11/26/2025
এন্টিবায়োটিকের অপব্যবহার বন্ধ করুন—ঝুঁকি কমান
লেখক ছৈয়দ আহমদ তানশীর উদ্দীন
এন্টিবায়োটিক বিজ্ঞানের বিস্ময়কর আবিস্কার: ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ঠেকাতে আবিস্কার হয়েছিল এন্টিবায়োটিক। জীবাণুনাশক ঔষধকে বলা হয় এন্টিমাইক্রোবিয়াল এজেন্ট বলা হয়। এর মধ্যে এন্টিবায়োটিক একটি। প্রথম আবিস্কৃত এন্টিবায়েটিক দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, পেনিসিলিন আবিষ্কারের ১০ বছরেরও কম সময়ে, এমনকি স্যার আলেকজান্ডার ফ্লেমিং পেনিসিলিন আবিষ্কারের জন্য পাওয়া নোবেল পুরস্কার গ্রহণের আগেই এক প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া হয়ে ওঠে পেনিসিলিন-প্রতিরোধী। সেই থেকে গত ৭০ বছর ধরে ব্যাকটেরিয়া অার মানুষে চলছে ‘ইঁদুর-বেড়াল খেলা’। আবিষ্কৃত হয়েছে নতুন প্রজন্মের নতুন প্রজাতির অ্যান্টিবায়োটিক। তার সঙ্গে তাল রেখে ব্যাকটেরিয়াও গড়ে তোলে নতুন নতুন প্রতিরোধী ক্ষমতা।অ্যান্টিবায়োটিকের সঙ্গে খাপ খাইয়ে বেঁচে থাকা অথবা প্রতিরোধী ক্ষমতা অর্জন করা ব্যাকটেরিয়ার একটি সহজাত প্রক্রিয়া। এটি মূলত শুরু হয় ব্যাকটেরিয়ার জেনেটিক পরিবর্তনের মাধ্যমে। এটি তখনই ঘটে যখন কোনো এক প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া কোনো এক সুনির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিকের সম্মুখীন হয়। অ্যান্টিবায়োটিক থেকে নিজেদের বাঁচাতে ব্যাকটেরিয়া হয় নিজেদের কোনোভাবে পাল্টে ফেলে, অথবা এমন সব রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ করে যা দিয়ে অ্যান্টিবায়োটিককে নিষ্ক্রিয় করে ফেলা যায়।
যদিও এটা অবধারিত যে, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে এর বিরুদ্ধে একসময় না একসময় প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া তৈরি হবেই। কিন্তু আমাদের অসচেতনতা, স্বভাব এবং অবহেলার কারণে এসব প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া তৈরি হচ্ছে হাজার হাজার গুণ দ্রুতগতিতে।
আপনার সচেতনতাই পারে এন্টিবায়োটিকের অপব্যবহার রোধ করতে:
আমরা না জেনে, না বুঝে যত্রতত্র অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করছি, এমনকি ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়াই। ডাক্তাররাও প্রায়শই যথাযথ ল্যাব টেস্ট না করে অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রিপশনে লিখে দিচ্ছেন অবলীলায়। ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে রোগের প্রকৃত কারণ বের না করে অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রিপশন দিলে তাতে চিকিৎসায় ভুল হওয়ার অনেক বেশি আশঙ্কা থাকে। আর অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স সম্পূর্ণ না করা। গবেষণায় দেখা গেছে, অল্পমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার ব্যাকটেরিয়াকে প্রতিরোধী হয়ে উঠতে সহযোগিতা করে এবং পরবর্তীতে বেশি মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলেও তাতে প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া বেঁচে থাকতে পারে। কাজেই অ্যান্টিবায়োটিকের সুপারিশকৃত ডোজ সম্পূর্ণ করা উচিত যাতে ব্যাকটেরিয়া সহজে প্রতিরোধী হয়ে উঠতে না পারে।
অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার ব্যতীত আরও যেসব দৈনন্দিন চর্চা অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার বিস্তৃতিতে সহায়ক তা হল, ল্যাব টেস্টিং এবং মনিটরিংয়ের অভাব। হাসপাতালে বা নিজের বাড়িতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব, রোগ সংক্ৰমণে যথাযথ নিয়ন্ত্রণ না থাকা, ঘন ঘন হাত না ধোয়ার অভ্যাস, হাত ধুতে সাবানের ব্যবহার না করা, ঠিকভাবে হাত ধুতে না জানা, অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ বিষয়ে জনসচেতনতার অভাব ইত্যাদি।
গবেষনা বলছে শীঘ্রই প্রচলিত এন্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে পড়বে :
দেশে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধ ক্ষমতা (এএমআর) বিপজ্জনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) জানিয়েছে, দেশের আইসিইউতে ভর্তি রোগীর ৪১ শতাংশ কোনো অ্যান্টিবায়োটিকে সাড়া দিচ্ছে না। ২৪ নভেম্বর ২০২৫ আইইডিসিআর ন্যাশনাল এএমআর সার্ভেলেন্স রিপোর্ট ২০২৫' প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই মাস থেকে ২০২৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত দেশের ৯৬,৪৭৭ জন রোগীর নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। পাঁচটি আইসিইউতে ৭১ ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হলে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে কোন প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্যান-ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট (পিডিআর) জীবাণু সব নমুনার ৭ শতাংশ এবং আইসিইউতে ৪১ শতাংশ পাওয়া গেছে। মাল্টি-ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট (এমডিআর) জীবাণু সব নমুনার ৪৬ শতাংশ এবং আইসিইউতে ৮৯ শতাংশ দেখা গেছে। এছাড়া, হু ওয়াচ-গ্রুপ অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বেড়ে ৭৭ শতাংশ থেকে ৯০.৯ শতাংশ হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক ছিল সেফট্রিয়াক্সোন (৩৩ শতাংশ) এবং মেরোপেনেম (১৬ শতাংশ)।
২০২৩ সালের পর থেকে গাজায় পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুহার দশগুণ বেড়েছে; এবং মৃত্যুর প্রায় ৫৫ শতাংশই নবজাতক। জীবাণুনাশক যন্ত্রপাতি, অ্যান্টিবায়োটিক, এমনকি ক্লোরিন পর্যন্ত গাজায় প্রবেশে বাধা দেওয়ায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে—এমন পরিবেশ তৈরি হয়েছে যেখানে অত্যন্ত অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু ও তথাকথিত সুপারবাগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি ব্যাপক। ২০২৩ সালের এক জরিপে বলা হয়, পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া ছয়টির মধ্যে একটি সংক্রামক রোগ অ্যান্টিবায়োটিকে সারানো যাচ্ছে না। রক্ত, অন্ত্র, মূত্রনালি এবং যৌন সংক্রমণের মতো সাধারণ সংক্রামক রোগে ৪০ শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর। সবচেয়ে উদ্বেগের কারণ হলো, গ্রাম নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে বেশির ভাগ অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকারিতা দেখাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২০৫০ সাল নাগাদ অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স ৭০ শতাংশে পৌঁছাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা বছরে দুই লক্ষাধিক, যার মধ্যে ২৩ হাজার লোকের মৃত্যু হয়। বিশ্বজুড়ে সাত লক্ষাধিক লোক মৃত্যুবরণ করে একই কারণে।বিশেষজ্ঞদের হিসাবে এখনই সাবধান না হলে ২০৫০ সালের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার কারণে প্রতি বছর এক কোটির বেশি লোক মারা যাবে এবং ১০০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি আর্থিক ক্ষতি হবে।
অ্যান্টিবায়োটিক সংরক্ষণ করুন, নিজের জীবন রক্ষা করুন:
বাজারে যেসব অ্যান্টিবায়োটিক প্রচলিত আছে, তার বেশির ভাগই এখন অকার্যকর হয়ে পড়েছে। যে হারে জীবাণুর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হচ্ছে, সে হারে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কৃত হচ্ছে না। যে গতিতে পৃথিবী থেকে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক নিঃশেষ হচ্ছে, তাতে অচিরেই চিকিৎসকদের সংক্রামক রোগ চিকিৎসায় হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হবে।
২০১৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর অ্যান্টিবায়োটিক সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একইভাবে উদ্বেগজনক সংবাদ প্রচার করেছিল। দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ রানিং আউট অব অ্যান্টিবায়োটিকস শিরোনামের খবরে বলা হয়, অতি দ্রুত পৃথিবী থেকে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক নিঃশেষ হচ্ছে। অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এজেন্টস ইন ক্লিনিক্যাল ডেভেলপমেন্ট পাইপলাইন ইনক্লুডিং টিউবারকিউলোসিস শীর্ষক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক রিপোর্টে বলা হয়, বাজারে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আসা স্থবির হয়ে গেছে। রেজিস্ট্যান্ট জীবাণু সংক্রমণের ভয়ে অতি ছোট সার্জারি করতেও চিকিৎসকেরা সাহস পাবেন না। বর্তমানে বাজারে যেসব অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া যাচ্ছে, তা পুরোনো বা প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকের সংক্ষিপ্ত রাসায়নিক রূপান্তরমাত্র। এসব অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে সাময়িক সুবিধা পাওয়া গেলেও দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা সমাধানে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারছে না বা পারবে না।
বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধ বিষয়ক এবারে IEDCR গবেষণা করেছে । সীমিত গবেষণাপত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে যার মধ্যে বহু অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সুপারবাগ রয়েছে। ২০২০ সালে বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির আইসিইউতেই শতকরা ২৫ ভাগ ব্যাকটেরিয়া হল সুপারবাগ, যা কিনা সব ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী। এসব তথ্য নিঃসন্দেহে প্রকৃত চিত্রের খুব সামান্য প্রকাশ, কিন্তু আতংকিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট।
এএমআর( এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্টেন্স) সম্মিলিত প্রয়াসে প্রতিরোধ করা সম্ভব:
অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ একটি বৈশ্বিক সমস্যা। তাই এর সমাধানও হতে হবে বৈশ্বিকভাবে। সত্যি বলতে কী, কোনো এক দেশ এককভাবে এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। কেননা উন্নত যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে সারা বিশ্বের মানুষ এখন একই সূত্রে বাঁধা। দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা যতই নিশ্ছিদ্র হোক না কেন, সাদা চোখে অদৃশ্য, এসব ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সুপারবাগের প্রবেশ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। এর প্রমাণ হল, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যে পৃথিবীর খুব কম দেশই আছে যেখান থেকে কোনো না কোনো অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সুপারবাগের রিপোর্ট পাওয়া যায়নি। সুপারবাগরবাগ ও অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের বিরুদ্ধে এখনই তাই যুদ্ধ ঘোষণার সর্বশেষ সময়। এ যুদ্ধ কোনো সুনির্দিষ্ট পেশাজীবীদের নয়। এ যুদ্ধে সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ, গণমাধ্যম, চিকিৎসক, স্বাস্থ্যসেবাকর্মী, বিজ্ঞানী এবং ডায়াগনস্টিক ল্যাবসহ সবারই কিছু না কিছু করার আছে। আশার কথা হল, ২০২০ জাতিসংঘের ১৯৩টি দেশ অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ে লড়তে একমত হয়েছে এবং একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
সুপারবাগ বনাম মানুষ– এ লড়াইয়ে মানুষ জিততে পারবে কি?
নার্স ও পুষ্টিবিদ, কক্সবাজার
syedahmedtanshiruddin@gmail.com