03/12/2025
চিরশ্রী ও রূপকের (নাম পরিবর্তিত) গল্প।
কাল এই প্রথম চিরশ্রীকে হাসতে দেখলাম।
এই হাসিটা যেন আলো হয়ে ঘর ভরে দিল—একটা পরিপূর্ণতার, শান্তির, আর অবশেষে স্বস্তির হাসি।
চিরশ্রী আর রূপক প্রথম এসেছিলেন চেম্বারে প্রায় দেড় বছর আগে।
তখনও তাঁদের মুখে সেই ব্যর্থতার ছায়া— ২০১৯ এ আইভিএফ হয়েছে, দু’বারই এমব্রিও ট্রান্সফার, কিন্তু ফলাফল শূন্য। আইভিএফ করার কারণ ছিল চিরশ্রীর দুই টিউবই ব্লক।
২০১৯-এর পর তাঁরা চিকিৎসা বন্ধ রেখেছিলেন, কারণ একের পর এক শারীরিক সমস্যা দেখা দিচ্ছিল তাঁর।
চিরশ্রী বললেন, “ডাক্তারবাবু, এখন আমার ডায়াবেটিস হয়েছে।”
বললাম, “তাহলে আগে এটাকে কন্ট্রোল করতে হবে। খালি পেটে সুগার ১০০-র নিচে, খাওয়ার পরে ১২০-র নিচে, আর HbA1C ৬.৫% এর নিচে রাখতে হবে। এন্ডোক্রিনোলজিস্টকে দেখান, প্রয়োজনে ইনসুলিন নিতে হতে পারে—প্রেগন্যান্সিতে তো প্রায়ই লাগে। চোখের ডাক্তার দেখিয়ে নিন, রেটিনা ঠিক আছে কিনা দেখবেন। ইউরিন ও রক্ত পরীক্ষা করিয়ে কিডনির অবস্থাও জানতে হবে। আর হার্টের পরীক্ষা করানো জরুরি।”
“হার্ট?”—আমি বলতেই তিনি একটু চুপ করলেন। তারপর শান্তভাবে বললেন, “২০২০ সালে আমার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল, তিরিশ বছর বয়সে। এনজিওপ্লাস্টি হয়েছে, এখন অনেক ওষুধ খাই।”
থেমে গেলাম। ভাবলাম এই বয়সেই?
বললাম, “তাহলে কার্ডিওলজিস্টের সঙ্গে কথা বলতে হবে। প্রেগন্যান্সিতে হার্টের উপর চাপ বাড়ে, আপনি ফিট কিনা, সেটি নিশ্চিত হওয়া দরকার। অনেক ওষুধই প্রেগন্যান্সিতে দেওয়া যায় না।”
তিনি মাথা নাড়লেন, “ঠিক আছে, আমরা কথা বলব।”
তারপর এল আরেকটা ধাক্কা।
চিরশ্রী বললেন, “২০২২ সালে আমার পায়ে রক্ত জমে গিয়েছিল—Deep Vein Thrombosis। তখন হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। এরপর থেকে ওয়ারফারিন খাচ্ছি, রক্ত তরল রাখার জন্য।”
বললাম, ওয়ারফারিন প্রেগন্যান্সিতে দেওয়া যায় না।
আরও পরীক্ষা করে জানা গেল, তাঁর শরীরে প্রোটিন S ডেফিসিয়েন্সি আছে—যে প্রোটিন রক্ত তরল রাখতে সাহায্য করে, তার ঘাটতি থাকলে রক্ত সহজেই জমাট বাঁধে।
এটা জন্মগত সমস্যা।
বললাম, “দুটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে—প্রথমত, প্রেগন্যান্সির আগে হেমাটোলজিস্টকে দেখাতে হবে, ওয়ারফারিন বন্ধ করে হেপারিন ইনজেকশন শুরু করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রেগন্যান্সিতে শরীরে এমনিতেই রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বাড়ে। প্রকৃতি চায় তখন মায়ের শরীর থেকে রক্ত কম বেরোক, তাই সবারই রক্ত জমাট বেঁধে যেতে পারে। কিন্তু এতে যাঁদের প্রোটিন S-এর ঘাটতি আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি অনেক বেশি।”
তারপর ধীরে বললাম, “আপনার রিস্কগুলো ভেবে দেখুন। এত কিছুর পরও প্রেগন্যান্সি নেওয়া ঠিক হবে কিনা ভাবা দরকার।”
চিরশ্রী চুপ করে থেকে বললেন, “ডাক্তারবাবু, এত কিছু হওয়ার পরেও রূপক কিন্তু আমাকে ছেড়ে যায়নি। ও আমাকে সবসময় সাপোর্ট করেছে। ওর খুব ইচ্ছে বাবা হওয়ার। আমি জানি, ওরও একটা স্বপ্ন আছে, আমি চাই সেটা পূরণ হোক।”
তাঁর চোখে তখন দৃঢ়তা আর ভালোবাসার মিশেল।
বললাম, “ঠিক আছে, তবে সব বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করেই এগোবো।”
এরপর একে একে তিনজন ডাক্তার দেখানো হলো—এন্ডোক্রিনোলজিস্ট, কার্ডিওলজিস্ট, হেমাটোলজিস্ট।
হেমাটোলজিস্ট বললেন, “ওয়ারফারিন বন্ধ, এখন থেকে হেপারিন ইনজেকশন শুরু করুন।”
কার্ডিওলজিস্ট বললেন, “ওষুধগুলো চেঞ্জ করে দিচ্ছি। প্রেগন্যান্সিতে আবার রিভিউ করতে হবে, তিন মাস অন্তর অন্তর আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন।”
এন্ডোক্রিনোলজিস্ট বললেন, “এখনকার মতো ট্যাবলেট চলবে, কিন্তু প্রেগন্যান্সি পজিটিভ হলেই ইনসুলিন শুরু করতে হবে।”
চিরশ্রীর বাকি রিপোর্টগুলোও ভালো এল। কিন্তু এবার দেখা গেল, রূপকের সিমেন রিপোর্ট খুব খারাপ।
আমি ভেবেছিলাম, তিনি নিশ্চয়ই ভেঙে পড়বেন।
কিন্তু অবাক হলাম—রূপক যেন কিছুটা হালকা বোধ করছেন।
চিরশ্রী হেসে বললেন, “জানেন, রূপক খুব সাপোর্টিভ। এতদিন আমি ভেবেছি শুধু আমার কারণেই হচ্ছে না। আজ রিপোর্ট আসার পর ও বলল, আমিও তোমার মতোই একটা অংশীদার। এখন তুমি একা নও।”
বললাম, “একটা শুক্রাণুর রিপোর্ট দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। অন্য ল্যাবে আরেকবার টেস্ট করান।”
দ্বিতীয়বার রিপোর্ট কিছুটা ভালো এল।
তাঁরা আর আইভিএফ করতে চাইছিলেন না।
তারপর চিরশ্রীর SSG করা হল—দেখা গেল, টিউব খোলা আছে।
বললাম, “তাহলে এখন আইভিএফ করব না। খুব কম ডোজে ওভুলেশন ইনডাকশন দেবো, আর স্বাভাবিকভাবে চেষ্টা করুন। তবে মনে রাখবেন, ইনজেকশনগুলোতেও রক্ত জমাট বাঁধার সামান্য রিস্ক আছে।”
চিকিৎসা শুরু হল।
প্রথম মাসেই টেস্ট পজিটিভ এল।
তারপর শুরু হল নতুন অধ্যায়—উৎকণ্ঠার।
চিরশ্রী প্রায় প্রতি সপ্তাহে আসতেন, রিপোর্ট দেখাতেন, নিজের গ্লুকোমিটার দিয়ে রোজ সুগার মাপতেন।
সব স্ক্যান শুধুমাত্র ফিটাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে করাতে বলেছিলাম।
২০ সপ্তাহ পর্যন্ত সব ঠিকই চলল।
কিন্তু ২৪ সপ্তাহের পর থেকে বাচ্চার গ্রোথ কমতে শুরু করল।
বললাম, “এটা আপনার ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক। আপনার রক্তের সমস্যা, হার্টের সমস্যা আর ডায়াবেটিস—সব মিলিয়ে বাচ্চা ঠিকমতো রক্ত পাচ্ছে না।”
গ্রোথ মনিটরিং চলতে লাগল—দু’সপ্তাহ বাদে বাদে, পরে এক সপ্তাহ অন্তর।
৩০ সপ্তাহে একদিন বললেন, “বাচ্চা নড়ছে না।”
হসপিটালে ভর্তি করলাম, CTG করিয়ে দেখি সব ঠিক আছে।
৩১ সপ্তাহে আবার একই কথা। ভাবলাম, হয়তো উদ্বেগের কারণে এমন লাগছে।
৩২ সপ্তাহ তিন দিন—তৃতীয়বার বাচ্চা নড়ছে না। এবার কালার ডপলার করিয়ে দেখি, রক্তপ্রবাহ অস্বাভাবিক।
রাত ন’টার সময় সিদ্ধান্ত নিতে হল—আজই ডেলিভারি।
অপারেশন থিয়েটারে সবাই হাজির—অ্যানেসথেটিস্ট, পেডিয়াট্রিশিয়ান, কার্ডিওলজিস্ট।
চিরশ্রী আর রূপককে সমস্ত ঝুঁকি জানানো হল। এমনকি
বলা হল, “মায়ের মারা যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।”
তাঁরা কাঁপা হাতে কনসেন্ট ফর্মে সই করলেন।
রূপক তখন আলাদা করে এসে বললেন, “ডাক্তারবাবু, বাচ্চার যা হোক, দয়া করে দেখুন মা’টা যেন ঠিক থাকে।”
অপারেশন হল।
বাচ্চার ওজন ১৪০০ গ্রাম। NICU-তে পাঠানো হল।
চিরশ্রীকে ICU-তে।
২৪ ঘণ্টা পর তিনি স্থিতিশীল, তাই ওয়ার্ডে পাঠানো হল।
ওখান থেকে অন্তত বাচ্চাকে দেখতে যেতে পারবেন।
NICU-র দিনগুলো ছিল এক অদ্ভুত লড়াই।
জন্ডিস, শ্বাসকষ্ট, অক্সিজেন—সবকিছুর মধ্যে দিয়ে ছোট্ট প্রাণটা টিকে রইল।
প্রথমে স্যালাইন, তারপর নাকে নল দিয়ে খাওয়ানো, তারপর বোতল, অবশেষে মায়ের বুকের দুধ।
মাঝেমধ্যেই খবর নিতাম—ওজন একটু বেড়েছে কিনা, নড়াচড়া ঠিক আছে কিনা।
দু’মাস বাদে বাচ্চা সুস্থ হয়ে বাড়ি গেল।
এখন বাচ্চার বয়স আড়াই মাস, ওজন সাড়ে তিন কেজি।
আজ তাঁরা চেম্বারে এলেন—হাতে মোবাইল, তাতে তাঁদের ছোট্ট একজনের সুন্দর ছবি।
চিরশ্রী হাসলেন।
আমি বললাম, “আজ আপনাকে প্রথমবার হাসতে দেখছি।”
তিনি বললেন, “ডাক্তারবাবু, আপনি জানেনই তো আমাদের অবস্থা ছিল কেমন। আপনি, আপনার টিম, সবাই লড়েছেন। তবে সবথেকে বেশি লড়েছে রূপক।”
রূপকের চোখে তখন জল—কিন্তু সেই জলে একরাশ তৃপ্তি।
মনে পড়ল, ওর সেই কথা—
“বাচ্চার যা হোক, আপনি দেখুন মা যেন ঠিক থাকে।”
আজ দু’জনেই ঠিক আছেন।
আর তাঁদের ভালোবাসা—অক্ষয়।
-