27/08/2025
গাণপত্য মত সম্পর্কে একটি ভ্রান্ত ধারণা হল যে মহাগণপতি হলেন গাণপত্যদের পরমেশ্বর বা গণপতির সমস্ত রূপের উৎস।
এই কথা সত্য নয়। যদিও গাণপত্যরা দেবতাদের শ্রেণিবিন্যাসে বিশ্বাস করেন না, তবুও গাণপত্যদের এই মূর্তিভেদের একটি শ্রেণি রয়েছে:
1. স্বানন্দেশ গণপতি:
ইনি হলেন একাক্ষর গণপতি, বা মূল-ভূত বিনায়ক। ইনি হলেন ব্রহ্মণস্পতি (ব্রহ্মের যাবতীয় প্রকাশের অধিপতি)। ইনি সর্বশ্রেষ্ঠ, কিন্তু একজন দেবতা হিসেবে নয়, বরং ইনি সর্বশ্রেষ্ঠ কারণ ইনিই সর্ববিধ অস্তিত্ত্বের সত্তা। ইনি স্বয়ং তত্ত্বমসি মহাবাক্য। ইনিই সমস্ত গণপতির একক উৎস, সেইসাথে সমস্ত সত্তার সত্তা। এই তত্ত্ব মুদ্গল পুরাণ, গণেশ পুরাণ, বিনায়ক তন্ত্র, মেরু তন্ত্র এবং বিনায়ক রহস্যে বিবৃত, প্রমাণিত এবং সুপ্রতিষ্ঠিত।
2. বক্রতুণ্ড:
একার্ণ স্বানন্দেশ গণপতির ঠিক পরে, বক্রতুণ্ডের স্থান। গাণপত্য ধর্মতত্ত্ব অনুসারে, একাক্ষর/স্বানদেশ হলেন ঈশ্বর, জীব এবং জগতের সম্মিলিত অবয়ব, তবুও ইনি এসবের ঊর্দ্ধে। কিন্তু বক্রতুণ্ড শুধুমাত্রই ঈশ্বর। একাক্ষর হলেন নির্গুণ (নিরাকার), আর বক্রতুণ্ড হলেন সগুণ (সাকার)। বক্রতুণ্ড ইচ্ছা, জ্ঞান এবং ক্রিয়া শক্তির প্রভু। ইনি এই মহাবিশ্ব রচনার জন্য এই শক্তিসমূহের প্রয়োগ করেন।
3. শ্বেত গণপতি বা শারদেশ:
ইনি বক্রতুণ্ডের সেই মূর্তি যা ভগবান বক্রতুণ্ডের জ্ঞান শক্তির প্রতিনিধিত্ব করে। তাই ইনি সরস্বতীপ্রধান। এই রূপের মাধ্যমে ভগবান বক্রতুণ্ড সৃষ্টির ধারণা করেন।
4. মহাগণপতি:
ইনি বক্রতুণ্ডের ক্রিয়া-শক্তি প্রধান মূর্তি। এই রূপের মাধ্যমে ভগবান বক্রতুণ্ড সৃষ্টিতে অংশ নেন। তাই ইনি লক্ষ্মীপ্রধান। গাণপত্য ধর্মতত্ত্ব অনুসারে, সিদ্ধিলক্ষ্মী হলেন ক্রিয়া শক্তি, এবং বুদ্ধিসরস্বতী হলেন জ্ঞান শক্তি। বিনায়কী মহামায়া/ময়ূরী হলেন ইচ্ছা শক্তি। বক্রতুণ্ড এই সমস্ত শক্তির স্বামী। কিন্তু, শ্বেত কেবল সরস্বতীর অধিকারী এবং মহাগণপতি কেবল লক্ষ্মীর অধিকারী। ইচ্ছা উচ্ছিষ্ট গণপতির অধীনে।
5. উচ্ছিষ্ট গণপতি:
গণপতির এই রূপটি সমস্ত গণপতির সারতত্ত্ব (উৎস নয়। উৎস শুধুমাত্র স্বানন্দেশ-একাক্ষর)।
মুদ্গল পুরাণ এবং বিনায়ক তন্ত্র বর্ণনা করে যে, ভগবান বক্রতুণ্ড এই সৃষ্টির সৃষ্টির জন্য পঞ্চ-দেবতাদের (ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ, সূর্য এবং শক্তি) নিযুক্ত করার পর, তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব বেঁধে যায় যে, কে কার চেয়ে বড়। এই অহংকার তাঁদের সৃষ্টিকর্মে বিঘ্ন উৎপাদন করে।
তাই, ভগবান বক্রতুণ্ড তাদের ভিত্তিহীন দম্ভ থেকে তাঁদের মুক্ত করার জন্য তাঁদের সম্মুখে একটি শিশুরূপে আবির্ভূত হন। বক্রতুণ্ডের এই শিশুরূপী মানসমূর্তি উচ্ছিষ্ট (উৎকৃষ্টের অবশিষ্ট) নামে পরিচিত হয়।
গণপতির এই রূপটি ইচ্ছাশক্তির অধিপতি, যিনি স্বয়ং মহামায়া। গাণপত্যদের মতে এই দেবীর অনেক নাম রয়েছে, তবুও ময়ূরী, বিনায়কী, বিঘ্নেশ্বরী এবং নীল সরস্বতী তাঁর প্রধান নাম বা মূর্তি।
স্বানন্দেশ স্বানন্দ-লোকে বাস করেন, যেখানে তাঁর নিজের ২১৬টি রূপ রয়েছে, যাঁরা সর্বদা তাঁর সাথে বিহার করে থাকে। সিদ্ধি ও বুদ্ধি তাঁর দুই পত্নী। সিদ্ধি হলেন প্রকৃতি, আর বুদ্ধি হলেন পুরুষ। এই শক্তিদ্বয়ের স্বামীরূপে গণপতি সমস্ত দ্বৈতত্বের উর্ধ্বে।
বক্রতুণ্ডেরও পত্নী হিসেবে সিদ্ধি এবং বুদ্ধি (স্বানন্দ-সিদ্ধি এবং স্বানন্দ-বুদ্ধির সগুণ অবতার)। ইনি চিন্তামণি-দ্বীপে বাস করেন। এখানে ভগবান বক্রতুণ্ডের নিজস্ব ২১৬টি রূপ রয়েছে।
মহাগণপতি শক্তি-লোকে বাস করেন। হ্যাঁ, শুনতে বিস্ময়কর হলেও, বিনায়ক রহস্য অনুসারে মহাগণপতি মণিদ্বীপে বাস করেন। তাঁর প্রাসাদটি স্বানন্দ-ভবন নামে পরিচিত, তবে রাজ্যটি মণিদ্বীপ। ইনি তাঁর নিজের ২১৬টি রূপ নিয়ে এই ধামে বিরাজ করেন। তাঁর শক্তি হলেন সিদ্ধি-লক্ষ্মী বা বল্লভা (চিন্তা-সিদ্ধির অবতার এবং ঋষি মরীচির কন্যা)।
শ্বেত গণপতি ব্রহ্ম-লোকে বাস করেন। তাঁর প্রাসাদ চিন্তামণি-ভবন নামে পরিচিত। তাঁর নিজস্ব ২১৬টি রূপ রয়েছে। তাঁর পত্নী হলেন সারদা-সরস্বতী, (ঋষি অঙ্গিরার কন্যা এবং চিন্তা-বুদ্ধির অবতার)।
উচ্ছিষ্ট গণপতি উচ্ছিষ্ট পুরমে বাস করেন। এটি বক্রতুণ্ডের চিন্তামণি-দ্বীপে অবস্থিত। তাঁর নিজস্ব ২১৬টি রূপ রয়েছে এবং ইনি সর্বদা নীল-সরস্বতীর সাথে অবস্থান করেন। এটিই একমাত্র স্থূল ধাম যা প্রলয়ের পরেও অবশিষ্ট থাকে।
প্রলয়কালে যখন স্বানন্দ-লোক অন্য সমস্ত ধামকে নিজের মধ্যে লীন করে নেয়, এবং নিজ নিত্য ধাম স্বানন্দলোককেও স্বানন্দেশ নিজের সুষুপ্তিতে অন্তরীন করে নেন, তখন শুধুমাত্র উচ্ছিষ্ট গণপতি তাঁর এই সমস্ত লীলার সাক্ষী হিসাবে জাগ্রত থাকেন। ইনিই স্বানন্দেশের হৃদয়ে ইচ্ছাশক্তিকে জাগ্রত করেন, যা পরবর্তী সৃষ্টির উদ্ভব ঘটায়। এই কারণেই উচ্ছিষ্ট গণপতি মহাকাল নামেও পরিচিত, কারণ তিনি কালেরও কাল।
এখন, এই পঞ্চ বিনায়ক এবং তাঁদের ২১৬টি মূর্তি মিলে ১০৮৫টি বিনায়কের মূর্তি তৈরি করে যা সমগ্র গাণপত্য মন্ত্র ক্রম গঠন করে।
অথচ, এই সমস্ত রূপ কেবল এই কল্পের জন্যেই।
সংগৃহিত।।