29/01/2026
অসহায় দেশের অসহায় এক হাত এই লেখা লিখছে। অসহায় দেশের অসহায় বিজ্ঞানের এই এই লেখা। যে অসহায় বিজ্ঞান প্রতিদিন অসংখ্য অসহায় মানুষের জন্য সাদা পাতায় একের পর এক ওষুধের নাম লিখে চলে, একের পর এক টেস্টের নাম লিখে চলে, যেসব শব্দ অসহায় রুগীকে আরও অসহায় করে দেয় সেই জিডিপি বর্ধক ব্যর্থ বিজ্ঞানের গ্লানি নিয়েই এই লেখা।
একটি ভাইরাস সম্প্রতি খবরের কেন্দ্রবিন্দুতে এলো, বাজারে ভাইরাসটির নাম মুখে মুখে ঘুরলো কিছুদিন। কিছু জেনারেল নলেজ, কিছুটা সচেতনতা৷ তারপর? তারপর সেই অসহায় দেশের অসহায় নাগরিকদের অসহায় জীবনের সেই ভাইরাসের থেকে বাঁচার অসহায়তার কোনও বদল হলো না। সেই ভাইরাসের উপদ্রব এই বাংলায় ঠিক কতোটা বিস্তৃত, সেই ভাইরাস ছড়ানোর সম্ভাবনা ঠিক কোথায় কোথায় রয়েছে, আদৌ কি অজান্তেই মানুষ সেই ভাইরাসের কারণে এতোদিন মারা গেছে? দুষ্প্রাপ্য কিট, দুষ্প্রাপ্য প্রযুক্তি এবং আরও দুষ্প্রাপ্য উদ্যমী এবং সাহসী চিকিৎসক সবে মিলে সেই ভাইরাসকে এমন জায়গায় পৌঁছে দিল যেখান থেকে সে কেবল খবরের কাগজের বিক্রি বাড়াতে পারে, কিন্তু সাধারণ প্রান্তিক স্বাস্থ্যকর্মীর চিন্তার ব্যাপ্তিতে কোনও ছাপ ফেলতে পারে না।
পুরুলিয়া হলো সেই জেলা যেখান থেকে কলকাতাগামী ট্রেন সঠিক সময়ে কলকাতায় ঢুকলেও পুরুলিয়ায় ফেরার ট্রেন গড়ে ৪-৫ ঘন্টা বা তারও বেশি লেট করে। তা সেই পুরুলিয়া বাঁকুড়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে খেজুরের গাছ, তার রস, সেই রস থেকে গুড় উৎপাদন, তাল গাছ, সেই তাল থেকে তাড়ি সবই রাস্তার দুই ধারে শীত গ্রীষ্ম ব্যাপী চলতে থাকে। মানুষের প্রচলিত বক্তব্য "কই কারুর তো কিছু হয়না"। আসলে অসহায় দেশের কারুর কিছুই হয়না, হাসপাতাল পৌঁছানোর আগেই সেই অজানা অসহায় মৃত্যুগুলো, কী হয়েছে জানার আগেই দেহগুলোকে চিতায় তুলে দেয়। সেসব অজানা রুগীর সমাধিগুলো কখনও কলকাতার প্রিন্টিং প্রেসে ঝড় তোলে না।
কলকাতার প্রথম কেসটির মৃত্যুও ছিল অজানা, কিন্তু দুজন নার্সিং অফিসারের টেস্ট না হলে সবটাই অজানা থেকে যেত। কোনও এক দল চিকিৎসক নিয়মের তোয়াক্কা না করে সেই টেস্ট না করলে সবকটা মৃত্যুর কারণই অজানা থেকে যেত। জানা আর অজানার মধ্যে ফারাক তৈরী করল ব্যতিক্রমী সৎ সাহস।
অসহায় দেশের এক অসহায় বিজ্ঞানকর্মী তথা স্বাস্থ্যকর্মীর এই হাত কেবল এইটুকু জানাতে চায় যেসব মানুষ সেই খেজুরের রস সংগ্রহ করে তাদের বেশিরভাগের কাছেই এই ডিজিটাল ভারতবর্ষে কোনও ফোন নেই, স্মার্ট ফোন তো দূরের কথা। যে হাঁড়িগুলোতে রস তারা সংগ্রহ করে তার অধিকাংশের মুখই খোলা থাকে। সেই মুখ ঢাকার নিম্নোক্ত পদ্ধতি যদি অবলম্বন করা যায় তাহলে তাদের এবং সেই রস যারা সরাসরি পান করছেন তাঁদের জীবন কিছুটা হলেও সুরক্ষিত হতে পারে।
বাদুড়কে শত্রু বানিয়ে পরিবেশবান্ধব এই জীবকে মেরে বা তার খাদ্য কমিয়ে বিশেষ লাভ হবে না। বরং এই অসহায় দেশের অসহায় মানুষগুলোকে ভয়ানক জেদ এবং প্রবল শক্তি নিয়ে যদি একটু সচেতন করা যায়। স্বাস্থ্যকর্মীদের যদি একটু সচেতন করা যায় যে এই অঞ্চলে Encephalitis with ARDS মানে শ্বাসকষ্ট খিঁচুনি এবং অজ্ঞান হয়ে থাকা এই তিনের সমন্বয় যদি কোনও ব্যক্তির হয় এবং কাঁচা খেজুরের রস সেবনের যদি উল্লেখ থাকে, সেই রস থেকে প্রস্তুত তাড়ি খাওয়ারও যদি হিস্ট্রি থাকে, বা বাদুড়ের মাংসা খাওয়ার হিস্ট্রি যদি থাকে, তাহলে যেন নিপাহ (Nipah) ভাইরাসটির পরীক্ষা করার চেষ্টা তারা করে। প্রত্যেক বছর খেজুর রস এবং তালের তাড়ি তৈরীর সময়টা এই অসহায় জেলার মানুষদের জন্য যেন অসহায় স্বাস্থ্যকর্মীরা এইটুকু মনে রাখে।
জেলার অসহায় নাগরিক কি সেই স্বপ্ন দেখার সাহস কখনও করতে পারে যেখানে এমন প্রাণঘাতী ভাইরাসের স্যাম্পেল অতিদ্রুত পরীক্ষা করে নেওয়ার প্রযুক্তি পাবে পুরুলিয়ার প্রান্তিক মানুষটিও? যার রিস্ক সবচেয়ে বেশি যার একটি স্মার্ট ফোনও নেই, কিন্তু তার কিছু হলে স্যাম্পেল টেস্ট হবে কলকাতায়। আমাদের ব্যর্থ বিজ্ঞানের সমস্ত সমীকরণের দৌড় এইখানে থেমে যায়। মানুষের জাগ্রত বিবেকের উপর, সমষ্টির উন্নত চেতনার উপরে বিজ্ঞানকে তখনই ভরসা করতে হয়। সমস্ত রকম অসহায়তা অজ্ঞানতার অবসান ঘটাতে পারে মানুষের সৎ সাহস, কেবল প্রযুক্তি নয়।
ডা: সায়ন মহারত্ন
এইইমস কল্যাণীর সংক্রমণ বিভাগের সিনিয়ার রেসিডেন্ট ডাক্তার