28/01/2026
মুখমন্ডলের তীব্র ব্যথা বা “ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া” তে আক্রান্ত একটি রোগীর রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি এবলেশন করলাম। আলহামদুলিল্লাহ রোগী ইনজেকশন পরবর্তী ভালো আছেন। ৩০ বছরের ব্যথা নিরাময় হলো আলহামদুলিল্লাহ।
ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া কি?
ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া মূলত একটি স্নায়ুজনিত ব্যথা। আমাদের মুখমন্ডলের দুই পাশে ট্রাইজেমিনাল নার্ভ নামের দুইটি স্নায়ুর মাধ্যমে মুখমন্ডলের অনুভূতিগুলো মস্তিষ্কে প্রবেশ করে । ট্রাইজেমিনাল নার্ভ তিনটি শাখার মাধ্যমে মুখমণ্ডলের উভয় পাশে চোখের উপর, চোখের নিচে ও থুতনীর দুই পাশ থেকে ব্যথা সহ সকল অনুভূতি মস্তিষ্কে নিয়ে যায়। যদি কোন কারনে এই ট্রাইজেমিনাল নার্ভ এর যাত্রাপথে কোন ব্যাঘাত হয় বা চাপে থাকে সেটা হতে পারে স্বাভাবিক গঠনগত কারণে অথবা স্নায়ুর আশেপাশে যে রক্তনালীগুলো থাকে সেগুলোর অসাভাবিক গঠনেও অনেক সময় এই চাপ তৈরি হতে পারে । যখনই ট্রাইজেমিনাল স্নায়ুতে চাপ তৈরি হয় তখন এই নার্ভের শাখা-প্রশাখা যারা মুখমন্ডলের দুই পাশ থেকে অনুভূতিগুলো মস্তিষ্কে বা ব্রেনে বহন করে নিয়ে যায় সেসব জায়গায় ব্যথা অনুভূত হয় । এটি মূলত একদিনে হয় না । চাপটি দীর্ঘস্থায়ী হলে এই ব্যথাটি দীর্ঘস্থায়ী হয়। প্রথমদিকে ব্যথা অল্প অনুভূত হয় । ধীরে ধীরে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথায় পরিণত হয় । ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া সাধারণত মুখমন্ডলের যে কোন একপাশে আক্রান্ত হয়।
ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া লক্ষণ সমূহ কি কিঃ
ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া এর প্রধান লক্ষণ হচ্ছে ব্যথা । এই ব্যথা তীব্র হয় এবং কেটে নেয়ার মত অনুভূত হয় । কোন কোন সময় এই ব্যথা ইলেকট্রিক শকের মত অনুভূত হয়। এই ব্যথা হঠাৎ করে আসতে পারে তবে কিছু ফ্যাক্টর আছে যেগুলো করলে ব্যথা হতে পারে হঠাৎ করে। যেমন মুখে স্পর্শ করা, মুখে কিছু খাওইয়া, কথা বলা্, দাঁত ব্রাশ করার সময়, মুখে বাতাস লাগলে অথবা কোন কাপড় বা হিজাবের অংশ মুখে লাগলেও ব্যথা হতে পারে। এই ব্যথাটি কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়ার ব্যথা বারে বারে আসতে পারে এবং সেক্ষেত্রে দিন সপ্তাহ মাস বা আরো অধিক সময় স্থায়ী হতে পারে । এই ব্যথাটি সাধারণত ট্রাইজেমিনাল স্নায়ুর শাখা-প্রশাখা যে সকল জায়গায় রয়েছে সে সকল জায়গায় অনুভূত হয়। যেমন কপোল,দাঁত, ঠোট, চোয়াল, চোখের উপরে ও নিচে এবং কপাল। এই ব্যথাটি প্রথম দিকে অল্প হলেও পরবর্তীতে তীব্র হয় এবং বারে বারে হতে পারে এবং দীর্ঘ সময় ধরে থাকতে পারে।
কি কি করলে ব্যথাটি আসতে পারেঃ
কথা বলা ও হাসা
মুখে কিছু নিয়ে চিবানো
দাঁত ব্রাশ করা
মুখ ধোয়া
মুখে হালকা স্পর্শ
মুখের সেভ করার সময়
চুমা দেয়ার সময়
মুখে বাতাস লাগলে
মুখে মেকআপ করার সময়
হাতের নাড়াচাড়ায় মুখে কোন কম্পন অনুভূত হলে বা কম্পন রত কোন বস্তুর স্পর্শ হলে
গাড়িতে বা যানবহনে ভ্রমণ করার সময় বাতাস লেগে ও এই ব্যথা অনুভূত হতে পারে
ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া কারণ কিঃ
ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া ব্যথার সঠিক কোনো কারণ এখন পর্যন্ত জানা সম্ভব হয়নি । তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ধারণা করা হয় ট্রাইজেমিনাল স্নায়ুতে চাপের কারণেই এই ব্যথা অনুভূত হয়।গবেষনায়ও দেখা গেছে ৯০ ভাগ ক্ষেত্রে স্নায়ুতে চাপের কারনেই এই ব্যথার সূত্র হয়। ট্রাইজেমিনাল স্নায়ুর এই চাপ দুইভাবে হতে পারে । এর উপর ভিত্তি করে এর কারণগুলোকেও দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে । প্রাথমিক কারণ বা প্রাইমারি নিউরালজিয়া গবেষণায় দেখা গিয়েছে গঠনগত কারণেই মূলত 95 ভাগ ব্যথা ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া হয় এক্ষেত্রে ট্রাইজেমিনাল স্নায়ুর বিভিন্ন শাখা প্রশাখা থেকে আমাদের মাথায় যে জায়গা বা ছিদ্র দিয়ে প্রবেশ করে সেখানে অন্যান্য রক্তনালীগুলো বাকা বা অস্বাভাবিক অবস্থানের কারণে ট্রাইজেমিনাল স্নায়ুতে চাপ তৈরি হয়। তবে এই প্রেসারের কারণে সকল মানুষেরই কিন্তু ব্যথা হয়না । কিছু নির্দিষ্ট মানুষের ক্ষেত্রে ব্যথা হয়। কেন এই নির্দিষ্ট শ্রেণীর মানুষের মধ্যে এই ব্যথা হয় সেটা এখন পর্যন্ত জানা যায় নি । স্নায়ুর উপর এই চাপ বিভিন্ন রোগের কারণেও হতে পারে যেমন এই স্নায়ুর আশেপাশে কোনো টিউমার থাকে অথবা কোন সিস্ট থাকে।নার্ভের এক ধরনের রোগ আছে যেটাকে বলা হয় মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস। এর জন্যও ব্যথা হতে পারে। মুখমন্ডলে কোন আঘাতজনিত কোনো কারণে এই ব্যথা অনুভূত হতে পারে । দাঁতের চিকিৎসার সময় নার্ভের কোন ইনজুরির কারণে এই ব্যথা হতে পারে।
কিভাবে ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া এই রোগটি নির্ণয় করা যায়ঃ
প্রথমত চিকিৎসকগণ (যারা ব্যথা নিয়ে কাজ করেন)এই ব্যথার প্রকৃতি, ধরন, স্থায়ীত্ব এবং ব্যথা কিভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে এই বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে ব্যথাটি নির্ণয় করেন যে এটি ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া কিনা । তবে এক্ষেত্রে কিছু কিছু রোগের কারণে যে ব্যথা হয় সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হয় যে অন্য কোনো কারণে এই ব্যথাটা হচ্ছে না । তার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে দাঁতের সমস্যা । যার এই ধরনের ব্যথা হয় তার দাঁতের সমস্যা আছে কিনা সেটি পরীক্ষা করে দেখে নিশ্চিত হতে হবে । ব্যথাটি সাথে মাইগ্রেন এর কোন সম্পর্ক আছে কিনা সেটিও চিকিৎসকগণ নির্ণয়ের জন্য বিবেচনা করে থাকেন। সাইনোসাইটিস এর সমস্যা আছে কিনা সেটিও পর্যালোচনা করে নিতে হয়। মুখ এবং গলায় কোন সমস্যা আছে কিনা বা মাথায় কোন সমস্যা আছে কিনা এটি দেখার একটি অন্যতম পরীক্ষা হচ্ছে এম আর আই। এই পরীক্ষার মাধ্যমে মুখমন্ডলে ও মাথায় কোন অন্য ধরনের সমস্যা বা টিউমার বা কোনো অস্বাভাবিকতা আছে কিনা সেটি নিশ্চিত হওয়া যায় । এছাড়াও এমআরআই এর মাধ্যমে রক্তনালীর কোন সমস্যা আছে কিনা সেটাও নিশ্চিত ভাবে বলা যায়।
ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া চিকিৎসা পদ্ধতি(প্রতিরোধ মূলক)
বেশ কিছু চিকিৎসা পদ্ধতি ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিইয়ায় ব্যবহৃত হয় তাদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা। যে সকল ফ্যাক্টর বা বিষয়ের সাথে ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া শুরু হওয়ার বা ব্যথা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে সেগুলো থেকে নিরাপদে চলা একটি অন্যতম পদ্ধতি।
মুখে বাতাস লেগে এব্যাথা টি শুরু হওয়া খুবই স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া তাই এটা থেকে বেঁচে থাকার জন্য মুখে স্কার্ফ ব্যবহার করা যেতে পারে এছাড়াও স্বচ্ছ ও ডোম এর মত ছাতা ব্যবহার করা যেতে পারে যেটা মুখে বাতাস লাগা থেকে রক্ষা করতে পারে।
আরো একটি পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে সেটা হচ্ছেঃ জানালার কাছে বসে না থাকা।
এছাড়াও আরো কিছু বিষয় রয়েছে যেমন গরম, অত্যাধিক ঝাল বা অত্যাধিক ঠান্ডা কোন পানীয় পান না করা।
যে সকল খাবার অধিক্ষণ চিবিয়ে খেতে হয় সে সকল খাবার এড়িয়ে চলা একটি কৌশল হতে পারে ।
এছাড়াও ক্যাফেইন(কফি), কলা, টক জাতীয্ ফল, খেলে অনেক সময় এই ট্রিগার হতে পারে। এ জন্য এগুলো বাদ দিয়ে চলাই ভালো।
আক্রান্ত হওয়ার পর এর চিকিৎসাঃ
ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া আক্রান্ত হলে যে চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় তার মধ্যে প্রথমেই আসে মেডিকেল চিকিৎসা। মেডিকেল চিকিৎসায় বেশ কিছু ঔষধ ব্যবহার করা হয়। সে ক্ষেত্রে বেশ কিছু সাইড ইফেক্ট হতে পারে। তাই গবেষকগন বলেছেন প্যারাসিটামল সবচেয়ে ইফেক্টিভ ও নিরাপদ একটি ব্যথার ঔষধ। তবে ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া্য এই প্যারাসিটামল অনেক সময় কাজে নাও লাগতে পারে। ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া স্নায়ুর উত্তেজনা কমানোর জন্য বেশ কিছু ওষুধ ব্যবহার করা হয় তাদের মধ্যে প্রথম দিকে কার্বামাজিপাইন অথবা অক্সি কার্বামাজিপাইন এ জাতীয় ঔষধ ব্যবহার হয়। গাবাপেন্টিন ,প্রিগাবালিন,ব্যাকলোফেন্, লোপেরামাইড ইত্যাদি ওষুধ ব্যবহার হয়ে থাকে। তবে সেসব ক্ষেত্রে ঘুমের সমস্যা, দুর্বলতা, মাথা ঘুরানো এবং কাজে মনোযোগ হীনতা্, কনফিউশন , চোখে দুটি দেখার মত সমস্যা হতে পারে।এজন্য অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ঔষধ সেবন করতে হবে।
ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া চিকিৎসায় ইন্টারভেনশন
এটি ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া ব্যথা কমানোর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকরী একটি পদ্ধতি। সঠিকভাবে পদ্ধতির প্রয়োগ করা হলে অনেকাংশেই ব্যথা নিরাময় করা সম্ভব। ইন্টারভেনশন গুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে
রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি থার্মোকোয়াগুলেশন,
বেলুন কম্প্রেশন,
পারকিউটেনিয়াস গ্লিসারোল ইনজেকশন।
এসকল ইন্টারভেনশন এ গবেষণায় দেখা গিয়েছে 90 ভাগের মতো রোগী ব্যথা কমে যায়। সম্প্রতি একটি গবেষণায় বলেছে ৯৬% এলকোহল ইনজেকশন দিলে ১৩ থেকে ১৫ মাস ব্যথা মুক্ত থাকা যায়। পদ্ধতিটি কয়েকবার করা গেলে ব্যথা নিরাময় করা সম্ভব। এছাড়াও অপারেশন জনিত চিকিৎসা আছে যেগুলো ঝুঁকিপূর্ণ ও আমাদের দেশে এই ধরনের অপারেশনও সাধারণত হয় না। তাই ইন্টারভেনশন চিকিৎসা খুবই কার্যকরী ও সহজেই করা সম্ভব। দিনে দিনেই করা সম্ভব। সাথে সাথেই রুগীরা এর ফলাফল বা ব্যথা নিরাময় অনুভব করতে পারেন। এতে তেমন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াও নেই।
শেষ কথাঃ
ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়ার ব্যথায় যারা ভূগছেন তারা শারীরিক ভাবে যেমন কষ্টে থাকেন তেমনি মানসিক ভাবে থাকেন বিপর্যস্ত। অনেকেই ভ্রান্ত ভাবে তাদের মানসিক ভাবে সমস্যাগ্রস্থ বলেও অবিহিত করে থাকেন যেটা কোন ভাবেই সঠিক না। কেউ যখন ব্যথার কষ্টে থাকেন তিনি বুঝেন যে তার কি কষ্ট। এই বিষয়টি অবহেলিত থাকে অনেকের কাছে। আজকের লেখায় তাই এই বিষয়ে ধারনা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে যাতে আমরা বুঝতে পারি আসলেই আমরা সমস্যাগ্রস্থ কিনা। তাহলে সঠিক চিকিৎসা নিতে পারব আমরা সবাই। সবাই ভালো থাকুন সুস্থ্য থাকুন এই প্রত্যাশায় শেষ করছি।
ডাঃ মোহাম্মদ আহাদ হোসেন
এমবিবিএস, বিসিএস, এমডি, এফআইপিএম (ইন্ডিয়া)
সহকারী অধ্যাপক ও ব্যথা বিশেষজ্ঞ
ঢাকা মেডিকেল কলেজ
সিরিয়াল ও সকল ধরনের যোগাযোগের জন্য
ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টার লালবাগ ঢাকা
বিসিআর ডায়াগনস্টিক সার্ভিস, কাঁটাবন, +8801958060777
#পেইনট্রিটমেন্ট