01/01/2026
আপনি কি আল্লাহর কাছে অবাস্তব কোন কিছু চাইতে ভয় পান?
আমরা দোয়ার শক্তিকে ঠিকভাবে বুঝতে পারি না বলেই জীবনের অনেক দরজাই বন্ধই রয়ে যায়।
অথচ দোয়া এমন এক ক্ষমতা, যা একজন ordinary মানুষের জীবনকে অসাধারণ করে দিতে পারে।
সূরা মারিয়ামের প্রথম নয়টি আয়াত থেকে দোয়ার শিক্ষা এমন, যা না জানলে আমাদের জীবন অনেকটাই বৃথা থেকে যায়। কোরআনে এত স্পষ্টভাবে আল্লাহ আমাদের সামনে এই সত্য তুলে ধরছেন, অথচ আমরা বছরের পর বছর জীবন কাটিয়েও তা উপলব্ধি করতে পারি না।
কোরআনে বহু নবী ও রাসূলের ঘটনা আসছে। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, অনেক নবী-রাসূলের ব্যক্তিগত আমল যেমন নামাজ, রোজা, যাকাত বা হজ সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা নাই।
কিন্তু একটি বিষয় প্রায় সবার ক্ষেত্রেই স্পষ্টভাবে আসছে, আর তা হইলো দোয়া। নূহ আলাইহিস সালাম, মুসা আলাইহিস সালাম, ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম সবার দোয়ার বর্ণনাই আছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দোয়ায় তো বুখারী ও মুসলিম শরীফ পরিপূর্ণ। অর্থাৎ দোয়া এমন একটা ইবাদত, যা কোরআন ও হাদিসে বারবার আসছে। অথচ আমাদের নিজেদের জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, দোয়া অনেক সময় অনুপস্থিত।
দোয়া শুধু আনুষ্ঠানিক কিছু শব্দ নয়। কোরআনে যে দোয়াগুলো আসছে, সেগুলোর অধিকাংশই ব্যক্তিগত, একাকি, নিভৃতে করা দোয়া। এখানেই সূরা মারিয়ামের শুরু আমাদের জন্য এক অসাধারণ শিক্ষা।
আল্লাহ জাকারিয়া আলাইহিস সালামের কথা বলছেন। তিনি একজন নবী, আল্লাহর প্রিয় বান্দা।
আল্লাহ বলছেন, তিনি নিভৃতে, একাকি, গোপনে তাঁর রবকে ডাকলেন। এখানে কোনো জাঁকজমক নেই, কোনো আয়োজন নেই, শুধু একাগ্রতা আর আন্তরিকতা।
অনেক সময় আমাদের দোয়ায় আয়োজন থাকে, কিন্তু অন্তরের গভীরতা থাকে না।
জাকারিয়া আলাইহিস সালাম দোয়ায় তাঁর দুর্বলতার কথা বলছেন। তিনি বলছেন, তাঁর অস্থি দুর্বল হয়ে গেছে, চুল পড়ে গেছে, তিনি বৃদ্ধ। তবুও তিনি বলেন, তিনি কখনো আল্লাহর কাছে দোয়া করে নিরাশ হননি।
এরপর তিনি এমন একটি দোয়া করেন, যা বাস্তব দৃষ্টিতে অবিশ্বাস্য, তিনি সন্তান চাইলেন। তাঁর স্ত্রী অনুর্বর, দুজনেই বৃদ্ধ।
তবুও তিনি দোয়া করেন, কারণ তাঁর আশেপাশে তাওহীদের পথে কেউ নেই। তিনি চান এমন একজন সন্তান, যে তাওহীদের বার্তা বহন করবে এবং যার ওপর আল্লাহ সন্তুষ্ট থাকবেন।
এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হইলো, দোয়ার উদ্দেশ্য সম্পদ বা দুনিয়ার লাভ নয়, বরং দ্বীনের দায়িত্ব।
আল্লাহ তাঁর দোয়ার জবাব দেন এবং ইয়াহিয়া আলাইহিস সালামের সুসংবাদ দেন।
তখন জাকারিয়া আলাইহিস সালাম অবাক হয়ে বলেন, এটা কিভাবে সম্ভব। আল্লাহ জবাব দেন, এটা আমার জন্য সহজ। আমি তোমাকে সৃষ্টি করেছি, যখন তুমি কিছুই ছিলে না।
"তোমাদের কেউ তার সব প্রয়োজনই আল্লাহর কাছে চাইবে, এমনকি তার জুতার ফিতা" (তিরমিযী ৩৫২৪)
এখানেই দোয়ার সবচেয়ে বড় শিক্ষা। আল্লাহ আমাদের শেখাচ্ছেন, এমন দোয়া করতে যা করতে আমরা ভয় পাই, যা আমাদের কাছে অসম্ভব মনে হয়। কিন্তু আল্লাহর জন্য অসম্ভব কিছুই নাই।
আমাদের জীবনে কত মানুষ আছে, যারা অসম্ভব মনে হওয়া অবস্থান থেকে আল্লাহর সাহায্যে বেরিয়ে আসছে। কিন্তু আমরা দোয়া করতে ভয় পাই। আমরা মনে করি, এই দোয়া করলে কি হবে।
অথচ কোরআন আমাদের শেখায়, এমন দোয়াই করো, যা করতে তোমার ভয় লাগে। দোয়া কবুল হলে তোমার ঈমান আরও বাড়বে। আর যদি আল্লাহ দোয়া কবুল না করেন, সেটাও তোমার জন্য কল্যাণকর, যা হয়তো তুমি এখন বুঝতে পারছ না।
সূরা মারিয়ামের শুরু আমাদের আরেকটি বড় শিক্ষা দেয়। সত্যিকারের নায়ক তারা নয়, যাদের আমরা কল্পনার জগতে দেখি। সত্যিকারের নায়ক হলেন নবী ও রাসূলরা। তাঁদের শক্তি যুদ্ধ বা বাহুবলে নয়, বরং আল্লাহর সাথে গভীর সংযোগে।
এই সংযোগ তৈরি হয় নিভৃতে করা দোয়ার মাধ্যমে। একজন বান্দা যখন আল্লাহর সাথে যুক্ত হয়, তখন তার ভিতর থেকে একটি নৈতিক ও আত্মিক শক্তি তৈরি হয়। সেই শক্তি থেকেই ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ গড়ে ওঠে।
দোয়া আমাদের আল্লাহর ওপর নির্ভরতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। দোয়া মানে আমি স্বীকার করছি, আমি দুর্বল, আর আল্লাহই একমাত্র সহায়। এই উপলব্ধি থেকেই জীবনের পরিবর্তন শুরু হয়।