11/10/2019
"বিতর্কে আয়ুর্বেদ, আয়ুর্বেদে বিতর্ক"
রক্তবস্তি,গোমূত্র,গর্ভসংস্কার,জলৌকা চিকিৎসা,হেভি মেটাল ইত্যাদি নানা বিষয়ে বিতর্ক জড়িয়ে একপ্রকার ভ্রান্ত ধারনার অপপ্রচারে আয়ুর্বেদ কে দূষিত করার এক ঘৃণ্য প্রচেষ্টা বেশ মুখরোচক হয়ে উঠেছে দিন দিন।
যেখানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রমান করার মরিয়া চেষ্টা চলছে যে আয়ুর্বেদ চিকিৎসার এই দিকগুলো যথেষ্ট অবৈজ্ঞানিক ও ভয়াবহ।
এসবের মূলে উক্ত বিজ্ঞানের প্রতি নিন্দুকের চরম অজ্ঞতা ও স্বল্পজ্ঞান যে ভীষনভাবে দায়ী তা কয়েকটা বিজ্ঞানভিত্তিক উদাহরনেই স্পষ্ট।
যেমনঃ
১.গোমূত্র:
আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে পঞ্চগব্যর (গোদুগ্ধ,গোঘৃত,গোদধি,গোময়,গো মূত্র) ব্যাবহার সুদীর্ঘকাল যাবৎ যথেষ্ট ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করে আসছে।
কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে হঠাৎই এসবের মধ্যে থেকে গোমূত্র নিয়ে বিড়ম্বনার সূত্রপাত।
ভারতীয় আবেগে কোনোভাবে ধর্ম জুড়ে দিলেই রাজনৈতিক সমীকরন যে কেল্লাফতে হয় তা সকলেরই জানা। সেই কুসূত্র প্রয়োগ হলো আয়ুর্বেদে। একশ্রেণীর কাছে জনবিদ্বেষ তৈরি করতে প্রচার করা হলো "গোমূত্র" বন্দনার স্বঘোষিত সনাতনী কারন।
কিন্তু জ্ঞানের অভাবে বলা হলোনা যে আয়ুর্বেদের শ্রেষ্ঠ চিকিৎসা গ্রন্থ চরক সংহিতার সূত্রস্থানের দ্বিতীয় অধ্যায় "অপমার্গতন্ডুলীয়" অধ্যায়ে ৩০ নং শ্লোকে ২৩তম যবাগু(বিষমজ্বরনাশিনী) বর্ণনায় গো-মাংসের ব্যাবহারও উল্লেখ আছে।
বলা হলোনা গোমূত্র নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে অগণিত গবেষণার কথা।
বলা হলোনা গোমূত্রের রাসায়নিক উপাদান ও তার গুণাবলীর কথা।
এতএব এ থেকেই পরিষ্কার কি সত্য ও কি গুজব।
২.রক্তবস্তি:
রক্তবস্তি হলো একপ্রকার বিশেষ বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া যেখানে রোগীর প্রকৃতি,দেহবল,কোষ্ঠ, অগ্নিবল,নাড়ি পরীক্ষার উপর ভিত্তি করে আয়ুর্বেদ বিশেষজ্ঞের তত্বাবধানে ও রোগীর পূর্ন সমর্থনে বিশেষ রোগে আক্রান্ত রোগীর পায়ুদ্বার দিয়ে শোধিত রক্ত পরিমান মতো প্রবেশ করানো হয়।
যার কার্যক্ষমতা ও বৈজ্ঞানিক কারন জানতে ক্ষয়-বৃদ্ধি সূচক ও চরক সংহিতায় সূত্রস্থানের দীর্ঘনজীবতীয় অধ্যায়ের ৪৪ নং শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ বোঝা যথেষ্ট জরুরী।
যেভাবে প্রতিটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিজস্ব স্বতন্ত্র নীতিমালা আছে সেভাবেই "বস্তি চিকিৎসা" আয়ুর্বেদের এক শ্রেষ্ঠ শোধন প্রণালী। গুনের ভিত্তিতে চরক মতে এটি কায় চিকিৎসার "অর্ধ চিকিৎসা" বলা হয়ে থাকে।
এসবের বাইরে দাঁড়িয়ে রে রে রব তুলে গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে আয়ুর্বেদকে কালিমালিপ্ত করার অসাধু প্রচেষ্টা শুধু নিন্দনীয় নয় সুস্বাস্থ্যে রক্ষায় নব্য গবেষণার পথে একপ্রকার অন্তরায়।
৩.গর্ভসংস্কার:
এককথায় গর্ভসংস্কার শব্দের অর্থ হলো মায়ের
গর্ভ ধারণের পূর্বে ও গর্ভবতীকালীন অবস্থায় বিশেষ বিশেষ সংস্কার যার প্রভাবে জঠরস্থ ভ্রুন বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়।
যার সুবিস্তারিত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা সুশ্রুত সংহিতায় "শারীর স্থানে" উপলব্ধ।
যেমনঃ
মিউজিক থেরাপি বা সঙ্গীত চিকিৎসা।
সত্বগুন যুক্ত আহার সেবনে মানসিক প্রশান্তি।
বীরগল্প শ্রবণ,অঙ্ক কষা, বিভিন্ন রঙের সাথে মানসিক প্রতিবর্ত ক্রিয়া ও তার সুপ্রয়োগ ইত্যাদি।
৪.জলৌকা চিকিৎসা বা জোঁক থেরাপী:
কদিন আগেই এক সংবাদমাধ্যমে সম্প্রচারিত খবরের ভিত্তিতে জোঁক নিয়ে আলোচনায় উঠে আসলো বেশ কিছু ভ্রান্ত ধারণার প্রতিচ্ছবি।
রায়গঞ্জের এক ব্যাক্তি স্বেচ্ছায় জলে নেমে অবৈজ্ঞানিক ভাবে জোঁক দিয়ে প্রায়ই তার ক্ষতস্থানের রক্তপান করতেন।
ব্যস মিডিয়ায় মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসক বন্ধুরা উগরে দিলেন বিষোদগার।
ভুল ছিলো সেই বাক্তিটির কিন্তু তারা পুরো জলৌকা চিকিৎসকেই দোষী করে ফেললেন। গুজব ছড়ালো জোঁক চিকিৎসা নিয়ে।
আসল সত্য হলো, এই জলৌকা চিকিৎসা
আয়ুর্বেদ মতে রক্তমোক্ষণ প্রক্রিয়ার একটি বিশেষ প্রক্রিয়া। যেখানে সবিষ-নির্বিষ জোঁক নির্বাচন করে রোগীর শারীরিক অবস্থা,রোগের প্রকৃতির উপর নির্ভর করে আয়ুর্বেদ চিকিৎসকেরা সেটির ব্যাবহার করে থাকেন যা বৈজ্ঞানিক,গবেষণালব্ধ ও আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত।
৫. ভারী ধাতু (পারদ,সোনা, রূপা, হীরা ইত্যাদি) ঘটিত আয়ুর্বেদ ওষুধ নাকি ক্ষতিকর?
আয়ুর্বেদ ওষুধ বিজ্ঞান নীতিমালার সূত্রে রসঔষধির অন্তর্ভুক্ত"ভস্ম" বলে একটি প্রক্রিয়া আছে যা বিশেষ তাপমাত্রায় ও বিশেষ বিশেষ পুটপাকের মাধ্যমে তৈরি হয়ে থাকে। তারপর সেটি বেশ কয়েকটি গুনমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তবেই ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
এছাড়াও কোন রোগে ও কোন কোন রোগীকে এটি দেওয়া যাবে কদিন দেওয়া যাবে, কি অনুপান ও সহপানে দেওয়া যাবে, উক্ত ওষুধ সেবনকালে কি পথ্য উপকারী তা একজন আয়ুর্বেদ চিকিৎসক ঠিক করে থাকেন।
তাই সোনা, রুপা,পারদ,হীরা ঘটিত আয়ুর্বেদ ঔষধ চিকিৎসকের পরামর্শে সেবন হিতকারী, অন্যথায় ক্ষতির সম্ভাবনা প্রবল।
৬.১০০% গারেন্টি মার্কা আয়ুর্বেদ বিজ্ঞাপন কতটা যুক্তিযুক্ত?
একেবারেই অযৌক্তিকর।
কেননা রোগী দেখার পূর্বে ও রোগের তীব্রতা না জেনেই কোনোদিনই কোনও চিকিৎসাবিজ্ঞানেই সম্পূর্ণ সুস্থতার দাবি জানানো হয় না।
কারন সাধ্য-অসাধ্য বলে চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটা ব্যাপার আছে যা এ জাতীয় ভ্রান্ত প্রচার সর্বদা গোপন করে থাকে এবং কেবলমাত্র নিজেদের মুনাফার কথা ভাবে।
৭.এরাজ্যে আয়ুর্বেদ সমন্ধীয় কোনও অভিযোগ ও তথ্য জানতে গেলে সরকারী স্তরে কোথায় যোগাযোগ করা যেতে পারে?
এক্ষেত্রে সল্টলেক সেক্টর ফাইভে স্বাস্থ্য ভবনের ছয় তলায় "ডাইরেক্টর অফ আয়ুর্বেদা" কে সরাসরি জানাতে পারেন।
রাজ্যের যে কোনও আয়ুর্বেদ চিকিৎসকের ডিগ্রী ও রেজিস্ট্রেশন নিয়ে বিশদ জানতে পূর্ত ভবনে "পশ্চিমবঙ্গ আয়ুর্বেদ পরিষদ" এ যোগাযোগ করে বা অনলাইনেও রেজিস্ট্রেশন নাম্বার দিয়ে বিস্তারিত জানা যায়।
(কলমে: ডাঃ বিশ্বজিৎ ঘোষ)
১১/১০/১৯