29/03/2026
ব্লাড ক্যান্সার চিকিৎসায় বোনম্যারো প্রতিস্থাপন কতটুুকু সফল?
ব্লাড ক্যান্সার হয়েছে এটি শুনলেই সবায় আতকে উঠে। এটিই স্বাভাবিক কারন এটির চিকিৎসা পদ্ধতি খুবই জটিল ও ব্যয়বহুল। সফল চিকিৎসার পর ৫ বৎসরের বেশী বাঁচা ভাগ্যের ব্যাপার।
প্রথমে জানব ব্লাডক্যান্সার কি ধরনের রোগ দেহের কোথায় হয়, এর ফলে দেহে কী কী ঝুঁকি তৈরি হয়।
আমাদের দেহে ব্লাড তৈরি হয় হাড়ের ভিতর। দেহের বড় বড় হাড়ের ভিতর স্পন্জের মত কিছু টিস্যু রয়েছে। এটিকে বোন ম্যারো টিস্যু বলে। এ বিশেষ ধরনের টিস্যুকোষ থেকে দেহ রক্ত কনিকা (লাল,শ্বেত ও অণুচক্রিকা,বি-সেল, টি-সেল সহ সব ধরনের রক্ত কনিকা) তৈরি হয়। ৭৩ কেজি ওজন দেহে এর ওজন প্রায় ৩.৬৫ কেজি বা ৮ পাউন্ড। এ টিস্যু থেকে প্রতিদিন ৬০০ বিলিয়ন রক্তকণিকা তৈরি হয়ে মুল রক্ত স্রোতে মিলিত হয়।
বোন ম্যারোটিস্যুতে ব্লাড তৈরির একটি মাদার সেল রয়েছে এটিকে "হেমোপোয়েটিক স্টেমসেল" বলে। এ হেমোপোয়েটিক স্টেমসেল থেকেই দেহের সকল রক্তকণিকার সৃষ্টি হয়। বোনম্যারো টিস্যুতে কোন রোগ বা ড্যামেজের কারনে রক্ত তৈরি কম বেশী বা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। অপরিপক্ব রক্তকণিকা তৈরি বা কনিকার আকৃতির পরিবর্তনও রক্ত রোগের একটি সমস্যা।
রক্ত কনিকাগুলোর কাজ সম্পর্কে কিছু ধারনা থাকলে রক্ত ক্যান্সার সম্পর্কিত উপসর্গ সমূহ বুঝা সহজ হয়। তাই রক্ত কনিকা সমূহের প্রধান প্রধান কাজ নিয়ে সংক্ষেপে কিছু আলোচনা করব।
দেহে মোট ৫/৬ লিটার রক্ত (রক্তরস+রক্তকণিকা) থাকে। প্রধান রক্তকণিকাগুলোর নাম হচ্ছে;
রেড ব্লাডসেল বা লাল রক্ত কনিকা, হোয়াইট ব্লাড সেল বা শ্বেতরক্ত কনিকা, থ্রম্বোসাইট বা অনুচক্রিকা।
লাল রক্তকণিকার প্রধান কাজ হচ্ছে, বাতাস থেকে শ্বাসনালীতে আসা অক্সিজেনকে ধরে রাখা। একজন মানুষ ২৪ ঘন্টায় ১১ হাজার লিটার বাতাস গ্রহন করে। এর থেকে ৫৫০ লিটার অক্সিজেন ফুসফুসে থাকা রেডব্লাড এটি ধরে রাখে। এ অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্ত হার্টে প্রেরন করে। হার্ট পাম্প করে সারা দেহ কোষে এটি পৌঁছে দেয়। অক্সিজেন ছাড়া দেহ কোষ দেড় মিনিটের বেশী বাঁচেনা। অন্যদিকে দেহ কোষের ত্যাগ করা বর্জ কার্বন ডাই অক্সাইড বহন করে ফুসফুসে এনে প্রশ্বাসের সাথে বের করে দেয়। দেহ রক্তরসে থাকা লালরক্তে বয়স ৪ মাস বা ১২০ দিন। এটির জন্মস্থান হাড়ের ভিতর বোনম্যারো টিস্যুতে।
লাল রক্তকোষের অস্বাভাবিক আচরনে নানা ধরনের দৈহিক সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। এ ধরনের একটি সমস্যাকে লিউকেমিয়া বলে যা ব্লাড ক্যান্সার নামেই পরিচিত। লাল রক্তের ক্যান্সার রোগে সাধারন থেকে জটিল এনিমিয়া হয়। এ রোগের লক্ষন হচ্ছে রক্তের হিমোগ্লোবিন কমে যায় বা নির্দিষ্ট সময়ের আগে হিমোগ্লোবিন ভেঙ্গে যায়। এ হিমোগ্লোবিন একটি প্রোটিন যা দিয়ে লাল রক্তকণিকার উপরের আবরন তৈরি হয়। মানব দেহ রক্তে প্রায় ৮ গ্রাম হিমোগ্লোবিন থাকে।
মানব দেহে ৩০ ট্রিলিয়ন লাল রক্তকণিকা রয়েছে। প্রতিটি কনিকায় ২৭০ মিলিয়ন হিমোগ্লোবিন কণা রয়েছে। প্রতিটি হিমোগ্লোবিন কনা ৪টি করে অক্সিজেন অনু বহন করে। দেহের অক্সিজেন স্বল্পতা ভোগাকেই এনিমিয়া বলে। অক্সিজেন ছাড়া দেহ কোষ বাঁচেনা। আধুনিক ক্যান্সার চিকিৎসার ভাষায় এটির নাম একুইট বা ক্রনিক্যাল মাইয়েলয়েড লিউকেমিয়া (C/AML).
হোয়াইট ব্লাডসেল বা শ্বেতকনিকারা সম্মিলিত ভাবে দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ঠিক রাখে। অর্থাৎ সকল ধরনের ব্যাকটিরিয়া, ভাইরাস, ফাঙ্গাস সহ সকল টক্সিনকে প্রতিরোধ করে। অনেক প্রকার হোয়াইট ব্লাডসেল আছে। যেমন বি-সেল, টি-সেল, ম্যাক্রোফেইজ,কিলার সেল ইত্যাদি। এর মধ্যে বি-সেল ও টি-সেল কে লিম্পোসাইট বলে। যদিও সকলের উপত্তিস্থল বোনম্যারো টিস্যুতে।
বি-সেল ও টি- সেল বোনম্যারোতে জন্ম নিলেও লালন পালন হয় লিম্পনোডে। লিম্পনোড হচ্ছে এক ধরনের গ্ল্যান্ড বা গ্রন্থি যেখানে বি-সেল ও টি-সেল পরিপক্ক হয়। তাই বি-সেল ও টি-সেলে কোন সমস্যা হলে দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে। দেহে অতিরিক্ত অপরিপক্ব, অকেজো বি-সেল এর জন্ম হলে একে আধুনিক ক্যান্সার চিকিৎসার ভাষায় বলে একুইট বা ক্রনিক্যাল লিম্পোসাইটিক লিউকেমিয়া( A/CLL)।
থ্রম্বোসাইট বা প্লাটিলেট বা অণুচক্রিকা দেহের রক্তজমাট বাঁধার প্রক্রিয়াকে ঠিক রাখে। এ প্রক্রিয়ায় দেহের অনাঙ্খাকিত রক্তপাত বন্ধ হয়ে দেহকে রক্তশুন্যতা থেকে রক্ষা করে। অতিরিক্ত থ্রম্বোসাইট দেহের অনাঙ্খাকিত রক্তজমাট বাঁধায় আবার কম থ্রম্বোসাইট রক্তপাত ঘটায়।
সকল রক্ত রোগের সৃষ্টি বোনম্যারো টিস্যুর অসুস্থতা থেকে। কিছু রক্ত রোগের সৃষ্টি হয় লিম্পনোড এর অসুস্থতা থেকে। বোনম্যারো টিস্যুতে টিউমারে হলে আধুনিক ক্যান্সার চিকিৎসায় একে মায়েলোমা বলে। বোনম্যারো টিস্যুর টিউমার বা ক্যান্সার থেকে সৃষ্ট সকল রক্ত কোষের ক্যান্সারকে একা সাথে বল "মাল্টিপল মায়েলোমা"। লিম্পনোড এ সৃষ্ট ক্যান্সার বা টিউমারকে "লিম্পোমা" বলে। লিম্পনোড এর অসুস্থতার কারনে বি-সেল কার্যক্ষম হতে পারেনা। বি-সেলের প্রধান কাজ এন্টিবডি তৈরি করা। এন্টিবডি একটি প্রোটিন যার কাজ জীবানু(ব্যাকটিরিয়া, ভাইরাস,ফাঙ্গাস, প্রটোজোয়া) ধ্বংস করে দেহকে জীবানুমুক্ত রাখা।
আধুনিক ক্যান্সার চিকিৎসায় নিন্মের পদ্ধতি অনুসরন করা হয়
ক্যামোথ্যারাপী
রেডিওথেরাপী
বোনম্যারো ট্রান্সপ্লেন্ট বা হেমোপোয়েটিক স্টেমসেল রিপ্লেইসমেন্ট থেরাপী।
ক্যামোথ্যারাপী হচ্ছে ক্যামিকেল থেরাপি। ল্যাবে তৈরি কিছু পরিক্ষিত ক্যামিকেল যা কোষের ক্ষতি করার মাধ্যমে কোষের মৃত্যু ঘটায় বা কোষীয় ক্ষমতাকে বিধস্ত করে। ব্লাড ক্যান্সার চিকিৎসায় ব্যবহৃত ক্যামোগুলোর কাজ নিয়ে সংক্ষেপে আালোচনা করা হলো;
Brotezonib ক্যামোটি দেহ কোষের একটি অঙ্গ প্রটিয়োসম এর ভাঙ্গন বন্ধ কর। এটিকে প্রটিয়েজ ইনিহিবিটর ড্রাগ বলে। প্রটিয়েজ হচ্ছে প্রোটিন ভাঙ্গার এনজাইম। দেহ কোষে তৈরি এ এনজাইম প্রোটিন ভেঙ্গে দিয়ে অসুস্থ,দুর্বল ও রোগাক্রান্ত, ক্যান্সারাস কোষকে মেরে ফেলে দেহকে রোগমুক্ত রাখে। দেহ কোষে পি৫৩ (P53) একটি প্রোটিন আছে যেটি টিউমার ও ক্যান্সারাস কোষগুলো মেরে ফেলে। ব্রটেজোনিব (Protease inhibitor) ড্রাগটি প্রোটিন ভাঙ্গা প্রতিরোধ করে ক্যান্সার ও টিউমার ধ্বংসকারী প্রোটিন পি৫৩ (P53)কে কার্যকর রাখে।
দেহ কোষ যখন জীবানু দ্বারা আক্রান্ত হয় তখন জীবানুরা যে বিষ ছাড়ে সেটিও প্রোটিন। এ বহিরাগত প্রোটিনের (এন্টিজেন)কারনে দেহ নিজস্ব প্রোটিন(এন্টিবডি) তৈরি করে জীবানুকে ধ্বংস করে। এ জীবাণু ধ্বংসের অনেক প্রক্রিয়ার মধ্য একটি হচ্ছে প্রটিয়েজ(প্রোটিন ভাঙ্গার এনজাইম) নিঃসরনের মাধ্যমে জীবানু আক্রান্ত কোষটি মেরে ফেলা।
Lenalidomide ( এনজিওজেনেসিস ইনহিবিটর) ক্যামোটি নতুন রক্ত নালী তৈরিতে বাঁধা তৈরি করে। ফলে টিউমার কোষে রক্ত সরবরাহ বিঘ্ন ঘটে। এর ফলে পুষ্টি ও অক্সিজেনের অভাবে কোষগুলো মারা যায়। এটি হাড়ের ভাঙ্গা গড়ার (রিমোডেলিং) প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে বন্ধ করে। ফলে হাড় পুর্নগঠন ব্যহত হয়। যেহেতু হাড়ের ভিতর থেকে রক্ত তৈরি হয় তাই হাড়ের ভাঙ্গা গড়ার কাজকে ব্যহত করে ব্লাড ক্যান্সারের চিকিৎসা দেয়া হয়।
রেডিওথেরাপী হচ্ছে উচ্চ গতির রশ্মি বা রে (গামা রে ; যার গতি সেকেন্ডে ১লাখ ৮৬ হাজার মাইল) ক্যান্সার আক্রান্ত এলাকায় নিক্ষেপ করা হয়। এতে কোষগুলো মারা যায়। এতে আশে পাশের সুস্থ কোষও আক্রান্ত হয়।
বোনম্যারো ট্রান্সপ্লেন্ট :
আধুনিক ব্লাডক্যান্সার চিকিৎসায় বোনম্যারো ট্রান্সপ্লেন্ট পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এটিকে স্টেমসেল ট্রান্সপ্লেন্ট বা হেমোপোয়েটিক স্টেমসেল ট্রান্সপ্লেন্টও বলে। এ পদ্ধতিতে ক্যান্সার আক্রান্ত বোনম্যারো বা অস্থিমজ্জা সম্পূর্নভাবে ধ্বংস করে সম্পূর্ন নতুন অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন করা হয়।
যে ভাবে বোনম্যারো প্রতিস্থাপন করা হয় জেনেনি:
বোনম্যারো প্রতিস্থাপনের জন্য দুটি উৎস থেকে স্টেমসেল সংগ্রহ করা হয়। রোগীর নিজের দেহের স্টেমসেল [ব্লাড,বোনম্যারো এবং আমবিলিকল কর্ড (ভূমিষ্ট শিশুর নাভী) ও প্লাসেন্টা।] এসব অঙ্গে প্রচুর স্টেমসেল থাকে।
নিজের দেহের স্টেমসেল ব্যবহার করলে এ পদ্ধতিকে 'অটোলোগাস' (Autologous) বলে। অন্য দেহের স্টেমসেল ব্যবহার করলে একে 'এলোজেনিক'(Allogenic) বলে। নিজের দেহের স্টেমসেল ব্যবহার করে বোনম্যারো ট্রান্সপ্লেন্টে কিছুটা মৃত্যুঝুঁকি কমে।
প্রথম স্টেপ: ক্যামো বা রেডিও থেরাপি প্রয়োগ করে পুরো বোনম্যারো ধ্বংস করা হয়। অটোলোগাস এর ক্ষেত্রে আগে থেকে স্টেমসেল সংগ্রহ করে রাখা হয়। এ স্টেপ রোগীর জন্য খুব ঝুঁকিপূর্ণ। কারন বোনম্যারো ধ্বংস করার কারনে দেহের রক্ত উৎপাদন ব্যবস্থা সম্পূর্নভাবে বন্ধ থাকে। এ ছাড়া ক্যামোর আঘাতে পুরো দেহ কোষ আক্রান্ত হয়ে নানা মুখী শারীরিক জটিলতা তৈরি হয়।
দ্বিতীয় স্টেপে ধীরে ধীরে সংগৃহীত স্টেমসেল রক্তে ইনজেকশন এর মাধ্যমে বোনম্যারোতে প্রতিস্থাপন করা হয়।
তৃতীয় ধাপে মুলতঃ এর কার্যকর প্রক্রিয়া শুরু হয়। অর্থাৎ এ ধাপে বোনম্যারোতে প্রতিস্থাপিত স্টেমসেল বিভাজন শুরু করে এবং রক্ত উৎপাদনে যায়। সফল বোনম্যারো প্রতিস্থাপনের পর বয়স ভেদে সর্বোচ্চ বাঁচার বয়স ৫/৭ বছর।
জানতে থাকুন ব্লাডক্যান্সার চিকিৎসায় স্টেমসেল নিউট্রিশন কিভাবে কাজ করে?
Hakim Md ashraful Islam Liton
Syrup Ashrican
ashrafullaboratories