29/01/2026
মৃত্যু কি তাহলে জিনের ব্যর্থতা,
নাকি আগে থেকেই লেখা কোনো প্রোগ্রামের শেষ লাইন?
এই প্রশ্নটা আমরা সাধারণত করি না।
কারণ প্রশ্নটা করলেই একটা অস্বস্তি আসে।
যেন সিস্টেমের ভেতরের কোড দেখতে চাওয়া হচ্ছে।
আমরা বরং সহজ করে বলি—
“বয়স হয়ে গেছে।”
“সময় এসে গেছে।”
“শরীর আর সাপোর্ট দিচ্ছে না।”
কিন্তু সত্যি করে ভাবলে,
বয়স তো ক্যালেন্ডারে বাড়ে।
কোষ তো ক্যালেন্ডার দেখে না।
কোষ বোঝে—
সে কতবার স্ট্রেস পেল,
কতবার ঠিকমতো বিশ্রাম পেল,
কতদিন ধরে সে নিজেকে মেরামত করার সুযোগ পেল না।
আধুনিক বিজ্ঞান এখানে এসে একটা খুব অস্বস্তিকর কথা বলেছে—
আমাদের শরীর আসলে ভেঙে পড়ে না।
আমাদের শরীর ধীরে ধীরে কাজ করা বন্ধ করে দেয়।
এবং এটা হয় কোনো দুর্ঘটনায় না।
হয় একটার পর একটা ভুল সিগন্যালের কারণে।
তুমি নিশ্চয়ই টেলোমেয়ারের কথা শুনেছো।
ডিএনএ-র মাথায় থাকা সেই ছোট্ট ক্যাপ,
যেটা প্রতিবার কোষ বিভাজনের সময় একটু করে ছোট হয়।
বিজ্ঞান এটাকে বলে— replicative aging।
কিন্তু বেদ একে বলত—
প্রাণের ক্ষয়।
বেদে কখনো বলা হয়নি
শরীর হঠাৎ বুড়িয়ে যায়।
বলা হয়েছে—
যখন প্রাণ ঠিকভাবে প্রবাহিত হয় না,
তখন দেহ নিজেকে ধরে রাখতে পারে না।
Prana মানে শুধু শ্বাস না।
Prana মানে নির্দেশনা শক্তি।
যেখানে prana সুষম,
সেখানে কোষ জানে কখন জন্ম নিতে হবে,
কখন থামতে হবে,
কখন নিজেকে রিসাইকেল করতে হবে।
এখন আসি একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়—
সবাই কেন সমানভাবে বুড়ো হয় না?
একজন ৭০ বছর বয়সেও তাজা,
আর একজন ৪০-এই ক্লান্ত, ভেঙে পড়া।
জিনের দোষ?
বিজ্ঞান বলছে— না।
মোটামুটি ২০%।
বাকি ৮০% হলো epigenetics—
মানে জিনের ওপরে বসে থাকা নির্দেশ।
এটা ঠিক যেন তোমার ফোনটা একই মডেল,
কিন্তু একটার সফটওয়্যার আপডেটেড,
আরেকটায় ভাইরাস ঢুকে গেছে।
এই ভাইরাস কী?
দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তা।
ভাঙা ঘুম।
অপ্রসেসড আবেগ।
সবকিছুকে কন্ট্রোল করার চেষ্টা।
বেদ একে বলেছে— রাজসিক ও তামসিক প্রবাহ - energy flow।
যখন মন সারাক্ষণ ভবিষ্যৎ আর অতীতের মধ্যে ছুটে বেড়ায়,
তখন শরীর বর্তমানের নির্দেশ পায় না।
ফলে কোষ ধরে নেয়—
“এই সিস্টেম আর রক্ষণাবেক্ষণ পাচ্ছে না।”
এখানেই আসে apoptosis—
যাকে আমরা বলি programmed cell death।
খেয়াল করো শব্দটা— programmed।
মানে মৃত্যু কোনো ভুল না।
এটা একটা কোড।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—
এই কোড কি ঠিক সময়ে রান হচ্ছে,
নাকি আমরা নিজেরাই ভুল কমান্ড পাঠাচ্ছি?
অতিরিক্ত স্ট্রেস মানে শরীরকে বলা—
“সবসময় জরুরি অবস্থা।”
এই অবস্থায় শরীর রিপেয়ার মোডে যেতে পারে না।
বিপরীতে,
গভীর ঘুম,
নীরবতা,
উপবাস,
ধ্যান—
এইগুলো শরীরকে বলে—
“সময় আছে। মেরামত করো।”
এখানেই অটোফ্যাজির কথা আসে।
কোষের নিজের আবর্জনা পরিষ্কার করার প্রক্রিয়া।
বেদে একে বলা হয়েছে—
শৌচ অন্তর।
ভেতরের পরিষ্কার।
কিন্তু আমরা চাই—
খেতে খেতে, দৌড়াতে দৌড়াতে,
নয়েজের ভেতরে বসেই হিলিং হোক।
হয় না।
এখন আসি সবচেয়ে বড় প্রশ্নে।
মৃত্যু কি শেষ,
নাকি অন্য কোনো ডাইমেনশনে যাওয়া?
বেদ এখানে খুব পরিষ্কার।
মৃত্যু মানে সমাপ্তি না।
মৃত্যু মানে ট্রানজিশন।
উপনিষদে বলা হয়—
যেমন মানুষ পুরোনো পোশাক ফেলে নতুন পোশাক পরে,
তেমনই আত্মা দেহ পরিবর্তন করে।
আধুনিক ভাষায় বললে—
হার্ডওয়্যার বদলায়, সফটওয়্যার না।
কিন্তু ডাইমেনশন কথাটা গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ বেদ বলে—
মৃত্যুর পর আত্মা কোথায় যাবে,
তা নির্ভর করে সে কোন ফ্রিকোয়েন্সিতে ছিল।
এই ফ্রিকোয়েন্সি তৈরি হয়—
সারাজীবনের অভ্যাস,
ভাবনা,
ভয়,
আসক্তি দিয়ে।
এটা অনেকটা রেডিওর মতো।
যে স্টেশনে টিউন করা,
সেখানেই সিগন্যাল যাবে।
এই কারণেই তন্ত্র আর যোগে এত জোর দেওয়া হয়—
চেতনার অবস্থার ওপর।
মৃত্যুর মুহূর্ত কোনো আকস্মিক ঘটনা না।
ওটা একটা ফাইনাল সেভ পয়েন্ট।
যে সারাজীবন নিজের ভেতরে থেকেছে,
সে মৃত্যুতেও ভেতরেই যায়।
যে সারাজীবন বাইরের ওপর নির্ভর করেছে,
সে মৃত্যুতেও বাইরের দিকেই ছিটকে পড়ে।
এই জন্যই বেদ বলে—
মৃত্যু শেখানো যায় না,
কিন্তু মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকা যায়।
আর এই প্রস্তুতি শুরু হয় জীবন থেকেই।
শেষ কথা খুব সোজা।
জিন হয়তো শরীরের কাঠামো দিয়েছে।
কিন্তু শরীর কতদিন টিকবে,
কীভাবে টিকবে,
আর কীভাবে ছাড়বে—
এই সিদ্ধান্ত নেয় চেতনা।
মৃত্যু কোনো শাস্তি না।
বার্ধক্য কোনো অভিশাপ না।
কিন্তু অবহেলা—
সেটা একটা পছন্দ।
শরীর একটা মেশিন না।
এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া।
তুমি যত সচেতনভাবে থাকো,
শরীর ততদিন তোমার সাথে থাকে।
আর যখন যাওয়ার সময় আসে—
তখন মৃত্যু দরজা বন্ধ করে না।
দরজা খুলে দেয়।
~ সংগৃহীত