্ট্রেসফুল পৃথিবী।
তাই আমরা সেই জুনিয়র সন্ন্যাসীর মতো, মাথা থেকে কিছুই ঝেড়ে ফেলতে পারিনা। একগাদা চিন্তা বহন করতে করতে মাথা ভার করে ফেলি। অতঃপর, অল্প বয়সেই হাসি-আনন্দ ভুলে অন্ধকারে ডুবে যাই।
শুরুতে যেটা বলা, সেটা অনেক পুরনো গল্প। সেদিন ইউটিউবে পেলাম। পুরনো, কিন্তু আজও যথার্থ।
যদিও অনেক ডিফিকাল্ট, তারপরও বলবো চিন্তা যত কম করা যায় তত ভালো।
অন্যে কী পেলো কী খেলো সেটা না দেখে নিজের অর্জন নিয়েই সন্তুষ্ট থাকা উচিত। যতটুকু পারা যায় আরকি। ❤️
চিন্তা এমন এক জিনিস, শূন্য করা যায়না। তবে সংখ্যা কমানো যায়। সেই ই ভালো।
আসুন চিন্তাকে কমাই।