28/01/2026
কিশোর বয়সে তিনি গোসল করতে নেমেছিলেন বাড়ির পাশের পুকুরে। অন্যান্য দিনের মতই স্বাভাবিকভাবে গোসল করে ফিরে আসেন। কিন্তু রাতের দিকে শরীর খারাপ শুরু হতে থাকে তার। খুব একটা পাত্তা দেন নি। আস্তে আস্তে বিভিন্ন জায়গায় ব্যাথা হতে শুরু করে। প্রচন্ড ব্যাথা নিয়ে কবিরাজ, ডাক্তারের কাছে ছুটেছেন। আস্তে আস্তে শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। বিছনায় পড়ে যেতে থাকেন; বিভিন্ন জয়েন্টে ব্যাথা শুরু হতে থাকে।
ধীরে ধীরে শরীরে জড়তা আসা শুরু হয়। হাটুতে, কোমরে, পায়ের পাতায়, মেরুদন্ডের নিচে জড়তা আসতে থাকে।
১০ বছর পর, এখন তার শরীরের নিচের অংশ পুরোই অবশ। কোমর থেকে পা অবধি প্রতিটা জয়েন্টের ফাঁকে ফাঁকে মাংস জমে গিয়েছে। অর্থাৎ এই অসাড়তা এখন স্থায়ী পর্যায়ে চলে গিয়েছে।
পরিবারসহ সাভারে গ্রামের বাড়ি ঘুরতে গেলেন। সাথে তাদের পিচ্চি ছেলেবাবু। বয়স ৩-৪। আত্মীয় স্মজন সবাই যখন সাক্ষাৎ আর কুশল বিনিময়ে ব্যস্ত, ভর দুপুরে সেই ছেলেকে খুজে পাচ্ছে না কেউ; অথচ তাদের পাশেই ছিল। খোজাখুজি করতে করতে দেখা গেলো পাশের পুকুরের ঠিক মাঝখানে শিশুটি। সবাই হতবাক, বাচ্চাটি কিভাবে সেখানে গেলো, কে নিয়ে গেলো, আর পুকুরের মাঝেই কিভাবে ভেসে আছে??
পরে একজন সাঁতরে গিয়ে বাচ্চাটিকে উদ্ধার করে।
আজও সেই রহস্য বের করা যায় নি।
স্কুল থেকে ফিরে প্রতিদিনই নদীতে গোসল করতে নামে কিশোর ছেলেটা। সেদিন ছুটি শেষে ক্রিকেট খেলতে খেলতে আছর হয়ে যায়। বাড়ি ফেরার আগে নদীতে দু-তিনটা ঝাপ দিয়ে বাড়ির দিক চললো। হাটতে হাটতে খেয়াল করলো দুই পা প্রচুর চুলকাচ্ছে আর জ্বলছে। ঘরে ফিরে মা খেয়াল করলো ছেলের দুই পা নখের মত আচড় দিয়ে ভরে গেছে।
আগে আমাদেরকে বলা হতো পুকুরে, নদীতে জ্বিন থাকে। সন্ধায় সেখানে যেন গোসল করতে না নামি। তখন রূপকথার গল্প ভেবে উড়িয়ে দিতাম। আবার ভাবতাম জ্বিন যদি হইয় আগুনের, পানিতে থাকবে কিভাবে। নিভেই তো যাবে!
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
الجنيُّ مشتق من أجنَّ الشيء، أي أكنَّه وأخفاه .
الجن يسكنون الأماكن التي لا يسكنها البشر، أو يقلُّ تردُّدهم عليها. الصحاري والخلاء والخرائب
والمساحات غير المأهولة من البحر
অর্থাৎ, জ্বিন শব্দটি এসেছে আজান্না, অর্থাৎ কোনোকিছুকে গোপন করা বা লুকিয়ে রাখা। জ্বিন সেসব জায়গায় থাকে যেখানে মানুষ থাকে না, কিংবা জনসাধারণের চলাফেরা একেবারেই কম। যেমন, মরূভুমি, নির্জন-প্রাপ্ত এলাকা, সমুদ্রের জনবসতহীন অংশ বা দ্বীপ।
পানিতে যে জ্বিন থাকে এ নিয়ে আমরা ক্বুরআনেই সরাসরি পাই। আল্লাহ ﷻ বলেন,
وَٱلشَّيَٰطِي نَ كُلَّ بَنَّآءٍ وَغَوَّاصٍ
"আর (অনুগত করে দিলাম) প্রত্যেক প্রাসাদ নির্মাণকারী ও ডুবুরী শাইত্বান [জ্বিন] সমূহকেও"
Saad -37
আয়াতের غواص শব্দের তাফসীরে,
ইবন কাসীর রা. বলেন,
أي منهم من هو مستعمل في الأبنية الهائلة من محاريب وتماثيل وجفان كالجواب وقدور راسيات إلى غير ذلك من الأعمال الشاقة التي لا يقدر عليها البشر وطائفة غواصون في البحار يستخرجون ما فيها من اللآلئ والجواهر والأشياء النفيسة التي لا توجد إلا فيها.
অর্থাৎ, তাদের(শাইত্বানদের) মধ্যে এমন কিছু ছিল যাদের ব্যবহার করে তিনি(সুলাইমান আ.) উঁচু কক্ষ, আকৃতি, জলাশয়ের মতো বিশাল পাত্র, এবং দৃঢ়-স্থির কড়াই তৈরি করতেন, এবং অন্যান্য কঠিন কাজ করতেন যা মানুষ করতে অক্ষম ছিল। এবং আরেকটি দল ছিল, যারা সমুদ্রে ডুব দিয়ে মুক্তা, রত্ন এবং অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র উদ্ধার করতো যা অন্য কোথাও পাওয়া যেতো না।
তাফসীর ক্বুরতুবিতে বলা আছে,
"وغواص " يعني في البحر يستخرجون له الدر . فسليمان أول من استخرج له اللؤلؤ من البحر .
""আর ডুবুরি" বলতে বোঝায় যে সমুদ্র থেকে মুক্তা বের করে। তাই, সুলাইমান আলাইহিসসালামই প্রথম যিনি সমুদ্র থেকে মুক্তা বের করেছিলেন।"
ইমাম সাদিক্ব হাসান খান তার তাফসীর জামি'ঊল ক্বুরআনে বলেন,
ويغوصون في البحر فيستخرجون له الدّر منه. وهو أول من استخرج اللؤلؤ من البحر.
"তারা(শাইত্বানরা) সমুদ্রে ডুব দিয়ে তার জন্য মুক্তা বের করত। তিনিই(সুলাইমান আ.) প্রথম যিনি সমুদ্র থেকে মুক্তা বের করেন।"
অর্থ্যাৎ, আল্লাহ ﷻ সুলাইমান আলাইহিসসালামের অধীনস্ত করে দিয়েছিলেন জ্বিন ও শাইত্বানদেরকে। এদের বিভিন্ন ক্যাটাগরি ছিলো। আরো ছিলো শক্তিশালী ইফরিত জ্বিন। আর কিছু জ্বিন তৈরি করতো বিশাল অট্টালিকা। কিছু জ্বিন শাইত্বান সমুদ্রের তলদেশে ডুব দিয়ে রত্ন-মুক্তা নিয়ে আসতো। এরা শুধু সমুদ্রেই যেতো, পানির মাঝে চলাফেরা করতে পারতো।
জনপ্রিয় ইসলামিক সাইট ইসলাম ওয়েবে বলা আছে,
فلا يبعد أن تكون البحار مأوى للشياط*ين، لأنها غيرعامرة بالبشر، ومن المعروف أنهم يسكنون الخرب والخلوات، قال الدكتورعمرالأشقر في ـ عالم الجن والشيا*طين: يكثر تجمعهم في الخراب والفلوات، ومواضع النجاسات كالحمامات والحشوش والمزابل والمقابر. اهـ.
ومما يقوي هذا أن إبلي*س يضع عرشه على الماء، فقد روى الإمام مسلم في صحيحه من حديث جابر قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: إن إبلي*س يضع عرشه على الماء ثم يبعث سراياه، فأدناهم منه منزلة أعظمهم فتنة
"এটি অসম্ভব নয় যে সমুদ্র শাইত্বানদের আশ্রয়স্থল, যেহেতু সেখানে মানুষের বিচরণ খুবই কম। এবং জানা যায় তারা ধ্বংসাবশেষ এবং নির্জন স্থানে বাস করে। ড: ঊমর আল-আশক্বার তার " জ্বিন ও শাইত্বানের জগৎ " বইতে বলেছেন "তারা প্রায়শই ধ্বংসস্তূপ এবং জনশূন্য স্থানে এবং স্নানঘর, পায়খানা, আবর্জনা ফেলার স্থান এবং কবরস্থানের মতো ময়লা-আবর্জনাপূর্ণ স্থানে জড়ো হয়।"
রাসূল ﷺ এর হাদীস আরো সত্যায়িত করে, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, ইবলীস পানির উপর তার আরশ স্থাপন করতঃ তার বাহিনী প্রেরণ করে। তন্মধ্যে তার সর্বাধিক নৈকট্য অর্জনকারী সে-ই যে সবচেয়ে বেশী ফিতনাহ সৃষ্টিকারী। " সহীহ মুসলিম ২৮১৩
وإذا احتاج الإنسان للسباحة في وقت أو مكان يُظَن فيه انتشار الشياطي*ن، فليتحصن بذكر الله والاستعاذة به وقراءة آية الكرسي ونحو ذلك.
তাই, যদি কেউ এমন সময় বা এমন স্থানে সাঁতার কাটতে হয় যেখানে জ্বিনের প্রাদুর্ভাব বা অস্তিত্বের লক্ষণ থাকে, তার উচিত নিজেকে আল্লাহর স্মরণ করে তার কাছে আশ্রয় চেয়ে, আয়াতুল কুরসি পড়ে নিজেকে সুরক্ষিত করে এরপর যাওয়া।
অতএব, পানিতে জ্বিন থাকে, এটি বাস্তব ও সত্য।