10/11/2025
অর্ক ক্লাস এইটে পড়ে। চোখে এখনো শিশুসুলভ স্বপ্নের আভাস, কিন্তু তার বইয়ের পাতায় মন বসে না। সেদিন রাত্রে, বাবার সামনের ডেস্কে বসে বই খুলে বসেছিল। দু’মিনিটের মধ্যে বইয়ের জায়গা করে নিল ইনস্টাগ্রামের স্ক্রল। পরক্ষণেই গিটারটা হাতে তুলে নিল—নতুন একটা টিউন শিখেছে। তারও পাঁচ মিনিট পর মা ডাক দিল, “তুই পড়ছিস তো ঠিক করে?” সে যেন জেগে উঠে এল এক ঘোরের মধ্য থেকে।
“হ্যাঁ, পড়ছি তো,” বলে আবার বইয়ে চোখ রাখে। তবে মন পড়ে না—কারণ সে নিজেই জানে না, কেন পড়ছে।
এই গল্পটা শুধু অর্কর নয়। এটা ওইসব কিশোর-কিশোরীদের মস্তিষ্কের একটি টানেল ভ্রমণ—যারা হঠাৎ করেই পড়াশোনা থেকে মন সরিয়ে ফেলে, অথচ তারা বোকা নয়, অসৎ নয়, অলসও নয়।
🔹 মস্তিষ্কের নির্মাণকাল
আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান বলে, বয়ঃসন্ধিকাল হল মানুষের দ্বিতীয় জন্ম। প্রথম জন্ম শারীরিক, দ্বিতীয় জন্ম মানসিক।
এই সময়ে প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স, অর্থাৎ যুক্তি, পরিকল্পনা, মনোযোগ আর নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্র, নির্মাণাধীন থাকে। আবার লিম্বিক সিস্টেম, যেটা আবেগ, ঝুঁকি নেওয়া, আর তাৎক্ষণিক আনন্দের জন্য দায়ী—তা পূর্ণগতিতে সক্রিয়।
এই জটিল অবস্থায়, টেক্সটবুকের প্যারা পড়া, অংকের অদৃশ্য সূত্র খুঁজে পাওয়া বা ইতিহাসের রাজাদের নাম মুখস্থ করা—সব কিছুই হয়ে ওঠে একঘেয়ে, বিবর্ণ।
🔹 হরমোনের হুলস্থূল এবং ডোপামিনের খিদে
একবার একজন ছেলেকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, “তোমার পড়তে ভালো লাগে না কেন?”
সে উত্তর দিয়েছিল, “কারণ পড়লে মনে হয় যেন একঘেয়ে সিনেমা দেখছি, আর মোবাইলে ভিডিও দেখলে মনে হয় অ্যাকশন সিনেমা চলছে।”
এটা কোনও বাহানা নয়। বিজ্ঞান বলছে, বয়ঃসন্ধির সময় ডোপামিন রিসেপ্টর-এ পরিবর্তন হয়। ডোপামিনই আমাদের “আনন্দ” অনুভব করায়।
পড়াশোনা তখন আর আনন্দের উৎস নয়। বরং গান, ভিডিও, চ্যাট, মেমে—এসবই সে রস দিয়ে দেয়।
🔹 তাকে কে বলেছে সে কে?
এই বয়সে একটা মূর্ত প্রশ্ন ঘুরতে থাকে মনের ভিতরে:
“আমি কে?”
সে হয়তো ছোটবেলা থেকে ‘ভালো ছাত্র’ নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু এখন সে এই ট্যাগ থেকে বেরোতে চাইছে। হয়তো সে চায় চিত্রশিল্পী হতে, কিংবা কোডার, কিংবা মোটেই কিছু না হয়ে শুধু নিজেকে চিনতে চায়।
আপনি যদি তাকে জিজ্ঞেস করেন, “এত পড়ছো না কেন?”
সে হয়তো বলবে, “আমি জানি না।”
আর ঠিক এই “জানি না”-র মধ্যে দিয়েই একটা নতুন মানুষ জন্ম নিচ্ছে—যার জন্ম ব্যথাহীন নয়।
🔹 ঘুমে বিঘ্ন আর শরীরের লড়াই
রাতে পড়তে বসলে চোখে ঘুম আসে না। সকালে উঠতে পারে না। কারণ তার সার্কেডিয়ান রিদম (দৈনিক ঘুমের ঘড়ি) ২ ঘণ্টা পিছিয়ে যায় এই বয়সে।
তবুও স্কুল সকাল আটটায় শুরু হয়। ফলাফল? সে ক্লাসে বসে থাকলেও, মস্তিষ্ক তখন ঘুমিয়ে আছে।
🔹 সামাজিক চাপ আর “দেখে রাখিস” সংস্কৃতি
পাশের বন্ধু ফেসবুকে নতুন শার্ট পরে ছবি দিচ্ছে, কেউ প্রেম করছে, কেউ ভিডিও এডিট করছে, কেউ গান গাইছে—এসব কিছু তাকে বলে দেয়, “তুই কোথায় পিছিয়ে আছিস।”
এই হীনমন্যতাই আবার পড়ার প্রতি একরকম বিতৃষ্ণা তৈরি করে। কারণ, সেখানে সে নিজেকে “কিছু না” মনে করে।
🔹 শেষ কথা: সে অলস নয়, সে রাস্তায় হাঁটছে
তিন বছর আগে যার পছন্দ ছিল ছবি আঁকা,বা নাচ করা বা গান শেখা সে আজ চুপচাপ দেয়ালে তাকিয়ে থাকে। আপনি ভাবছেন—সে কিছুই করছে না।
কিন্তু সে আসলে নিজের ভেতরের একটা ঘূর্ণিপাকে আটকে আছে।
কখনো সেটা অবসাদ, কখনো আত্মদ্বন্দ্ব, কখনো ভবিষ্যতের ধোঁয়াটে ভয়।
✅ এ অবস্থায় বাবা-মা যা করতে পারেন:
ওকে বোঝানোর বদলে শোনার চেষ্টা করুন।
পড়াশোনা বাদ দিয়ে ছোট কাজে জয় আনতে দিন (যেমন: রান্না, সাজানো, গান শোনা, লিখে ফেলা)।
ওর মনোযোগের ধরন বুঝে আলাদা স্টাডি রুটিন তৈরি করুন।
প্রয়োজনে একজন কাউন্সেলর বা শিশু মনোবিদের সাহায্য নিন—এটা লজ্জার নয়, সচেতনতার প্রমাণ।
চেকভ বলেছেন, “A man is what he believes.”
এই বয়সে তারা নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। আপনি যদি বিশ্বাস রাখেন, তবেই সে একদিন নিজের মধ্যে বিশ্বাস ফিরিয়ে আনবে।