02/10/2025
জেরিয়াট্রিক চিকিৎসা সাধারণত ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তিদের জন্য প্রয়োজন হয়।
এই বয়সে প্রয়োজন হয় কারণ বার্ধক্যের সাথে সাথে শরীরে একাধিক পরিবর্তন আসে:
জেরিয়াট্রিক চিকিৎসার প্রয়োজন হয়েছে তা বোঝার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ দেখা যায়:
একাধিক জটিল রোগ: একইসাথে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ বা আর্থ্রাইটিসের মতো একাধিক দীর্ঘস্থায়ী রোগ থাকা।
কার্যকরী সক্ষমতার হ্রাস: দৈনন্দিন কাজ, যেমন হাঁটাচলা, পোশাক পরা বা গোসল করার মতো কাজে হঠাৎ বা ধীরে ধীরে সাহায্য লাগা।
স্মৃতি এবং জ্ঞানীয় সমস্যা: ভুলে যাওয়া, সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা বা আচরণের পরিবর্তন (যেমন স্মৃতিভ্রংশ বা ডিমেনশিয়া)।
পতন এবং ভারসাম্যহীনতা: ঘন ঘন পড়ে যাওয়া বা ভারসাম্যের সমস্যা হওয়া।
অত্যধিক ওষুধ সেবন (Polypharmacy): বিভিন্ন রোগের জন্য পাঁচ বা তার বেশি ওষুধ একসাথে সেবন করা।
শারীরিক দুর্বলতা (Frailty): ওজন কমে যাওয়া, ক্লান্তি, পেশীর দুর্বলতা এবং ধীর গতিতে হাঁটা।
সামাজিক বা মানসিক সমস্যা: গুরুতর বিষণ্নতা, একাকীত্ব বা যত্নের জন্য পর্যাপ্ত সহায়তার অভাব।
এই লক্ষণগুলির মধ্যে একাধিক দেখলে একজন জেরিয়াট্রিশিয়ান (Geriatrician)-এর সাথে পরামর্শ করা উচিত।
জেরিয়াট্রিক চিকিৎসা হলো বয়স্ক ব্যক্তিদের বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা।
এই চিকিৎসা কখন প্রয়োজন?
এটি সাধারণত ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তিদের জন্য প্রয়োজন হয়। তবে, যদি এর আগেও কোনো ব্যক্তির একাধিক জটিল রোগ, দুর্বলতা, বা কার্যকরী সক্ষমতার হ্রাস দেখা যায়, তবে তার জন্য জেরিয়াট্রিক চিকিৎসা শুরু করা যেতে পারে।
এই চিকিৎসা কেন প্রয়োজন?
এর প্রধান কারণগুলি হলো:
বয়স্কদের একাধিক জটিল রোগ একসঙ্গে দেখা যায়, যার জন্য সমন্বিত চিকিৎসার দরকার।
এটি পতন, স্মৃতিভ্রংশ, এবং দুর্বলতার মতো বয়স-সংক্রান্ত বিশেষ সমস্যাগুলি মোকাবিলা করে।
এটি জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে এবং বয়স্ক ব্যক্তির স্বাধীনতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
জেরিয়াট্রিক অ্যাসেসমেন্ট (Geriatric Assessment) পদ্ধতি হলো বয়স্ক ব্যক্তির শারীরিক স্বাস্থ্য, মানসিক অবস্থা, কার্যক্ষমতা (functional ability) এবং সামাজিক-পারিপার্শ্বিক অবস্থা মূল্যায়নের জন্য একটি বহুমাত্রিক এবং বহু-বিশেষজ্ঞ দল দ্বারা পরিচালিত প্রক্রিয়া। এর উদ্দেশ্য হলো তাদের চিকিৎসা ও যত্নের জন্য একটি সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি করা।
এটি সাধারণত ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তিদের জন্য করা হয়, বিশেষ করে যাদের একাধিক স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে, যারা বিভিন্ন ওষুধ খাচ্ছেন, বা যাদের দৈনন্দিন কার্যক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। তবে, স্বাস্থ্যগত অবস্থা অনুযায়ী কম বয়সেও প্রয়োজন হতে পারে।
এই মূল্যায়নের জন্য সাধারণত জেরিয়াট্রিশিয়ান (Geriatrician) বা বয়স্কদের স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডাক্তার এবং নার্স, ফিজিওথেরাপিস্ট, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, সমাজকর্মীসহ একটি জেরিয়াট্রিক কেয়ার টিমের কাছে যেতে হয়।
জেরিয়াট্রিক চিকিৎসা পদ্ধতি হলো বয়স্ক প্রাপ্তবয়স্কদের (সাধারণত ৬৫ বছর বা তার বেশি) স্বাস্থ্যসেবার একটি বিশেষায়িত ও সামগ্রিক (holistic) পদ্ধতি। এর লক্ষ্য শুধু রোগ নিরাময় নয়, বরং বয়স্ক মানুষের জীবনযাত্রার মান, কার্যকারিতা (functionality) এবং স্বাধীনতা বজায় রাখা বা উন্নত করা।
এই পদ্ধতিটি সাধারণ চিকিৎসা থেকে বেশ কিছু দিক থেকে আলাদা। এটি সাধারণত একটি বহু-শাখাভিত্তিক দলগত দৃষ্টিভঙ্গি (Multidisciplinary Team Approach) অনুসরণ করে।
জেরিয়াট্রিক চিকিৎসার মূল নীতি ও পদ্ধতিসমূহ
জেরিয়াট্রিক চিকিৎসার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো বয়স্ক রোগীর অনন্য এবং প্রায়শই জটিল চাহিদাগুলি পূরণ করা, যা নিম্নলিখিত বিষয়গুলির উপর জোর দেয়:
১. ব্যাপক জেরিয়াট্রিক মূল্যায়ন (Comprehensive Geriatric Assessment - CGA)
এটি সাধারণ শারীরিক পরীক্ষার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। এই মূল্যায়নের মাধ্যমে রোগীর স্বাস্থ্য পরিস্থিতি সব দিক থেকে দেখা হয়:
শারীরিক স্বাস্থ্য: দীর্ঘস্থায়ী রোগ (যেমন ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, বাত), পুষ্টির অবস্থা, দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি।
কার্যকারিতা (Functional Status): দৈনন্দিন জীবনযাত্রার কাজ (ADL—যেমন কাপড় পরা, খাওয়া, হাঁটা) এবং যন্ত্রের সাহায্যে করা কাজ (IADL—যেমন টাকা-পয়সা সামলানো, বাজার করা, ওষুধ খাওয়া) করার ক্ষমতা মূল্যায়ন করা।
জ্ঞানীয় ও মানসিক স্বাস্থ্য: স্মৃতিভ্রংশ বা ডিমেনশিয়া, বিষণ্নতা বা উদ্বেগ পরীক্ষা করা।
সামাজিক ও পরিবেশগত অবস্থা: রোগীর পারিবারিক সমর্থন, জীবনযাত্রার পরিবেশ এবং আর্থিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা।
২. বহু-শাখাভিত্তিক দলগত যত্ন (Interdisciplinary Team Care)
বয়স্ক রোগীদের যত্নে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ একসাথে কাজ করেন:
জেরিয়াট্রিশিয়ান (Geriatrician): বয়স্কদের রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।
নার্স ও নার্স প্র্যাকটিশনার: বিশেষায়িত যত্ন ও পর্যবেক্ষণ প্রদান করেন।
ফার্মাসিস্ট: ওষুধের ব্যবস্থাপনায় সাহায্য করেন, যাতে একাধিক ওষুধের খারাপ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া (polypharmacy) এড়ানো যায়।
ফিজিওথেরাপিস্ট ও অকুপেশনাল থেরাপিস্ট: গতিশীলতা ও দৈনন্দিন কাজে স্বাধীনতার উন্নতিতে সাহায্য করেন।
সমাজকর্মী (Social Worker): সামাজিক সহায়তা, যত্নের পরিকল্পনা এবং প্রয়োজনীয় সম্পদের ব্যবস্থা করেন।
৩. রোগীর অগ্রাধিকারের উপর জোর (Patient Priorities/Goals of Care)
চিকিৎসকরা রোগীর ব্যক্তিগত লক্ষ্য এবং অগ্রাধিকারকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন, যাকে প্রায়ই "৫ M's" দ্বারা বোঝানো হয়:
Mind (মন): মানসিক স্বাস্থ্য ও জ্ঞানীয় অবস্থা।
Mobility (চলন): চলাফেরার স্বাধীনতা ও পতন প্রতিরোধ।
Multicomplexity (বহুমুখী জটিলতা): একাধিক রোগ এবং তাদের আন্তঃসম্পর্ক ব্যবস্থাপনা।
Medications (ওষুধ): অপ্রয়োজনীয় ওষুধ পরিহার করে যথাযথ ওষুধের ব্যবহার।
What Matters Most (যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ): রোগীর জীবনের লক্ষ্য, আকাঙ্ক্ষা এবং যত্নের অগ্রাধিকার—যেমন স্বাধীনতা বজায় রাখা, ব্যথা কমানো, বা প্রিয়জনদের সাথে সময় কাটানো।
গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রসমূহ
এই চিকিৎসা পদ্ধতিতে নিম্নলিখিত ক্ষেত্রগুলির দিকে বিশেষভাবে নজর দেওয়া হয়:
ওষুধ ব্যবস্থাপনা (Medication Management): বয়স্করা প্রায়শই একাধিক ওষুধ খান, যা জটিলতা বাড়ায়। জেরিয়াট্রিক পদ্ধতি এর সঠিক ডোজ নির্ধারণ ও অযাচিত ওষুধ বাদ দেওয়ার উপর জোর দেয়।
পতন প্রতিরোধ (Fall Prevention): বয়স্কদের পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই তাদের চলাচলের সমস্যা, পরিবেশগত বিপদ এবং ভারসাম্যহীনতা দূর করার জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
দুর্বলতা বা ফ্ৰেইলটি (Frailty) ব্যবস্থাপনা: এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে শরীরের শক্তি ও সহনশীলতা কমে যায়। জেরিয়াট্রিক যত্ন দুর্বলতা রোধ ও চিকিৎসার উপর গুরুত্ব দেয়।
উপশমকারী যত্ন (Palliative Care): গুরুতর বা দীর্ঘস্থায়ী রোগের ক্ষেত্রে রোগীর আরাম ও জীবনযাত্রার মান উন্নত করার দিকে জোর দেওয়া হয়।
সংক্ষেপে, জেরিয়াট্রিক চিকিৎসা পদ্ধতি বয়স্ক রোগীর শারীরিক, মানসিক, এবং সামাজিক সমস্ত দিক বিবেচনা করে একটি ব্যক্তি-কেন্দ্রিক (Person-Centered) এবং সমন্বিত যত্ন নিশ্চিত করে।