24/06/2023
একজন খুনের গল্প
২০১৩ সালের ১৮ই জুন। ইভনিং সিফট করে বাড়ি ফিরছি, পথে ছোট দেবরের কল,
' ভাবী, মুন্নীকে ওটিতে নিচ্ছে, রাত ১১: ৩০ এ সিজার করবে।'
দুপুরে মুন্নী বাচ্চার মুভমেন্ট কম পাচ্ছিলো তাই আল্ট্রাসাউন্ড করা হয়। অলিগোহাইড্রামনিওস ছিলো তাই সিজারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
সিজারের জন্য সময়টা কিছুটা প্রতিকূল মনে হচ্ছিলো যদিও ইমার্জেন্সি বলে তেমন কিছু বলার ছিলোনা আমার, শুধু আমি এতো রাতে এটেন্ড করতে পারবোনা বলে খারাপ লাগছিলো কারণ আমার নিজেরও তখন সেকেন্ড ট্রাইমেস্টার চলছিলো, ডিউটি করে কিছুটা ক্লান্ত ছিলাম।
সবকিছু ঠিকঠাক হচ্ছিলো, নারায়ণগঞ্জের মুক্তি ক্লিনিকে ডা:কামরুন্নাহার দীপা ১১:৫০ মিনিটে সিজার করেন মুন্নীর। আমাকে জানানো হয় মেয়ে হয়েছে। বাচ্চাকে দেখিয়েছে বাচ্চা ভালো আছে।
রাত ১২:৩০ এ আমাকে ফোন দিয়ে মেজো জা জানালো যে ডাক্তার বলছে রক্ত লাগবে। রুগী আনস্ট্যাবল।ব্লাড প্রেসার কম।
রাত ১২:৪৫ এ আবার কল দিয়ে আমাকে একজন এনেসথেসিস্টকে ফোনে ধরিয়ে দেয় আমার দেবর। তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আমাকে জানান,
' আপা, রুগী একটু খারাপ হয়ে গেছিলো , আমরা ইটি টিউব দিয়ে দিয়েছি, ব্লাড প্রেসার কম , কিছু ব্লাড লস হয়েছে, আমরা দেখছি আপা।'
এতোটুকু শোনার পর আমার মাথা কাজ করছিলোনা, মুন্নীর পুরো এন্টিন্যাটাল চেক আপে এমন কিছু ছিলোনা যার কারণে সিজার হবার আধ ঘন্টার ভেতর তার কার্ডিয়াক এরেস্ট হতে পারে! আমি যখন কিছুই মেলাতে পারছিনা তখন আমাকে ওটি থেকে আবার আমার মেজো জা ফোন দিয়ে জানায় যে মুন্নীকে ডাক্তার ঢাকা নিয়ে যেতে বলছে, এখানে রুগী ম্যানেজ করা সম্ভব না। এবং এও জানায় যে ওটির ভেতর বালতি ভরা রক্ত , মুন্নীর বিছানা রক্তে ভেসে যাচ্ছে।
আমি ল্যাব এইড এ কর্মরত বিধায় তাদের দ্রুত সেখানে নিয়ে আসতে বলি।
রাত ৩ টায় ঢাকা মেডিক্যাল এর ইমার্জেন্সি থেকে আমার দেবরের ফোন থেকে তার বন্ধু জানায় যে...
' মুন্নী নেই।'
তারা রুগীকে ঢাকা আনার পথেই তাদের সন্দেহ হয় যে রুগী আছে কিনা! এবং তাই তারা দ্রুত প্রথমে যখন ঢাকা মেডিক্যাল এর ইমার্জেন্সিতে মুন্নীকে নিয়ে যায় তখন তারা তাকে ব্রট ডেথ বলে ডিক্লেয়ার দেন।
এ বছর ১৯ জুন মুন্নীর মৃত্যুর ১০ বছর পূরণ হলো। মানহার বয়স হলো ১০ বছর। মুন্নী ওর মেয়ে মানহার মুখ দেখে যেতে পারেনি। মা আর মেয়ের জন্ম আর মৃত্যুর সময় পার্থক্য মাত্র ৩ ঘন্টা!
সবাই অনেক কিছু লিখছেন সেন্ট্রাল নিয়ে, সংযুক্তা নিয়ে। আমার আজ মনে হলো আমি লিখবো।
ডা: কামরুন্নাহার দীপাকে নিয়ে।
ডা:দীপাকে আমরা আইনের আওতায় নিতে পারিনি কারণ সে রাতে তিনি আমাদের এই শোকে ফেলে পেছনের দরজা দিয়ে ঠিক ই বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন। আমরা তাকে শো কজ করেছিলাম স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে কিন্ত পরবর্তীতে তার প্রভাবশালী মনোভাবের কারণে , মুন্নীর বাবা পোস্টমর্টেম এবং অন্যান্য আইনি জটিলতায় যেতে না চাওয়ার কারণে আমরা ঘটনাটিকে নিয়ে বেশীদূর যেতে পারিনি। নইলে আজ হয়তো এমন আরেক সংযুক্তার গল্প আমাকে লিখতে হতোনা!
এতোক্ষণ গল্পের আবেগীয় অংশে ছিলাম, এখন আসুন যৌক্তিক অংশে আসি।
# রাত ১২ টায় একজন ডাক্তার কেনো তার ইমার্জেন্সি ওটি রাখলেন যখন তিনি বিকেলেই জানতে পেরেছিলেন তার রুগীর অলিগোহাইড্রামনিওস? রাত ১২ টা একটা ইমার্জেন্সি ওটি করার জন্য কতোটা যৌক্তিক?
# ডাক্তার দীপা কেনো অসময়ের অপারেশনে সব ধরণের ব্যাক আপ রাখলেন না? আমাদের ধারণা তিনি ইন্টারনাল আর্টারি কেটে ফেলেছিলেন এবং তা রিপেয়ারের চেষ্টাও করেন নি।
# তিনি কেনো আমাদের ঐ মুহুর্তে সবকিছু এক্সপ্লেইন না করে মৃত প্রায় রুগীকে অন্য হাস্পাতালে রেফার করতে বললেন?
এমন অনেক প্রশ্ন ডা: কামরুন্নাহার দীপাকে করতে চেয়েছিলাম। তিনি একজন এস্কেপিস্ট, একজন চরম ইরেস্পন্সিবল ইনহিউম্যান গাইন্যাকোলজিস্ট। উনাদের মতো চিকিৎসকদের আমি নিজে চিকিৎসক হয়েও খুনী বলে গালি দিতে ইচ্ছে করে।
আমরা শুধুমাত্র মুন্নীর বাবা মায়ের তার মেয়েকে নিয়ে কাঁটাছেড়া করা থেকে অনিচ্ছার কারণে এই ডা:দীপাকে
শাস্তির আওতায় আনতে পারিনি।
তিনি ক্ষতিপূরণ দিতে চেয়েছিলেন।কতটা আস্পর্ধা তার!!
আজ এতোগুলো বছর পর জানাতে ইচ্ছে হলো আরোও একজন খুনির নাম...
ডা: কামরুন্নাহার দীপা।
কেউ পারলে তাকে লিখাটা ট্যাগ করে দেবেন।
মিমি হোসেন।
শেবাচিম , ২৬তম।